হাওরের জীবন

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৮:০৮

৪শ’র বেশি হাওর আছে বাংলাদেশে। একেক মৌসুমে হাওরের রূপ একেকরকম। ঋতু পাল্টালে পাল্টায় সেখানকার মানুষের জীবনযাপনের চিত্র। কখনো টইটুম্বুর পানিতে নৌকা নিয়ে চলাচল, আবার কখনো শুকনো হাওরে সবজি চাষ। শীতে অতিথি হয়ে আসে হাজারো পরিযায়ী পাখি। আর সারাবছর পর্যটকরা তো লেগেই থাকেন! কিন্তু তারা যেকোনো পরিস্থিতি বা অবস্থায় নিজেদের মানিয়ে নেয়। এ এক অদ্ভুত ক্ষমতা! সেসব মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজন—লিখেছেন তাহমিদ আহমেদ শুভ্র

 

 

হাওরের হাসি, হাওরের কান্না

হাওর এলাকা দূর থেকে দেখতে যতটা মনোমুগ্ধকর, উদার, বিস্তীর্ণ খোলামেলা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর মনে হয়, কাছ থেকে দেখলে ঠিক ততটাই এ হাওর এলাকার জীবনমান অনিশ্চিত ও দুর্বিষহ। এখানকার মানুষ জন্মের পর থেকে দুর্যোগপূর্ণ পরিবেশের সঙ্গে সংগ্রাম করে টিকে থাকেন। এই দুর্যোগ কখনো মানবসৃষ্ট, কখনো প্রাকৃতিক।

হাওর এলাকা মানুষের জন্য কখনো আশীর্বাদ, আবার কখনো অভিশাপ। ২০১৭ সাল সুনামগঞ্জের জন্য অভিশাপ হয়েই এসেছিল। সুনামগঞ্জ জেলায় একমাত্র বোরো ফসল পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় প্রতিটি হাওরপাড়ে খাদ্য সঙ্কট দেখা দিয়েছিল। আবার কখনো কখনো এই হাওরই আশীর্বাদ হয়ে আসে। কৃষকের মুখে ফোটে তৃপ্তির হাসি।

ভরা হাওরে মাছ ধরে শুধু পেশাজীবীরা। টইটম্বুর হাওরে তাদের জীবিকানির্বাহ হয় এখানকার মাছ দিয়েই। সারাদিন মাছ ধরে শেষ বিকেলে সেগুলো নিয়ে যায় কাছের কোনো বাজারে। তবে এসব মাছে দাম খুব বেশি নয়। কারণ যারা ক্রেতারা তারাও হাওরের মানুষ। খুব বেশি স্বচ্ছল মানুষ তো শহরে পাড়ি জমিয়েছেন। এখানো যারা থাকেন তারা একে অপরের দুঃখ বোঝেন। সবাই জানেন সবার হাঁড়ির খবর।

যখন হাওরের কোথাও কোথাও পুকুর-জলাশয়ের পানি একেবারেই শুকিয়ে যায় তখন সেসব স্থানে জল-কাঁদায় একাকার হয়ে দল বেঁধে নেমে পড়ে কিশোর থেকে শুরু করে বৃদ্ধরাও। কেউ কেউ জালের সাহায্যে, আবার কেউ পুকুরে কাঁদা হাতড়িয়ে মাছ ধরতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সকাল, দুপুর, বিকেলে বিরামহীনভাবে চলে মাছ ধরা। এ যেন এক মহোত্সব।

 

কেউ অসুস্থ হলে...

হাওরের বিশাল জলরাশিতে চলতে চলতে আমরা এক সময় থামলাম তাহিরপুরের জয়পুর গ্রামে। হাওর পাড়ের এ গ্রাম দেখে সত্যি বিস্মিত হলাম সবাই। ছোট ছোট কাঁচা ঘরগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা যেন লাগানো। প্রায় সব ঘরের সঙ্গে খোলা টয়লেট। স্বাস্থ্য সেবার সুযোগ এখানে মেলে না। কেউ অসুস্থ হলে তাকে নৌকায় নিয়ে যেতে হয় তাহিরপুর উপজেলা সদরে। একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। তবে এখানকার শিশুদের বিনোদনের সুযোগ নেই বললেই চলে।

কথা হলো এখানকার বাসিন্দা ফয়েজ করিমের সঙ্গে। বয়স প্রায় ৬০ বছর। নানা বিষয়ে কথা বলতে বলতে তুললাম চিকিত্সার কথা। তিনি জানান, গ্রামে একজন ডাক্তার আছেন। তবে তার তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। তবে সিরিয়াস কোনো অসুখ হলে যেতে হয় তাহিরপুরে। যাতায়াত থেকে শুরু করে ওষুধ কেনা পর্যন্ত অনেক খরচ হয়ে যায় তাদের। রাহিমুল্লাহ নামের গ্রামের এক তরুণ বলেন, ‘অসুখ যাই হোক, নাপা ট্যাবলেট আর কয়েকটা সিরাপ ধরিয়ে দেয় আমাদের ডাক্তার।’ একথা শুনে সবাই জোর গলায় হাসলাম, সেইসঙ্গে তাদের করুণ গল্প শুনে খারাপও লাগলো।

