বিশ্বজিত্ দাস
পার্টি চলছে। গান বাজছে। কিশোর-কিশোরীরা গানের তালে তালে নাচছে। একটু দূরে সোফায় বসে কোল্ড ড্রিঙ্কসে চুমুক দিতে দিতে সেলিম ভাবল, জীবনটা সত্যিই সুন্দর। পাশে বসা রাবুর দিকে তাকাল ও। শাড়িতে তাকে সুন্দর লাগছে। সেও হাসিমুখে নাচ দেখছে।
বিদ্যুত্ চলে গেল। সেলিম টের পেল ঘাড়ের ওপর হাত। রাবুর মনে হয়। একটু পরেই অন্ধকারে রাবু ঘাড়ের পাশ থেকে হাত সরিয়ে হাতে হাত রাখল।
বিদ্যুত্ চলে এল। মুহূর্তের মধ্যে আবার সব চালু হয়ে গেল।
সেলিমের কানের পাশে কে যেন ফিসফিস করল। মিসেস রহমান। ওর ডানপাশে বসেছে। বেশ সেজেগুজে এসেছে। বামপাশে রাবু।
‘ভাই, নিজের সুন্দরী বউ ছেড়ে আমার সাথে কেন লাইন মারছেন?’ ফিসফিস করে বলল মহিলা।
‘মানে?’
‘মানে বুঝছেন না, নাকি বুঝেও না বোঝার ভান করছেন?’ খিলখিল করে হেসে উঠলেন তিনি।
বিব্রত বোধ করল সেলিম।
‘আপনি কি বউ মনে করে আমাকে চিমটি দিয়েছেন? অসুবিধা নেই। আমি কিছু মনে করিনি।’
আবার খিলখিল করে হেসে উঠলেন মিসেস রহমান।
ঝট করে রাবুর দিকে তাকাল।
তার মুখে মিটিমিটি হাসি। একমনে অনুষ্ঠান দেখছে।
দুই.
বাসায় ঢুকতেই রাগে ফেটে পড়ল সেলিম। ‘এসবের মানে কী?’
‘কিসের মানে কী?’
নির্বিকার ভঙ্গিতে আয়নায় নিজেকে দেখতে দেখতে বলল রাবু।
‘মিসেস রহমানকে চিমটি দিয়েছে কে?’
‘আমি দিয়েছি।’ স্বাভাবিকভাবে বলল রাবু। যেন কিছুই হয়নি।
‘মহিলা আমাকে কী ভাবল বলো তো?’
‘কী আবার ভাববে, ভাববে তুমি তার প্রেমে পড়েছ। যেভাবে ড্যাবড্যাব করে তাকাচ্ছিলে!’
‘দেখ রাবু, তুমি কিন্তু বাড়াবাড়িরও সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ!’
‘কিসের বাড়াবাড়ি। মহিলাকে ভালো লেগেছে বলেই তুমি তার দিকে তাকিয়েছিলে। আমি চিমটি দিয়ে বরং তোমার সুবিধা করে দিয়েছি। এখন মেসেঞ্জারে গিয়ে ইচ্ছেমতো চ্যাট করতে পার তার সাথে।’
‘বাসার বাইরে গেলে তুমি সবসময় এমন আচরণ করো কেন আমার সাথে? আমার মানসম্মানের দিকে একটু তাকাবে না।’ ক্ষুব্ধ স্বরে বলল সেলিম।
‘আমি আবার তোমার সম্মান নিয়ে কখন টানাটানি করলাম।’
‘সেদিন হোটেলে খেতে বসে আমি যখন ওয়েটারকে বললাম, আপনাদের আজকের হালিমটা পোড়া পোড়া লাগছে, তুমি সাথে সাথে বললে, না ভালোই তো লাগছে। তাতে আমি ছোট হলাম না?’
রাবু কোনো কথা বলল না।
‘সেদিন রিকশা থেকে নামার পর রিকশাওয়ালা দশ টাকা বেশি ভাড়া চাইল। আমি প্রতিবাদ করা মাত্র তুমি ব্যাগ থেকে রিকাশাওয়ালাকে টাকা বের করে দিয়ে দিলে। এতে আমি ছোট হলাম না?’
