ডেঙ্গু লইয়া যেই আতঙ্ক গত দুই মাস ধরিয়া জনমানসে বিস্তার লাভ করিয়াছে, তাহা ব্যাপক আলোচনার পর এখন যেন অনেকটাই ভাটা পড়িয়াছে। জীবাণুর উপর যেমন একই ঔষধ বারংবার প্রয়োগ করিলে ঐ জীবাণু ঔষধ-প্রতিরোধী হইয়া পড়ে, তেমনি ডেঙ্গুর নিত্যসংবাদ এখন অনেকটাই যেন আতঙ্ক-প্রতিরোধী হইয়া গিয়াছে। অথচ এখনো ডেঙ্গুতে আক্রান্তের গ্রাফ যেইভাবে কিয়ত্খানিক নামিবার পর আবার ঊর্ধ্বমুখী হইতেছে—তাহার পরও ডেঙ্গু এখন আর টক অব দ্য কান্ট্রি নহে। নূতন ইস্যু আসে, চাপা পড়িয়া যায় পুরাতন ইস্যু; কিন্তু ডেঙ্গু ইস্যু এত সহজে ছাড়িবার পাত্র নহে। কারণ, ২০০০ সালে ডেঙ্গু আবির্ভাবের পর এইবারের মতো সারাদেশে আর কখনো ছড়াইয়া পড়ে নাই এই জ্বর। এখন অবধি ১৯৭টি মৃত্যুর তথ্য পাইয়াছে আইইডিসিআর। আর বেসরকারি হিসাবে এই মৃত্যুর সংখ্যা ২১৫। সরকারের তথ্য অনুযায়ীই সারাদেশে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হইয়া হাসপাতালে চিকিত্সা লইয়াছে, প্রতিদিনই মৃত্যুমিছিলে নাম লেখাইতেছে কেহ না কেহ।
ডেঙ্গুর প্রকোপ ব্যাপক আকারে দেখা দেওয়ার পর মশা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি জোরেশোরে আলোচনায় আসে। তবে তাত্পর্যপূর্ণভাবে এই আলোচনা প্রধানত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মশকনিধন কর্মসূচিকেন্দ্রিক; কিন্তু ৬৪ জেলায় ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হইবার পর এখন বলা হইতেছে—ডেঙ্গুর সমস্যা শুধু ঢাকা শহরের নহে, সারাদেশের। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদে জানা গিয়াছে, এত দিন ধারণা করা হইত—শহরে এডিস ইজিপটাই প্রজাতির মশা কেবল ডেঙ্গু ছড়ায়; কিন্তু অতিসম্প্রতি জানা গিয়াছে, এডিস অ্যালবোপিকটাস প্রজাতির মশা গ্রামাঞ্চলে ডেঙ্গু ছড়াইতেছে। অথচ এই মশা নিয়ন্ত্রণ কিংবা ধ্বংসে দেশে কেন্দ্রীয় কোনো প্রতিষ্ঠান বা কর্মসূচি নাই। মশার প্রজননস্থল, ধরন, প্রজাতি, সংখ্যা, কোন ধরনের কীটনাশকে মশা মারা যায়, কোন ধরনের রোগের জীবাণু বহন করে—এই সকল বিষয় লইয়া যাহারা গবেষণা করেন, সেই কীটতত্ত্ববিদের সংকট রহিয়াছে দেশে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখা সূত্রে জানা গিয়াছে, দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনে কোনো কীটতত্ত্ববিদ নাই। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানেও (আইইডিসিআর) একই অবস্থা। স্থানীয় পর্যায়ে মাত্র ২৩-২৪ জেলায় কীটতত্ত্ববিদ আছেন। তবে তাহাদের বড়ো একটি অংশ টেকনিশিয়ান হইতে পদোন্নতি পাইয়া কীটতত্ত্ববিদ হইয়াছেন। বর্তমান আইইডিসিআর পাকিস্তান আমলে ছিল ম্যালেরিয়া ইনস্টিটিউট। ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ তথা মশক নিধন করা ছিল তাহাদের অন্যতম কাজ। বিশ্বব্যাপী মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির কারণে ম্যালেরিয়া কমিয়া আসায় ভাটা পড়িয়া গিয়াছে মশা নিয়ন্ত্রণেও। জানা গিয়াছে, ১৯৩২ সাল হইতে এখন অবধি বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ১২৩ প্রজাতির মশা শনাক্ত হইয়াছে। এইগুলির মধ্যে ২২ প্রজাতির মশা নানা ধরনের রোগ ছড়ায়; কিন্তু এইসব মশার চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য এক নহে। কোন ধরনের মশা কোথায় কী পরিমাণ আছে, তাহার স্পষ্ট কোনো তথ্য নাই কোথাও।
সুতরাং, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতো আমরাও মনে করি, এখন প্রয়োজন একটি কেন্দ্রীয় মশকনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান। আর মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম নিয়মতান্ত্রিকভাবে চালাইতে হইবে বত্সরব্যাপী। নচেত্ সারা দেশে মশাবাহিত রোগ আগামীতে আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করিতে পারে।