 

হাওরে বিয়ে

দেশের সবচেয়ে বড় জলাভূমি টাঙ্গুয়ার হাওর। এই হাওর লাগোয়া ছোট-বড় প্রায় ৮৪টি গ্রাম রয়েছে। টাঙ্গুয়া পানিতে টইটুম্বুর হলেই বিয়ের ধুম লাগে গ্রামগুলোতে। প্রায় প্রতিদিনই হাওরের কোনো না কোনো গ্রামে থাকছে দু-তিনটি বিয়ের আসর। এ বছর জৈষ্ঠ্য মাসের শুরু থেকেই আরম্ভ হয়েছে এসব বিয়ের আয়োজন। এখনো আয়োজন চলছে পুরোদমে। হাওরের হিন্দু-মুসলিম সব গ্রামেই বইছে বিয়ের আনন্দ।

চিরাচরিত নিয়মেই ভরা বর্ষায় হাওরের বিশাল জলরাশিতে এবারো দেখা মিলছে বাহারি সাজে সজ্জিত অসংখ্য বিয়ের নৌকার। আট-দশটা নৌকা মিলে তৈরি হয় এক-একটা বহর। এসব বিয়েতে বর্ণিল সাজে সাজানো হয় বরযাত্রীদের নৌকা। নৌকায় গেটও থাকে। আবারো কোনো বিয়ের নৌকায় দেখা যায় আধুনিক বাদ্যযন্ত্র। আগেকার দিনের মতো শুধু মাইক বাজিয়ে বিয়ের বজরা যেতে দেখা যায় না। পাশাপাশি বর-কনের বাড়ি সাজানো হয় আলোকসজ্জায়। চলে ভাটির সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও ঐতিহ্যবাহী ধামাইল গান।

এ বছর যখন টাঙ্গুয়ায় ঘুরতে গিয়ে কথা হয় একটি বিয়ের বহরের কিছু লোকের সঙ্গে। জানা যায়, বরের বাড়ি নারকিলা গ্রামে। বরের ভাই সুদিন তালুকদার বলেন, ‘আমার পরিবারের সবকিছুই নির্ভর করে একমাত্র বোরো ফসলের ওপর। ফসল ভালো হলে আনন্দের সঙ্গে ছেলে ও মেয়েদের বিয়ে হয় গ্রামজুড়ে।’

 

হাওরের গান

হাওরে সারাবছর উত্সব লেগে থাকলেও ভরা বর্ষায় যেন আসরগুলো ভিন্নমাত্রা পায়। হাওরাঞ্চলের গ্রামগুলোতে প্রতিদিনই বসে বিচিত্র সব গানের আসর, উত্সবের রঙ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। পানির বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন সামাজিক অনুষ্ঠানের ধুম পড়ে তখনই চারদিকে শোনা যায় ধামাইল গানের সুর। প্রখ্যাত লোকগীতিকার রাধারমণ, প্রতাপরঞ্জন তালুকদারদের লেখা কত কত ধামাইল গান ফেরি করে বেড়ান গ্রামীণ নারীরা। ধামাইল গানের উত্পত্তি হাওরাঞ্চলে। তাই এখানে এর রূপ-রঙয়ের পরিধিটাও ব্যাপক।

বর্ষায় অলস সময় কাটাতে গ্রামের কেউ কেউ যাত্রাগান লিখে আরো কয়েকজনকে নিয়ে সেটা মঞ্চায়ন করেন। কেউবা গান লিখছেন আবার অন্য একজন সেটাতে সুর দিয়ে আসর জমিয়ে তুলছেন। কেউ আবার দূর-দূরান্তের নামীদামি বাউলশিল্পীদের এনে রাতের পর রাত বসাচ্ছেন গানের আসর। এভাবেই হাওরে গানের জন্ম ও উত্থান। পুরো বর্ষাজুড়ে গ্রামীণ মানুষ এভাবেই নানা গান ও উত্সব আয়োজনে সময় কাটান। যে বছর বর্ষায় পানি বেশি হয় সেই বছর মানুষের দুর্ভোগেরও শেষ থাকে না। কারণ ঝড়, বৃষ্টি আর বাতাসের ঝাপ্টায় পানির প্রমত্তা ঢেউ ভেঙে নিয়ে যায় বাড়িঘর। ঝড়-ঝঞ্ঝাট মোকাবিলা করে বুক চিতিয়ে পথ চলেন হাওরের মানুষ।

এই সময়ে টইটুম্বুর হাওরে ‘ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খি নাও’ সুর তুলে দিনভর চলে নৌকাবাইচ। সে বাইচে যোগ দেন আশেপাশের গ্রামের হাজারো মানুষ। যখন শেষ বিকেলের সূর্য টুপ করে ডুব দেয় হাওরের পানিতে তখন চারপাশে নেমে আসে সন্ধ্যার নীরবতা। সেই নীরবতা ভাঙে বাউলের একতারার সুর কিংবা কোনো লোকগায়কের সুকণ্ঠি গায়কীতে। এরপর রাতভর ঢোল, খোল, করতাল, বেহালাসহ নানা বাদ্যযন্ত্রের মনোহর তালে নাচে গ্রামীণ মানুষের মন।