‘রিকশাওয়ালার সাথে ঝগড়া করে তুমি বোধহয় খুব বড়ো হয়ে যাচ্ছিলে!’
‘দেখ রাবু, এনাফ ইজ এনাফ। আমি আজই বড়ো আপুকে সব খুলে বলব। তারপর তারা যা বিচার করেন, তা-ই মেনে নেব দুজনে, বুঝলে। এভাবে আর চলে না। অসহ্য!’
‘ঘরের কথা বাইরের লোককে বললে খুব ভালো হয় বুঝি?’ নির্বিকারভাবে হাতের নখ খুঁটতে খুঁটতে বলল রাবু।
‘ঘরে আর বাইরে ব্যাপারটা তুমি বোঝ না বোঝার চেষ্টা কখনো করেছ?’
‘তুমি কী চাও?’ প্রচণ্ড রাগে চিত্কার করে বলল সেলিম।
‘চিত্কার কোরো না। ঠিক করে বলো তুমি কী চাও?’
‘ঘরের বউ ঘরের মতোই থাকো। বাইরের ব্যাপারগুলো আমাকেই সামলাতে দাও। এখন থেকে আর তোমাকে সাথে নিয়ে বাইরে যাব না। কাউকে চিমটি দিয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাইলে আমিই করব। মেসেঞ্জারে কারো সাথে বন্ধুত্ব করতে চাইলে আমিই করব। তোমাকে ঘটকালি করতে হবে না।’
তিন.
‘নাস্তা খাব না।’ ঠিক করল সেলিম।
রাবু একসঙ্গে নাস্তা করবে বলে ডাইনিং টেবিলে বসে আছে।
সেলিম অসম্ভব ব্যস্ততার ভাব দেখল। তাড়াতাড়ি করে রেডি হলো। বের হতে যাবে, অমনি পেছন থেকে ডাক এল, ‘নাস্তা খেয়ে যাও।’
‘তোমাকে না বলেছি পেছন থেকে ডাকবে না।’
‘নাস্তা খেয়ে যাও।’
‘অফিসেই খেয়ে নেব।’ জুতাতে পা গলাতে গলাতে বলল সেলিম।
এসে হাত ধরল রাবু। ‘অন্তত একটা বিস্কুট আর চা খেয়ে যাও।’
নরম হলো সেলিম। ডাইনিং টেবিলে এসে বসল।
‘শোন, এই ডিমপোচ আর পাউরুটিটা খাও। আমি তোমার সব কথা শুনব এখন থেকে।’
কোনো কথা বলল না সেলিম।
‘সত্যি বলছি, বিশ্বাস কর।’
চুপ করে রইল সেলিম। আস্তে আস্তে রাগ কমছে।
‘এখন থেকে ঘরের সব ডিশিসন আমি নেব।’ রুটিতে মাখন মাখাতে মাখাতে বলল রাবু।
‘বুয়াকে বেতন দেয়া, কাপড় শুকাতে দেয়া আর উঠানো, রান্না ইত্যাদি কাজ আমিই করব।’
‘আর আমার ভাগে কী কী দিলে?’ রুটি হাতে নিল সেলিম। কামড় বসাল তাতে।
‘এই যেমন দামি দামি আসবাব কেনা, গহনা বানানো, ফ্ল্যাটের ভাড়া দেয়া, অনলাইনে শপিং ইত্যাদি আমি ঘরের বউ হিসেবে ঘরে বসেই করব। আর তুমি বাইরের কাজগুলো করবে, যেমন ফ্ল্যাটের কিস্তি দেয়া, গহনা কেনার পর ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করা, শপিংয়ে গেলে ব্যাগ বহন, ব্যাংক থেকে বাসার খরচের টাকা এনে আমার হাতে দেয়া ইত্যাদি সব বাইরের কাজ এখন থেকে তুমিই করবে, কেমন?’ হাসিমুখে বলল রাবু।
খক খক করে কেশে উঠল সেলিম। খাবার মাঝখানে আটকে গেছে, ঠিক করতে পারছে না—পেট নামক ‘ঘরে’ যাবে না মুখের ‘বাইরে’ চলে আসবে।
