র্যাংকিংয়ে চার বছরে ৪০০ ধাপ পেছাল ঢাবি

হাজারেও ঠাঁই মেলেনি প্রাচ্যের অক্সফোর্ডের

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২২:২০

বিশ্বের সেরা এক হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায়ও ঠাঁই মিলেনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। পৃথিবীব্যাপী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র্যাংকিং নির্ধারক লন্ডনভিত্তিক শিক্ষা বিষয়ক সাময়িকী ‘টাইমস হায়ার এডুকেশনের’ চলতি বছরের এক প্রতিবেদনে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।  এই র্যাংকিংয়ে ৯২টি দেশের ১৩শ বিশ্ববিদ্যালয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে শুধুমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই ওই তালিকাতে হাজারের পরে স্থান পেয়েছে। শিক্ষার পরিবেশ, গবেষণার সংখ্যা ও সুনাম, সাইটেশন বা গবেষণার উদ্ধৃতি, এখাত থেকে আয় এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বা সংশ্লিষ্টতাসহ ৫টি মানদণ্ড বিশ্লেষণ করে এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে।

২০১৬ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটির ৪ বছরের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই সময়কালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় ৪০০ ধাপ পিছিয়েছে। গবেষণার সংখ্যা কমে যাওয়া, মানসম্পন্ন গবেষণার অপ্রাচুর্যতা, শিক্ষক রাজনীতি, শিক্ষা বাণিজ্য ও সহিংস ছাত্র রাজনীতি ইত্যাদি কারণে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও পরিবেশ ক্রমাগত অবনতির দিকে যাচ্ছে।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষকদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, গবেষণার জন্য যত্সামান্য বরাদ্দ, বরাদ্দকৃত অর্থ সঠিক খাতে খরচ না হওয়া, শিক্ষক নিয়োগে অস্বচ্ছতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রম যুগোপযোগী না হওয়া, গবেষণার চাইতে সান্ধ্যকালীন কোর্সে শিক্ষকদের অধিক আগ্রহ ইত্যাদি কারণেই ক্রমান্বয়ে অবনতির দিকে যাচ্ছে এই বিশ্ববিদ্যালয়।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বর্তমানে রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তাদের কাছে গবেষণার চাইতে পদের স্বাদটা বেশি উপভোগ্য হয়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন গবেষণার চাইতে পদ গুরুত্ব হয়ে ওঠে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তিরোহিত হয়।’ গবেষণা কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এখন শিক্ষকরা নিজেদের গবেষণা পড়ে না, কোন সমালোচনা করে না। এতে অন্য একজন শিক্ষক কখনো উত্সাহিত হয় না। এসবের কারণে গবেষণা হার কমে যাচ্ছে।’ এসময় শিক্ষক নিয়োগে অস্বচ্ছতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

টাইমস হায়ার এডুকেশনের তথ্যানুযায়ী, ২০১৬ সালে ৬শ থেকে আটশর মধ্যে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এর দুই বছর পরেই হঠাত্ ক্রমাবনতি শুরু হয় প্রতিষ্ঠানটির র্যাঙ্কিংয়ে। ২০১৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান ৪০০ ধাপ পিছিয়ে ১ হাজারেরও বাইরে চলে যায়। চলতি বছর প্রকাশিত (যদিও ২০২০ সাল উল্লেখ করা হয়েছে) রিপোর্টেও সেই অবস্থান থেকে উন্নতি করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয়টি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি বছরের মে মাসে সাময়িকীটি এশিয়ার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকা প্রকাশ করলে সেই তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামই ছিল না। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, ওই তালিকায় স্থান করতে পারেনি দেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে হয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বলছেন, পাশের রাষ্ট্রগুলো যখন তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তখন বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ব র্যাংকিংয়ে স্থান না পাওয়ার ঘটনা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে অস্বচ্ছতার ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কতটা মানসম্মত । 

র্যাংকিংয়ে  পিছিয়ে থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, যেসকল প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিং প্রকাশ করে তারা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে এসব র্যাংকিং নির্ধারণ করে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাণিজ্যিক র্যাংকিংয়ে বিশ্বাস করে না। তিনি দাবি করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আগের চাইতে ভালো করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ গবেষণার প্রতি আগের চাইতে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, আমাদের শিক্ষকরা এখন বিশ্বের সেরা-সেরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি আনছেন। সেজন্য টিচিং কোয়ালিটি নিম্নগামী হবার বিষয়টির সঙ্গে একমত হবার কারণ নেই।

তালিকা লক্ষ্য করলে দেখা যায়, চতুর্থবারের মতো এবছরও তালিকায় প্রথম স্থানটি দখলে নিয়েছে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড। তৃতীয় স্থানে রয়েছে কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি। বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারত এবং পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও বেশ ভালো করেছে। এই তালিকায় তিনশ থেকে শুরু করে এক হাজারের মধ্যে রয়েছে ভারতের ৩৬টি বিশ্ববিদ্যালয়। এরমধ্যে ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তালিকায় এক হাজারের মধ্যে রয়েছে পাকিস্তানের ৭টি বিশ্ববিদ্যালয়।