কানিজ আলম
ঋতু বদলের সঙ্গে সঙ্গে আলতাদিঘীর প্রকৃতিও বদলায়। যতবার যাই ততবার নতুনরূপে আবিষ্কার করি জায়গাটিকে। এই বর্ষায় গিয়ে আরেকবার অবাক হলাম! দিঘী ভরা টলটলে কাকচক্ষু জলে কয়েক লাখ পদ্ম ফুল। ভাবলাম, ইশ! এই জায়গাটা যদি লুকিয়ে রাখতে পারতাম!
দিঘীর ধারে যাওয়ার আগেই তো মন ভরে যায়। উদ্যানে ঢুকতেই চোখে পড়ে নিখাদ বন, ঘন অন্ধকার, চারপাশের মিহি সবুজ, নীরব ও নির্জন গ্রামের পথ। সারিসারি শালবন পেরিয়ে চিকন পিচঢালা রাস্তা ধরে যেতে যেতে চোখ আটকে যাবে এর অপার সৌন্দর্য আর নীবর মুগ্ধতায়। চারদিক একদম সনসান। পিনপতন নীরবতার মাঝে শুকনো পাতার পতনধ্বনিতে বুক হালকা ভয়ে আঁতকে উঠবে।
মাথার ওপর থেকে আপনাকে আপন সুরে হয়তো কোনো ডাহুক গান গেয়ে শোনাবে। প্রকৃতির নিসর্গ স্নিগ্ধতায় চোখ বুজে আসবে পরম প্রশান্তিতে। মুগ্ধতায় জুড়াবে নয়ন। শালবনের মাঝ দিয়ে একেবেঁকে চলা মেঠোপথের অপর প্রান্তে বাস করে সাওতাল আদিবাসীরা। কোনো ললনার মাথায় করে বয়ে নিয়ে যাওয়া জ্বালানি কাঠ দেখে হয়তো থমকে দাঁড়াবেন সংগোপনে। সবুজ গাছের মাঝ দিয়ে চলতে চলতে পেয়ে যাবেন বিশাল এক দিঘী।
রাজা বিশ্বনাথ জগদ্দল বিহার প্রজাদের জলের কষ্ট নিবারণের জন্য খনন করেন বিশাল এই দিঘীটি। রাজা ঘোষণা করেছিলেন, রানি যতক্ষণ না হাঁটতে হাঁটতে তার পা ফেটে রক্ত বের হবে ততক্ষণ তিনি হাঁটবেন। যেখান থেকে রক্ত বের হওয়া শুরু হবে, হাঁটা শুরুর জায়গা থেকে সেখান পর্যন্ত দিঘী খনন করা হবে। তিনি হাঁটতে শুরু করলেন। সবাই বুঝে গেলেন এত সহজে রানির পা ফেটে রক্ত বের হবে না। তখন পেছন থেকে কেউ একজন রানির পায়ে আলতা ঢেলে দিয়ে বললেন রক্ত বের হচ্ছে! রানি থেমে গেলেন। তার হাঁটার শুরু থেকে সেই আলতারাঙা পা পর্যন্ত দিঘী খোড়া হলো। সেই থেকে নাম হলো আলতাদিঘী।
না, আপনার পদযুগল আটকাতে হবে না। কিন্তু আপনার আঁখিযুগল আটকে যাবে পদ্ম ফুলের সৌন্দর্য আর পদ্ম পাতার ওপরে আটকে থাকা জলের চাকচিক্যতায়। কাছে গিয়ে বসতেই দেখি বড় বড় পদ্ম পাতার ওপর মুক্তোদানার মতো জলের ফোটা সূর্যের আলোর ঝিলিকে ঝলমল করছে। এক-দুটি পাতায় নয়, হাজার হাজার পদ্ম পাতার ওপরে এমন জলের ঝিলিক পুরো দিঘীকেই যেন এক মুক্তোর আঁধার বানিয়ে ফেলেছে! কতক্ষণ ঠাঁয় বসেছিলাম জানি না। তবে দিঘীর অপর পাশের শালবনের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলোর ঝলকানি চোখে পড়তেই উঠে পড়েছিলাম। রোদ থেকে উঠে পড়ে এবার দিঘীর পাড় দিয়ে ধীর ধীরে হেঁটে যেতে শুরু করলাম, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত।
থাকা-খাওয়া
ঢাকা থেকে সড়কপথে সরাসরি নওগাঁ যাওয়া যায়। ঢাকার গাবতলী বা কল্যানপুর থেকে বাসে করে নওগাঁ যেতে পারেন। এছাড়াও ট্রেনে সান্তাহার জংশনে নেমে সেখান থেকে সহজেই নওগাঁ যাওয়া যায়। এই উদ্যানটি নওগাঁ জেলায় হলেও যাতায়াত জয়পুরহাট দিয়ে সহজ। জয়পুরহাট জেলা সদর থেকে আলতাদিঘীর দূরত্ব প্রায় ২২ কি. মি। আর নওগাঁ থেকে দূরত্ব ৫৬ কি. মি। জেলা সদর থেকে প্রথমে যেতে হবে ধামইরহাট। সেখান থেকে অটোরিকশায় আলতাদিঘী।এই উদ্যানে থাকার সুব্যবস্থা নেই। সারাদিন বেড়িয়ে জয়পুরহাট বা নওগাঁ শহরে এসে থাকতে পারেন। নওগাঁ শহরে থাকার জন্য সাধারণমানের কিছু হোটেল আছে।
