শিফারুল শেখ
‘তিনি কখনো এমন পরিস্থিতির কথা কল্পনা করতে পারেননি। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এই পদের জন্যই ব্যাকুল হয়েছিলেন। তিনি বরাবর ব্রিটিশ রাজনীতিতে সাফল্য পেয়েছেন। তিনি ভেবেছিলেন ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশ করে সূর্যালোকে দাঁড়িয়ে মিষ্টি হাসি হাসবেন। টেবিলের ওপরে উঠে কার্ড খেলবেন এবং তিনি কার্ডকে যেভাবে চালাবেন সেইভাবেই চলবে। কিন্তু মুশকিলটা হয়েছে, তিনি যে টেবিলের ওপর উঠেছেন সেই টেবিলটাই এখন তার মাথার ওপর ভেঙে পড়েছে’। সাত সপ্তাহের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা বরিস জনসনের অবস্থা সিএনএনের এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। বিশ্লেষক লিউক ম্যাকগির মতে, বরিস এখন ব্রেক্সিট জালে বন্দি। এখান থেকে বের হয়ে আসাটা তার জন্য খুবই দুষ্কর।
নিজের ভুলেই জেলে!
বরিস জনসনের দিনকাল ভালো যাচ্ছে না। ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে একের পর এক পরাজয়। বিশেষ করে পার্লামেন্টের সঙ্গে তার সংঘাতের মূল্য মোটেই সুখকর নয়। পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছেন, আগাম নির্বাচনসহ প্রত্যেকটা ভোটেই পার্লামেন্টে পরাজিত, নিজ দলের ২২ এমপির সমর্থন হারানো এবং রানিকে আইন ভাঙতে পরামর্শ দিয়েছেন। বর্তমান অবস্থা এমন, তিনি আর পার্লামেন্টে কোনো ভোটে জয় পাবেন না। কারণ বিরোধী দল তো শুরু থেকেই তার বিরুদ্ধে। আবার নিজ দলের বিদ্রোহী ২১ এমপিকে বহিষ্কার করেছেন। তারা কখনোই বরিসকে ভোট দেবেন না। ফলে নিজের ভুল সিদ্ধান্তের ফাঁদে আটকা পড়েছেন বরিস। চুক্তিহীন ব্রেক্সিট নিয়ে একগুঁয়েমি তাকে সত্যিকারের জেলেও পাঠাতে পারে বলে সতর্কবার্তা আগেই দেওয়া হয়েছে। এমনকি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনও বলেছেন, তিনি ব্রেক্সিট নিয়ে গণভোট দিয়ে ভুল করেছিলেন। তিনি দ্বিতীয় গণভোটের দাবি জানান।
তারপরও চুক্তিহীন ব্রেক্সিট!
অধিবেশন মুলতুবি হওয়ার আগে পার্লামেন্ট এক প্রস্তাব পাশ করে সরকারকে চুক্তিহীন ব্রেক্সিটের প্রস্তুতি সংক্রান্ত গোপন নথি প্রকাশ করতে বাধ্য করেছিল। গত বুধবার রাতে প্রকাশিত ছয় পৃষ্ঠার সেই ‘অপারেশন ইয়েলোহ্যামার’ নথিপত্র পড়ে এমন পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র সম্পর্কে জেনেছেন ব্রিটিশরা। নথি অনুযায়ী, চুক্তি ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ত্যাগ করলে ব্রিটেনের জনজীবন নানা ক্ষেত্রে ব্যাহত হবে। ইংলিশ চ্যানেল পেরোতে শুল্ক ও অন্যান্য জটিলতার কারণে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য ও ওষুধের সরবরাহ থমকে যাবে। ফলে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে। বিদ্যুতের মাশুলও আকস্মিকভাবে বেড়ে যাবে। সামাজিক অস্থিরতা, প্রতিবাদ-বিক্ষোভ পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা কঠিন হবে। গত ২ আগস্ট ওই নথি প্রস্তুত করা হয়। সমালোচকদের মতে, এই রিপোর্টের ফলে সরকারের প্রস্তুতির অভাবও স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সরকার অবশ্য দাবি করছে, যে রিপোর্ট লেখার পর থেকে প্রস্তুতি আরো জোরদার করা হয়েছে।
এমন পরিস্থিতির আশঙ্কা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রীর যে কোনো মূল্যে ৩১ অক্টোবর ব্রেক্সিট কার্যকরে প্রাণপণ চেষ্টার তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। এমনকি তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছেন বলে বিরোধীরা অভিযোগ করছেন। বিরোধী লেবার পার্টির ব্রেক্সিট বিশেষজ্ঞ কির স্টার্মার বলেন, সরকার সব হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করে ও মানুষকে অন্ধকারে রেখে অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করেছে। প্রায় এক মাস পার্লামেন্ট মুলতুবি রেখে বরিস জনসন আইন ভেঙেছেন বলে রায় দিয়েছে স্কটল্যান্ড হাইকোর্ট। সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে আবেদন করায় কাল মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট চূড়ান্ত রায় দেবে। সেই রায়ও সরকারের বিপক্ষে গেলে আবার পার্লামেন্টের অধিবেশন ডাকতে হবে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বরিস মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে রানিকে এত দীর্ঘ সময়ের জন্য পার্লামেন্ট মুলতুবি রাখার পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছিলেন এমন অভিযোগ জোরদার হয়েছে। যদিও তিনি অস্বীকার করেছেন।
চুক্তির আশা দেখছে না ইইউ
জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল বলেছেন, ব্রিটেন এখনো চুক্তিসহ ইইউ ত্যাগ করতে পারে। এজন্য জার্মান সরকার সবরকম উদ্যোগ নিতে প্রস্তুত। তবে সেটা সম্ভব না হলেও জার্মানি চুক্তিহীন ব্রেক্সিটের জন্যও প্রস্তুত। তার মতে, ব্রিটেনের বিদায়ে ইউরোপ কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়লেও নতুন করে শক্তিবৃদ্ধির সময় এসেছে। ইইউ’র প্রধান মধ্যস্থতাকারী মিশেল বার্নিয়ে বলেছেন, আগামী ১৭ ও ১৮ অক্টোবর ইইউ শীর্ষ সম্মেলনের আগে সমঝোতা সম্পর্কে আশাবাদের কোনো কারণ নেই। তার মতে, ব্রিটিশ পার্লামেন্ট চুক্তিহীন ব্রেক্সিট এড়াতে আইন প্রণয়ন করলেও তা কার্যকর হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় আছে। ভবিষ্যতে দুই পক্ষের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তির পূর্বশর্তও তুলে ধরেন বার্নিয়ে। থেরেসা মে সরকারের সঙ্গে ইইউর সব বোঝাপড়া মেনে চললেই চুক্তি সম্ভব হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় পার্লামেন্টের নেতারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তারা ব্যাকস্টপ ছাড়া ব্রেক্সিট চুক্তি মেনে নেবেন না। অথচ এই ব্যাকস্টপ নিয়েই ব্রিটেনে যত ঝামেলা। অবশ্য উপযুক্ত কারণ থাকলে পার্লামেন্ট অবশ্য ব্রেক্সিটের সময়সীমার আবেদন বিবেচনা করতে পারে। —সিএনএন ও ডয়চেভেলে
