বাবার পারফিউম

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৯:২৩

  সাদিকুল নিয়োগী পন্নী

 

‘পারফিউমের বিষয়ে তোর একটুও সেন্সই নাই। এমন জিনিস এনে দিস, যা নাকের ডগায় ঘষলেও গন্ধ পাই না। মিনারেল ওয়াটারে এর চেয়ে ভালো গন্ধ থাকে।’

বাবার কথার জবাবে আমি বললাম, ‘তোমার তো কোনো পারফিউমই পছন্দ হয় না। প্রকট গন্ধের পারফিউমও তুমি বুঝতে পার না। আমার মনে হচ্ছে, তোমার নাকের সমস্যা। হয়তো নাকের ভেতরে মাংস বেড়েছে। যে কারণে গন্ধটা আসল জায়গায় পৌঁছায় না।’

‘কী বললি তুই! ছেলে হয়ে বাপের সাথে মশকরা করিস! তোর দেয়া কোনো পারফিউম আর ব্যবহার করব না।’

‘বাবা রাগ করছ কেন? নাকেরও তো রোগ-বালাই হতে পারি। ভাবছি, তোমাকে নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ দেখাব। এতে তোমার নাকের রোগ সারবে। আর পারফিউমের আসল গন্ধটাও উপভোগ করতে পারবে।’ এ কথায় বাবা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন।

বাবা বললেন, ‘তোর মতো বেয়াদব ছেলে থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো। সাহস কত বড় দেখ, বাপের নাক নিয়ে টানাটানি করছে!’

আমি হেসে বললাম, ‘টানাটানি করছি কই, সমাধানের চেষ্টা করছি, যাতে তুমি সঠিক গন্ধটা পাও।’

‘তোর কেনা ফারফিউমের চেয়ে মশার কয়েলের গন্ধও ভালো। দেখিস না আজকাল কত সুগন্ধি কয়েল বের হয়েছে। লিক্যুইড কয়েল যেদিন বের হবে, সেদিন থেকে আর কোনো পারফিউম দিব না। পারফিউমের পরিবর্তে লিক্যুইড কয়েল গায়ে মাখব। এক ঢিলে দুই কাজ হবে। মশাও কামড়াবে না। আবার সুগন্ধিও ছড়াবে।’

‘সব জায়গায় সুগন্ধি খোঁজো না তো বাবা। দেখ না, আজকাল কয়েলে কোনো মশা মরে না। উল্টো সুগন্ধির কারণে বাইরে থেকেও মশা ঘরে ঢুকে। আর লিক্যুইড কয়েল ব্যবহার করলে তোমার শরীরে মশা বাসা বানাবে।’

বাবা কী যেন বলতে চাইছিলেন, তখন মা এসে হাজির। মা রেগে বাবাকে বললেন, ‘ছেলেটা এত দিন পর বাড়িতে এল। আর তুমি পারফিউম নিয়ে ঝগড়া শুরু করেছ। আর একটা শব্দ করলে আমি বাসা থেকে চলে যাব।’

অবস্থা বেগতিক দেখে আমরা বাপ-বেটা চুপ হয়ে গেলাম।

 

দুই.

‘থাইল্যান্ডে ভালো পারফিউম পাওয়া যায়। দেশে ফেরার সময় আমার জন্য ভালো দেখে একটা পারফিউম নিয়ে আসবি।’ থাইল্যান্ড যাওয়ার আগে বাবা আমাকে বললেন।

‘প্যারিস থেকে পারফিউম আনলেও তুমি বলবা পানির বোতল আনছি। তাই তুমি তোমার পছন্দের পারফিউমের নাম বলে দাও।’

‘জাস্ট কল মি মেক্সি—এই নামে বডি স্প্রে ও পারফিউম দুটোই আছে। তুই আনবি পারফিউম। কঠিন নাম, প্রয়োজনে লিখে নে।’ বললেন বাবা।

‘আমার মনে থাকবে।’ এই বলে বাসা থেকে বিমান বন্দরের উদ্দেশে রওনা দিলাম।

 

তিন.

পাতায়া বিচের পাশেই ‘সেন্ট্রাল ফেস্টিভ্যাল পাতায়া’ নামে বিশাল শপিং কমপ্লেক্স। জামা-কাপড়, কসমেটিকস থেকে শুরু করে এখানে প্রায় তিন শতাধিকের বেশি দোকান রয়েছে। এই শপিং কমপ্লেক্সের একটা কসমেটিকসে দোকানে গিয়ে বাবার বলে দেওয়া পারফিউম চাইলাম। দোকানদার একটু খোঁজাখুঁজি করে নেই বলে জানিয়ে দিলেন। তারপর একাধিক দোকানে ঘুরে কাঙ্ক্ষিত পারফিউমের সন্ধান পেলাম না। হতাশ হয়ে বিচের পাশের একটা ছোট কসমেটিকসের দোকানে গেলাম। দোকানদারকে পারফিউমের নাম বলার পর তিনি অপেক্ষা করতে বললেন। আমি দোকানের একটা টুলে বসলাম। দোকনদার থাই ভাষায় কার সঙ্গে যেন ফোনে কথা বলে আমার দিকে হাসি দিলেন। ভাবলাম হয়তো অন্য কোনো দোকান থেকে তিনি আনিয়ে দিচ্ছিন। একটু পর একজন দোকানে এসে হাজির হলেন। দোকানদার বললেন, ‘উনার সঙ্গে যান। ভাড়া মিটারে দিলেই হবে।’

আমি বললাম, ‘মানে?’

