ডা. মোহাম্মদ মুহিবুল্লাহ
সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে বাংলাদেশ থেকে পোশাক রপ্তানির বিনিময়ে ব্রাজিল থেকে মাংস আমদানির খবর প্রকাশিত হয়েছে। জানা যায়, এ সম্পর্কিত একটি প্রস্তাবনা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এ যেন দেশের একটা শিল্পখাতকে হূষ্টপুষ্ট করতে গিয়ে সম্ভবনাময় অপর একটি শিল্পখাতকে চিরতরে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া। বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ বিভাগ যখন দেশে মাংসে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে বিদেশে রপ্তানির স্বপ্ন দেখছে, তখন বিজিএমইএ থেকে এই ধরনের প্রস্তাব অত্যন্ত দুঃখজনক। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ি, ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে ৭২.১৪ লাখ মেট্রিক টন মাংসের চাহিদার বিপরীতে দেশে মাংসের উত্পাদন ছিল ৭২.৬০ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাত্ ০.৪৬ মেট্রিক টন মাংস চাহিদার তুলনায় উদ্বৃত্ত ছিল। এছাড়া গেল ঈদুল আজহায় সারা দেশে গবাদিপশুর চাহিদা ছিল প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ, যার মধ্যে গরুর চাহিদা ছিল ৫৫ থেকে ৬০ লাখ। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ঈদুল আজহা উপলক্ষে সারা দেশে প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ কোরবানিযোগ্য গবাদিপশু প্রস্তুত ছিল, যা চাহিদার তুলনায় বেশি।
বিগত কয়েক বছরে ভারত থেকে অবাধ গরু আমদানি ও চোরাচালান বন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে প্রয়োজনীয়তার নিরিখে এখানে গরু লালনপালন বাড়তে থাকে। বাড়তে শুরু করে দুগ্ধ ও গরু মোটাতাজাকরণ খামারের সংখ্যা। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে বিকশিত হতে শুরু করে ডেইরি ও ক্যাটল শিল্প। বর্তমানে দেশের অনেক উচ্চশিক্ষিত বেকার যুবক গরু মোটাতাজাকরণ এবং দুগ্ধ শিল্পে নিজেদের আত্মনিয়োগ করেছে। সরকারও এই খাতের গুরুত্ব উপলব্ধি করে অত্যন্ত স্বল্প সুদে ডেইরিশিল্পের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। ফলে অত্যন্ত স্বল্প সময়ের ব্যবধানে বিগত কয়েক বছরের কোরবানির সময়েও দেশীয় গবাদিপশুর মাধ্যমে সম্পূর্ণ চাহিদার জোগান দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এভাবে এই শিল্প খুব দ্রুতই প্রতিষ্ঠিত শিল্পের রূপ পাবে।
বিজিএমইএ-র প্রস্তাব অনুযায়ী ব্রাজিল থেকে অবাধে হিমায়িত গরুর মাংস আমদানি করলে দেশীয় উদ্যোক্তা ও প্রান্তিক খামারিরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে খামার করে স্বাবলম্বী হতে এগিয়ে আসা বিশাল যুবসমাজ তথা উদ্যোক্তারা বেকার হয়ে পড়বে; যার প্রভাব পড়বে অর্থনীতির ওপর। একথা সত্যি যে বর্তমানে বাজারে গরুর মাংসের দাম একটু বেশি। কিন্তু এ শিল্প বিকশিত হলে ধীরে ধীরে এ দাম কমে আসবে। যার জ্বলন্ত উদাহরণ পোল্টিশিল্প ও মত্স্যশিল্প। এছাড়া প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের দারিদ্র্য দূরীকরণ ও ক্ষুধা নিবারণে প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রেখে চলেছে দুগ্ধ (ডেইরি) ও মোটাতাজাকরণ (ফ্যাটেনিং) শিল্প। এ শিল্প ধ্বংস হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে প্রান্তিক অঞ্চলের এই মানুষগুলো। বাধাগ্রস্ত হবে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট’র (এসডিজি) লক্ষ্য অর্জন।
মাংস উত্পাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পর সরকার গ্রহণযোগ্য মানের দুধের উত্পাদন বাড়িয়ে দুগ্ধখাতেও স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। সে লক্ষ্যে বাস্তবায়িত হচ্ছে বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মেগা প্রজেক্ট ‘প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প’। মাংস রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টির জন্য ঢাকার সাভারে স্থাপন করা হয়েছে অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন আন্তর্জাতিক মানের ‘প্রাণিসম্পদ মান নিয়ন্ত্রণ গবেষণাগার’। এ অবস্থায়, বিজিএমইএ-র মাংস আমদানির প্রস্তাব সম্পূর্ণ অবিবেচনাপ্রসূত ও ভিত্তিহীন। আমরা আশা করি, সরকার এবং সংশ্লিষ্টরা এক্ষেত্রে আত্নঘাতী সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে সরে আসবে। এবং দুধ, মাংস ও ডিমের চাহিদা পূরণে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
কক্সবাজার
