বন্ড-সুবিধার মালামাল খোলাবাজারে বিক্রিতে নতুন কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে জালিয়াত চক্র। বন্ডেড ওয়্যারহাউজ কিংবা কারখানা প্রাঙ্গণ থেকে মালামাল না দিয়ে অন্য কোনো স্থান থেকে এসব মালামাল বিক্রয়ের জন্য সরবরাহ করা হয়। সরবরাহকারী বা বন্ডারের পরিচয় গোপন রাখতে কোনো বিল অব এন্ট্রি বা চালানপত্র পাওয়া যায় না। আবার যে ক্রেতার কাছে ঐ মালামাল সরবরাহ করা হবে, বহনকারী (সাধারণত পরিবহনের চালক) তার নাম-ঠিকানাও জানে না বা গোপন রাখে। ফলে এসব পণ্য পরিবহনকালে রাজস্ব বোর্ডের কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট অফিসের প্রিভেন্টিভ টিমের হাতে ধরা পড়লে গাড়িতে মালামাল ছাড়া আর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। এক্ষেত্রে চালক, হেলপারকে আটক করা এবং ট্রাকসহ ঐ মালামাল আটকে রেখে দেওয়া ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর থাকে না। স্থান সংকুলানের অভাবে এসব মালামালসহ পরিবহন বেশি দিন আটকে রাখাও সম্ভব হয় না। মালামাল ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য দেনদরবার করেন ঐ চালক বা পরিবহনের মালিক। ফলে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ জরিমানা করে ঐ সব মালামাল ছেড়ে দিতে হয়।
বন্ড কমিশনারেট অফিস সূত্র জানিয়েছে, গত দুই মাসে ১৫টি গাড়ি আটক করা হয়েছে। এর কোনোটিতে বন্ডারের (বন্ড-সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান) হদিস করা সম্ভব হয়নি। ফলে ঐ সব আমদানিকারকের বন্ড-সুবিধার লাইসেন্স বাতিল করা, আমদানি স্থগিত করা বা ব্যবসা সাময়িক বন্ধ করে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি। অথচ এর আগে এসব মালামাল ধরা পড়লে সেখানে বন্ডার বা কারখানার তথ্য পাওয়া যেত। ঐ তথ্য অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হতো। জালিয়াত চক্রের নতুন এই কৌশলের কারণে অভিযান পরিচালনায় নিরুত্সাহিত হচ্ছেন কর্মকর্তারা। এ অবস্থায় প্রকৃত অপরাধীকে চিহ্নিত করতে বিকল্প কৌশলের কথা ভাবছে এনবিআর। সেক্ষেত্রে মালিকানা চিহ্নিত করতে ফৌজদারি অপরাধের মামলার কথাও ভাবা হচ্ছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
বন্ড কমিশনারেটের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, ‘ছয় মাস আগে বন্ড কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়। তখন আমাদের একাধিক দল গভীর রাতে সন্দেহজনক স্থানে অভিযান শুরু করে। এর ফলে ৬৪টি পণ্যবাহী যানবাহন আটক এবং পাঁচটি গুদাম সিলগালা করা হয়েছে। পুরান ঢাকায় এ ধরনের একটি অভিযানকালে কর্মকর্তাদের ওপর অতর্কিত হামলার ঘটনাও ঘটেছে। আটককৃত পণ্যের মধ্যে গার্মেন্টসের ফেব্রিক ছাড়াও সুতা, কাগজ, বিওপিপি ফিল্ম, পিপি দানা, ডুপ্লেক্স বোর্ড, আর্টকার্ড ছিল। ঐ সব ট্রাকের প্রায় সব কটিতেই পণ্য সরবরাহকারী তথা বন্ডারের তথ্য পাওয়া যেত। এর ভিত্তিতে বন্ড-সুবিধার অপব্যবহারকারীকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু তারা এখন কৌশল পালটে ফেলেছে। গাড়ি আটকের পর ড্রাইভার আর গাড়ির মালামাল ছাড়া আর কোনো তথ্য পাচ্ছি না।’
ঊর্ধ্বতন ঐ কর্মকর্তা বলেন, ‘এখন কারখানা থেকে এসব মালামাল দেওয়া হয় না। ধারণা করছি, এতে একটি দালাল চক্র গড়ে উঠেছে। তারা কারখানাগুলো থেকে এসব মালামাল ক্রয় করে নিজেদের সুবিধামতো জায়গায় মজুত করে। কোনো মার্কেট বা তৃতীয় কোনো জায়গা থেকে গাড়িতে ওঠানো হয়। ধরা খেলে তারা বলে না কিংবা জানেও না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জায়গার নাম বলতে পারে। এসব গাড়ি আটকের পর মামলা হয়। স্থান সংকুলানের অভাবে বেশি দিন রাখাও সম্ভব হয় না। ফলে গত দুই মাসের অভিযানে ১৫টি পরিবহন আটক করা হলেও একজন প্রকৃত অপরাধীকেও চিহ্নিত করতে পারিনি।’
বন্ড-সুবিধার অপব্যবহার রোধে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে কঠোর বার্তা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে খোদ অর্থমন্ত্রীও তত্পর। এনবিআরের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে বন্ড-সুবিধার অপব্যবহারের ইস্যুটি তুলে এই অনিয়ম থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
শতভাগ রপ্তানিকারকদের শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিয়েছে সরকার। তবে শর্ত হলো, এই সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল এনবিআরের নির্ধারিত গুদামে রেখে তা দিয়ে তৈরি পণ্য বিদেশে রপ্তানি করতে হবে। এটি বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা নামে পরিচিত। বন্ডেড-সুবিধার কোনো পণ্য বাইরে বিক্রি করতে হলে প্রযোজ্য হারে শুল্ক-কর পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু সরকারের দেওয়া এই সুবিধার অপব্যবহার করছেন একশ্রেণির ব্যবসায়ীরা। প্রয়োজনের চাইতে বেশি প্রাপ্যতা দেখিয়ে কাঁচামাল বা এক্সেসরিজ আমদানি করে তা খোলাবাজারে বিক্রি করে দেন। এতে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। অন্যদিকে সমজাতীয় পণ্যের উত্পাদনকারী স্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তা ও বাণিজ্যিক আমদানিকারকেরা (যারা শুল্ক-কর পরিশোধ করে আমদানি করেন) অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েন। ফলে স্থানীয় শিল্প ক্ষতির মুখে পড়ে। এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, বন্ডেড-সুবিধার বাইরে থাকা বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের সমজাতীয় কাঁচামালের শুল্ক-করের পরিমাণ প্রকারভেদে ৬০ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশ কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে আরো বেশি।
