অকুতোভয় সাংবাদিক সিরাজউদ্দিন হোসেন

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:৫৫

শাহাবুদ্দিন ভুইয়া

একাত্তরের ১০ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হায়েনার দল সিরাজ ভাইকে তুলে নিয়ে যায়। তিনি আর ফিরে আসেননি। বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া সিরাজ ভাই শৈশবে পিতৃহারা হন এবং শিক্ষার উদগ্র বাসনা থাকাতে আত্মীয়-স্বজন, এর বাড়ি, ওর বাড়ি থেকে খেয়ে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কলকাতায় গিয়ে আইএ এবং বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। সেখানেও নিরাশ্রয় সিরাজ ভাইয়ের পড়ার খরচ জোগানো এবং থাকা-খাওয়া নিয়ে চরম কষ্টের মধ্যে কাটাতে হয়। ছাত্রাবস্থাতেই ১৯৪৭ সালে শুভাকাঙ্ক্ষী সাংবাদিক আহম্মদ হোসেন সিরাজ ভাইকে নিয়ে যান আজাদ পত্রিকার মোহাম্মদ মোদাব্বরের কাছে। মাত্র ১৫ দিনের শিক্ষানবিসে তার বেতন ধার্য করা হয় সিনিয়র সাব এডিটরের। দেশভাগের পর আজাদ ঢাকায় চলে আসে। কিছুদিন পর আসেন সিরাজ ভাইও। আজাদের কম-অনুকূল পরিবেশের মধ্যেও তার রাজনৈতিক সত্তার বিকাশ ঘটতে থাকে। আর এই সত্তার পুরোটাই ছিল বাংলার বঞ্চিত সাধারণ মানুষের স্বার্থকে ঘিরে। আজাদে তার বেশিদিন টিকে থাকা সম্ভব হয়নি। সিরাজ ভাই বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারে বিশ্বাস করতেন। আর মওলানা সাহেব চাইতেন মুসলিম লীগের মেনিফেস্টো বাস্তবায়ন করতে।

ফয়েজ আহমেদের লেখা থেকে জানা যায়, ১৯৫৪ সালের ১১ জানুয়ারি অন্তত অর্ধদিনের জন্য হলেও সেই যুক্তফ্রন্ট দ্বিখণ্ডিত হয়েছিল। প্রধান কারণ ছিল, নির্বাচনে ফ্রন্টের প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে। কিছু ছাত্র সদরঘাটস্থ ফ্রন্টের কার্যালয়ের সামনে পছন্দমতো প্রার্থীকে মনোনয়ন দানের দাবিতে উচ্চৈঃস্বরে স্লোগান দিতে থাকে। বিষয়টিকে অবমাননাকর মনে করে ক্ষুব্ধ শেরে বাংলা তার টিকাটুলির বাসভবনে চলে আসেন। প্রচার করা হয়, হক সাহেব নাকি বলে গেছেন, আমি যুক্তফ্রন্টের বৈঠকে আর আসব না। মুসলিম লীগ তথা মওলানা আকরম খাঁ এই নাজুক পরিস্থিতির পূর্ণ সুযোগ নিতে সচেষ্ট হন। তিনি আজাদের রিপোর্টার সন্তোষ বসাককে ডেকে যুক্তফ্রন্ট ভাঙনের সংবাদ মুসলিম লীগের দৃষ্টিকোণ থেকে খুব বড় করে লেখার নির্দেশ দেন। রিপোর্ট লেখা হলে মওলানা সাহেব তার ওপর লিখে দেন, “যাবে”। তখন আজাদে রাতের শিফটে দায়িত্বে ছিলেন সিরাজ ভাই। টেবিলে তিনি স্পাইকে গোজা শেরেবাংলার বক্তব্য লেখা একটি কাগজ পেয়ে যান। বক্তব্যটি ছিল: যুক্তফ্রন্ট ভেঙে যাওয়ার প্রচারণা মিথ্যা। এ, কে, ফজলুল হক যুক্তফ্রন্ট থেকে পদত্যাগ করেননি। খবরটি রিলিজ করেছিলেন এ.পি.পি-এর ঢাকা অফিসের প্রধান এনায়েতুর রহমান। সে রাতে অকুতোভয় সিরাজ ভাইয়ের সাহস না থাকলে পরিস্থিতি অন্য রূপ নিতে পারত। তিনি খাঁ সাহেবের রিপোর্টটি ড্রয়ারে রেখে শেরে বাংলার বক্তব্যই প্রথম পৃষ্ঠায় ছেপে দেন। পরের দিন সকালে অফিসে বসতেই তার হাতে একটি খাম আসে। তাতে লেখা ছিল : আপনার চাকরির আর প্রয়োজন নেই। এরপর, নিশ্চয়ই ঐশী ইশারাতেই, দৈনিক ইত্তেফাকে কিংবদন্তী সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সহচর হিসেবে দেখা যায় সিরাজ ভাইকে। দু’জনের লক্ষ্য একই, শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে বাংলার সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা করা। কোনোদিন বঙ্গবন্ধুর জনসভা থাকলে রাতে অফিসে এসেই ডাকতেন সংশ্লিষ্ট রিপোর্টারকে। রিপোর্টটি একনজর দেখেই পাশে সরিয়ে রেখে নিজে লেখা শুরু করতেন। বঙ্গবন্ধুর কথাগুলো কিভাবে সর্বাঙ্গ সুন্দর এবং পাঠক-বান্ধব করা যায়, সে কৌশল সিরাজ ভাইয়ের জানা ছিল।