দোকানদার বললেন, ‘আপনি তো টেক্সি কল করতে বললেন। আমি পরিচিত একজনকে কল করে আনলাম।’

চালক বললেন, ‘দোকানের সামনে বেশিসময় টেক্সি রাখা যাবে না। তাড়াতাড়ি চলেন।’

আমি দোকানদারকে বললাম, ‘ভাই, আমি তো টেক্সির কথা বলিনি। জাস্ট কল মি মেক্সির কথা বলেছি।’

‘বিদেশে ঘুরতে এসে বেশি পাকনামি করবেন না। টেক্সি ডেকে উপকার করছি। উল্টা ফাপড় দিচ্ছেন। বাড়াবাড়ি করলে পুলিশে দিব।’

মনে হলো আমার ও দোকানদারের ইংরেজি জ্ঞান কাছাকাছি। তাই হয়তো এমন ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে।

নিজের ভাগ্যকে দোষারোপ করে দোকানদারকে ধন্যবাদ জানিয়ে টেক্সিতে উঠলাম। তারপর পাতায়া শহরে উদ্দেশ্যহীন ঘুরাফেরা করে তিনশ বাথ ভাড়া দিয়ে হোটেলে ফিরলাম।

 

চার.

ব্যাংকক থেকে আসার আগের দিন বিকালে গেলাম ইন্দ্রা স্কয়ারে। সেখানের শপিং কমপ্লেক্স থেকে সবার জন্য টুকটাক কেনাকাটা করলাম। তারপর গেলাম কসমেটিকসের দোকানে বাবার সেই পারফিউম কিনতে। পূর্বের বাজে অভিজ্ঞতার কারণে এবার সতর্কতার সঙ্গে পারফিউমের নাম বললাম। এই দোকানের বিক্রেতা এক সুন্দরী তরুণী। তিনি ভাসা ভাসা ইংরেজিতে বললেন, ‘একটু দাঁড়ান। আমি অন্য দোকান থেকে এনে দিচ্ছি।’

আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। মনে মনে চিন্তা করলাম, বাবাকে খুশি করতে একবারে বেশ কয়েকটা নিয়ে যাব।

মিনিট পাঁচেক পর তরুণী এক বোঝা মেক্সি নিয়ে হাজির হলেন।

আমি বললাম, ‘এসব কী?’

তিনি মিষ্টি হাসি দিয়ে বললেন, ‘এখানে বিভিন্ন কালারের মেক্সি আছে। আপনার পছন্দমতো বেছে নিন। কাপড়গুলোও বেশ আরামদায়ক।’

‘আমি তো পারফিউম চেয়েছি। আপনি আনলেন মেক্সি।’

‘বাংলাদেশিরা বেশ আমুদে হয়। আপনাকে দেখে তার প্রমাণ পেলাম।’ এই বলে সে পাঁচ-ছয়টা মেক্সির প্যাকেট করে হাতে ধরিয়ে দিল।

এই সুন্দরীর সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় পেরে ওঠা মুশকিল। তাই তার মিষ্টি হাসির সঙ্গে তাল মিলাতে আমি কষ্টের হাসি দিয়ে হোটেলে চলে এলাম।

 

পাঁচ.

দেশে ফেরার পর লাগেজ খুলে সবার জিনিসপত্র বুঝিয়ে দিচ্ছি। বাবা বেশ আগ্রহ নিয়ে বললেন, ‘আমার পারফিউম কই?’

বিদেশের বিড়ম্বনার কথা বললে বাবা বিশ্বাস করবেন না। উল্টো আমাকে বকা দেবেন। এই ভয়ে আমি বললাম, ‘তুমি যা বলেছ, তা এনেছি। শুধু পুরো বাক্য কমন পড়েনি। তবে একটা শব্দের মিল আছে।’

বাবা বললেন, ‘মানে কী?’

আমি লাগেজ থেকে শপিং ব্যাগ বের করে বাবার হাতে দিলাম।

বাবা শপিং ব্যাগ খুলেই বললেন, ‘করেছিস কী, তুই বাপের জন্য মেক্সি কিনে এনেছিস!’

আমি বললাম, ‘ওই নামে কোনো পারফিউম পাইনি। যা পেয়েছি, তা-ই এনেছি।’

‘তাই বলে মহিলাদের মেক্সি।’ এই বলে বাবা শপিং ব্যাগ আমার মুখের ওপর ছুড়ে মারলেন।

মা সঙ্গে সঙ্গে তা তুলে নিয়ে বললেন, ‘বাবা তুই ভালো করেছিস। এই গরমে বাসায় শাড়ি পরে থাকা খুব কষ্টকর। এগুলো আমি পরব। আর তোর বাপের জন্য বিকালে একটা নরমাল পারফিউম কিনে দিস।’