বরিশালে পিক কিংবা অফপিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ থাকলেও গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুেসবা মিলছে না। জরাজীর্ণ ট্রান্সফরমার প্রায়ই বিকল হয়ে যায়। বজ পাতে ভয়াবহ বিদ্যুত্ বিপর্যয় দেখা দেয়। এছাড়া ধারণক্ষমতার অধিক বিদ্যুত্ প্রবাহিত হওয়ায় বৈদ্যুতিক কেব্লসহ সরঞ্জামাদিও বিকল হচ্ছে। ফলে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে ৫ লক্ষাধিক বিদ্যুত্ গ্রাহক।
গত কয়েকদিনের তীব্র গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় ঘণ্টায় চার থেকে পাঁচ বার লোডশেডিং চলছে। এতবার বিদ্যুত্ না থাকলেও লোডশেডিং মানতে নারাজ বিদ্যুত্ বিভাগ। বিদ্যুত্ বিতরণ বিভাগ গতকাল বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, এ অঞ্চলে চাহিদা ১০০ মেগাওয়াটের অনুকূলে সমপরিমাণ বিদ্যুত্ সরবরাহ করা হয়েছে; কিন্তু কী কারণে ঘন ঘন লোডশেডিং চলছে তার জবাবে বিতরণ বিভাগ থেকে কোনো সদুত্তর মেলেনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বরিশাল বিদ্যুতের একাধিক ফিডারের দায়িত্বরতরা জানান, বাণিজ্যিক এলাকাসহ বাসাবাড়িতে বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়েছে। এ কারণে ট্রান্সফরমারসহ বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি বিকল হচ্ছে। বিতরণ ট্রান্সফরমারের সংকটের কারণে ধারণক্ষমতার অধিক পরিমাণে বিদ্যুত্ সরবরাহ হওয়ায় বিকল হচ্ছে কেব্ল। তাছাড়া প্রচণ্ড গরমে এসি ব্যবহারের কারণে ধারণক্ষমতার বেশি বিদ্যুত্ ট্রান্সফরমার ও বৈদ্যুতিক লাইনে প্রবাহিত হওয়ায় ঘন ঘন বিদ্যুত্ বিপর্যয় হচ্ছে। এসব কর্মকর্তা আরো জানান, বর্তমানে মাটির নিচ দিয়ে লাইন স্থাপনে সার্ভে কাজ চলায় বিদ্যুত্ বিভাগ বড়ো ধরনের কোনো সংস্কার করছে না। ফলে দিনে দিনে সমস্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন হতে কয়েক বছর লেগে যাবে। অথচ বর্তমানে কাজ করতে হচ্ছে জোড়াতালি দিয়ে। নতুন উন্নত মানের সরঞ্জামাদি না আসায় দিন-রাত সমানতালে কাজ করেও গ্রাহকদের সেবা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলে জানান তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদ্যুত্ বিতরণ ও বিক্রয় ডিভিশন-১ ও ২ জোনের অধীনে প্রায় ৫ শতাধিক ট্রান্সফরমার রয়েছে। যার গ্রাহক সংখ্যা ১ লাখের ওপরে। পল্লী বিদ্যুত্ সমিতি-১ ও ২-এর ট্রান্সফরমার রয়েছে প্রায় ১৪ হাজার। তাদের গ্রাহক সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৪ লাখ। বিদ্যুত্ বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ১০০ কেবিএর ট্রান্সফরমার দিয়ে সর্বোচ্চ ৭০ গ্রাহককে বিদ্যুত্ সরবরাহ করা যায়। ২০০ কেবিএর ট্রান্সফরমারে ১৪০ জন। মহানগরীতে বিদ্যুত্ বিতরণ ও বিক্রয়ের দুইটি জোনে যে ট্রান্সফরমার রয়েছে তাতে সর্বোচ্চ ৬০ হাজার গ্রাহককে সংযোগ দেওয়া সম্ভব। বর্তমানে দুইটি ডিভিশনের অধীনে গ্রাহক ১ লাখ ছাড়িয়েছে।
ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিশন কোম্পানির (ওজোপাডিকো) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. ইখতিয়ার উদ্দিন জানান, বিদ্যুতের লোডশেডিং না থাকলেও বিভিন্ন সময় সংস্কার করতে সংযোগ বন্ধ রাখা হয়। বর্তমানে ঘনবসতি ও বহুতল ভবনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন নতুন সংযোগ দিতে হচ্ছে। এতে পূর্বের ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি ধারণক্ষমতার সরঞ্জামাদি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এছাড়া বজ পাতে প্রতি মাসেই বিদ্যুত্ বিভাগের ক্ষয়-ক্ষতি হচ্ছে। তিনি বলেন, এসব ভোগান্তি দূরে মাটির নিচ থেকে বিদ্যুতের লাইন স্থাপনের কথা ভাবছে কর্তৃপক্ষ। ইতিমধ্যে মাঠপর্যায়ে সার্ভের কাজ শুরু হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ফিজিবিলিটি স্টাডির কাজ করা হবে। ফিজিবিলিটি স্টাডির মাধ্যমে প্রকল্পটি দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, মাটির কনডিশন, প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণসহ নানা বিষয়ে তুলে ধরে ওজোপাডিকোর কাছে প্রতিবেদন সাবমিট করবে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান।
মহানগরীর গ্রাহকদের যখন এমন বেহাল তখন পল্লী বিদ্যুত্ সমিতির গ্রাহকদেরও দুর্ভোগের শেষ নেই। পল্লী বিদ্যুত্ সমিতি-১-এর অধীন গ্রাহক রয়েছে ২ লাখের বেশি। বিপুল সংখ্যক এ গ্রাহককে বিদ্যুত্ সরবরাহ করতে (৫ কেবিএ) ১২ হাজারেরও বেশি ট্রান্সফরমার প্রয়োজন। সেখানে ট্রান্সফরমার রয়েছে মাত্র ৮ হাজার। নতুন করে গ্রাহক বৃদ্ধি করা হলেও বাড়ানো হয়নি ট্রান্সফরমার। পল্লী বিদ্যুত্ সমিতি-২-এর আওতাধীন গ্রাহক রয়েছে প্রায় আড়াই লাখ। ট্রান্সফরমার রয়েছে সাড়ে ৬ হাজার। পল্লী বিদ্যুত্ সমিতি-২-এর নতুন গ্রাহকও বেড়েছে। পল্লী বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ সংযোগ দেওয়ায় যে বেহাল চলছে তার ওপরে পল্লী বিদ্যুত্ সমিতির সরবরাহ লাইন মাইলের পর মাইল গ্রামের গাছপালার ওপর দিয়ে টানা হয়েছে। সামান্য বাতাস শুরু হলেই পুরো পল্লী বিদ্যুত্ সরবরাহ লাইন বন্ধ করে দেওয়া হয়।
