ইহা এক চিরায়ত প্রশ্ন—আমরা কি একা? সুদূর মহাকাশপাণে তাকাইয়া বিস্মিত হইতে হয়, অসংখ্য তারাখচিত এই বিশ্বপরিমণ্ডলে কোন এক কোণে পড়িয়া রহিয়াছি আমরা, আমাদের অতি ক্ষুদ্র সৌর-পরিবার। সেই পরিবারের তিন নম্বর সদস্য হইয়া আমাদের মাতৃগ্রহ—এই পৃথিবী—এক বিস্ময়কর প্রাণের স্ফুরণ ঘটাইয়াছে। বিজ্ঞানের বিস্ময়কর উন্মেষের পরও সারা বিশ্ব তন্ন তন্ন করিয়া খুঁজিয়া কোথাও পাওয়া যায় নাই প্রাণের স্পন্দন! আর তাহার পরিপ্রেক্ষিতে চিরায়ত দার্শনিক প্রশ্নের মীমাংসা এখনো হয় নাই—আমরা কি একা? এই প্রশ্নের পালে নূতন করিয়া হাওয়া লাগাইয়াছে ‘হাবল স্পেস টেলিস্কোপ’। সম্প্রতি আমাদের সৌরমণ্ডল হইতে মাত্র ১১০ আলোকবর্ষ দূরে পাওয়া গিয়াছে এমন একটি গ্রহের সন্ধান, যাহার বুকে রহিয়াছে তরল পানির ফল্গুধারা! ‘লিও’ নক্ষত্রপুঞ্জের ‘কে২-১৮বি’ নামের গ্রহটির আরো রহিয়াছে হাইড্রোজেন, হিলিয়াম গ্যাসও। হাবলের আয়নায় ধরা পড়া ছবি বিশ্লেষণ করিয়া ‘কে২-১৮বি’ গ্রহটির পানি থাকিবার বিষয়টি নিশ্চিত করিয়াছে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ‘সেন্টার ফর স্পেস এক্সোকেমিস্ট্রি ডেটা’র জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ ব্যাপার হইল—এমন ভিনগ্রহের হদিস মিলল এই প্রথম।
প্রাণের উপযুক্ত গ্রহ মহাবিশ্বে কতগুলি রহিয়াছে—তাহা ১৯৬৬ সালে স্পষ্ট করিয়া বলিয়াছেন বিজ্ঞানী কার্ল সাগান। তিনি বলিয়াছেন, মহাবিশ্বে ১ হাজার কোটি কোটি গ্রহ রহিয়াছে যেইগুলি জীবনধারণের উপযুক্ত। সংখ্যাটি আরেকবার আওড়াইয়া নেওয়া যায়, ‘এক’-এর পিছনে ‘আঠারোটি শূন্য’! এই সকল প্রাণোপযুক্ত গ্রহ দুইখানি শর্ত পূরণ করে। সর্বপ্রথমটি হইল—শক্তির উত্স হিসাবে সঠিক ধরনের নক্ষত্র, পৃথিবীর ক্ষেত্রে ‘সূর্য’ যেমন। দ্বিতীয়টি হইল, গ্রহ হইতে নক্ষত্রের সঠিক দূরত্ব। বেশি দূরে হইলে বেশি শীতল হইবে, আবার নিকটবর্তী হইলে অত্যন্ত উত্তপ্ত হইবে। সম্প্রতি আরো অনেক গবেষণার পর জানা গিয়াছে, একটি গ্রহের ন্যূনতম ২০০টি জিনিস দরকার জীবনধারণের জন্য। শুধু তাহাই নহে, প্রতিটিরই সঠিক মান থাকিতে হইবে এবং অনেকগুলো আবার একে-অপরের উপর খুব জটিলভাবে নির্ভরশীল। এমনকি বৃহস্পতির মতো একটি বৃহত্ গ্রহও প্রয়োজন, যাহাতে মহাকাশীয় বস্তুকে ঐ বৃহত্ গ্রহটি তাহার মাধ্যাকর্ষণ শক্তি দিয়া নিজের বুকে টানিয়া লইয়া রক্ষা করিতে পারে জীবনধারণে সক্ষম গ্রহটিকে। যেমনটি পৃথিবীর ক্ষেত্রে রক্ষা করিয়া থাকে বৃহস্পতি নামের অতিকায় গ্রহ।
বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং বলিয়াছিলেন যে, মানবসভ্যতাকে টিকিয়া থাকিতে হইলে পৃথিবী বাহিরে নূতন গ্রহে পাড়ি দিতেই হইবে। মানুষের অদম্য মানসিকতাই তাহাকে শেষাবধি নূতন জগতে লইয়া যাইবে হয়তো। কিন্তু মহাবিশ্বের সবচাইতে বড়ো বাধা হইল একটি নক্ষত্র হইতে অন্য নক্ষত্রের দূরত্ব। ‘কে২-১৮বি’ গ্রহটির ক্ষেত্রে ১১১ আলোকবর্ষ দূরত্বের মানে হইল—আলোর গতিতে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩ লক্ষ কিলোমিটার বেগে ছুটিলে ঐ গ্রহে পৌঁছাইতে লাগিবে ১১১ বত্সর! মানুষের আবিষ্কৃত অতি আধুনিক রকেটও এইক্ষেত্রে গরুর গাড়ির চাইতে অধিক গতিযুক্ত নহে। সুতরাং আপাতত ফ্যান্টাসিই ভরসা।