কে.জি. ভাইয়ের লেখা থেকে আরেকটি দৃষ্টান্ত দেই। ১৯৬৯ সালে তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে যে গণজাগরণের সূত্রপাত হয়, তার সার্থক প্রতিফলন ঘটে ইত্তেফাকের পাতায়। আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে বঙ্গবন্ধুসহ সকল অভিযুক্ত মুক্তি লাভ করেন। তখন আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রণয়ন এবং কিভাবে তাদেরকে সাহায্য করা যায়, বঙ্গবন্ধু তার বিস্তারিত রিপোর্ট প্রণয়ন করার জন্য একটি কমিটি গঠন করেন। কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া এবং আহ্বায়ক সিরাজউদ্দিন হোসেন। এ দায়িত্ব সিরাজ ভাই অত্যন্ত সফলভাবে সম্পাদন করেন। অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রণয়ন, সম্পাদকীয় এবং উপসম্পাদকীয় লেখা এবং অনুবাদ কার্যে তার হাত ছিল সমান দক্ষ। তিনি নির্দিষ্টভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সদস্য ছিলেন না। তবে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের ওপর ছিল প্রগাঢ় আস্থা।

সিরাজ ভাই চলে যাওয়ার পর আটটি পুত্র সন্তান নিয়ে নুরী ভাবী (মোসাম্মত্ নুরজাহান সিরাজী) অকুল পাথারে পড়ে যান। তবে আল্লাহ্র অশেষ রহমত, সেই আটজনই আজ জীবনে বিশেষ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে চলেছে। সবশেষে জানাতে চাই আমার জীবনে সিরাজ ভাইয়ের নিয়ামকের ভূমিকার কথা। ১৯৬০ সালের জুলাইয়ের শেষদিকে ফরিদপুর থেকে ঢাকা আসি। হাতে আইএ পাসের একখানি সনদ আর পকেটে ৪৫টি টাকা। আত্মীয়তাসূত্রে দৈনিক সংবাদের কর্মী আনোয়ার হোসেনের জিন্দাবাহার সেকেন্ড লেনের মেসে উঠি। অবস্থা এমন যে, হরিপদ কেরানির মতো যেকোনো একটি চাকরি পেলেই খুশি। কিন্তু আনোয়ার হোসেন পত্রিকার লোক বলে পরামর্শ দেন, একটি দরখাস্ত নিয়ে ইত্তেফাকের সিরাজ ভাইয়ের বাসায় যেতে। মুহূর্তে আল্লাহ্ আমার জীবনের পথ নির্ধারণ করে দেন। যাই সেই বাসায়। আবেদন ফলপ্রসূ হয়। সিরাজ ভাই শুধু রাতের শিফটে এমনভাবে আমার ডিউটির ব্যবস্থা করে দেন যাতে দিনে জগন্নাথ কলেজে ক্লাস করে বিএ ডিগ্রি নিতে পারি।

সেই শুরু থেকে ৪৮ বছর এই পত্রিকায় ছিলাম। ইত্তেফাকের বেতন-ভাতা দিয়েই ছোট দুটি ভাই এবং নিজের দুই সন্তানের উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সম্ভব হয়। ছোটবেলায় বাবা-মা হারানো শাহাবুদ্দিনের বর্তমানে স্থাবর-অস্থাবর যা কিছু অর্জন তার সব কিছুর মূলেই ইত্তেফাক।

লেখক : সাংবাদিক