বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলার পূর্বে বিষখালী ও পশ্চিমে বলেশ্বর নদী। দুই নদী ও সাগরের মোহনায় গড়ে উঠেছে হরিণঘাটা ও লালদিয়া বন। সুন্দরবন সংলগ্ন হরিণঘাটার মধ্য দিয়ে দুই ঘণ্টা পায়ে হেঁটে বন পার হয়ে গেলেই চোখে পড়ে লালদিয়া। বনের পূর্ব প্রান্তে সমুদ্রসৈকত, এছাড়াও রয়েছে সবুজে ভরা কেওড়াগাছ। এ গাছ উপকূলীয় এলাকার পরিবেশে রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে থাকে।
কেওড়া উপকূলীয় অঞ্চলের অতিপরিচিত ফল। সবুজ রঙের ফলের ওপরের মাংসল অংশটুকু স্বাদে টক। ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ। ফলটির রয়েছে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। রক্তে কোলেস্টেরল ও শরীরের চর্বি (ফ্যাট) কমায়। এতে কিছু এনজাইম আছে, যা বিশেষত বদহজমে উপকারী। টক স্বাদের এই ফল বহুকাল আগে থেকেই দক্ষিণাঞ্চলবাসীর কাছে জনপ্রিয়। কাঁচা ফল লবণ সহকারে খাওয়া যায়। এ ফল দিয়ে তৈরি কেওড়াজল বিভিন্ন রান্নায় ব্যবহার হয়। কেওড়ার চাটনি, টক আর ডাল রান্না অনেকেরই প্রিয়। অন্যদিকে সুন্দরবনে উত্পন্ন মধুর একটা বড় অংশ আসে কেওড়া ফুল থেকে। তাই এ গাছটি হয়ে উঠতে পারে লবণাক্ততায় আক্রান্ত কর্দমাক্ত জমির বিশেষ ফসল। এ গাছ উপকূলীয় মাটির ক্ষয় রোধ করে মাটিকে দেবে দৃঢ়তা ও উর্বরতা। কেওড়াগাছ সাধারণ বৃক্ষ প্রজাতি। গাছের শ্বাসমূল মাটির ওপরে উঠে আসে, প্রচুর ফল হয় গাছে। কেওড়া ফল দেখতে অনেকটা ডুমুরের মতো। হরিণঘাটাসহ বিষখালী ও বলেশ্বর নদের তীরবর্তী বনাঞ্চলের কয়েক হাজার বানর ও হরিণ কেওড়াগাছের পাতা ও ফল খেয়ে বাঁচে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সেলের এক গবেষণায় দেখা যায়, কেওড়া ফলে রয়েছে প্রায় ১২% শর্করা, ৪% আমিষ, ১.৫% ফ্যাট, প্রচুর ভিটামিন; বিশেষত ভিটামিন সি এবং এর ডেরিভেটিভসমূহ। কেওড়া ফল পলিফেনল, ফ্লাভানয়েড, অ্যান্থোসায়ানিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও আনস্যাচুরেটেড ওমেগা ফ্যাটি অ্যাসিড বিশেষ করে লিনোলেয়িক অ্যাসিডে পরিপূর্ণ। তাই ফলটি শরীর ও মনকে সতেজ রাখার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে কার্যকর। চায়ের মতো এ ফলে ক্যাটেকিনসহ বিভিন্ন ধরনের পলিফেনল প্রচুর পরিমাণে রয়েছে। এদেশে প্রাপ্ত ফলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পলিফেনল রয়েছে আমলকিতে, তারপরই কেওড়া ফলের অবস্থান।
কেওড়া ফলে আপেল ও কমলা ফলের তুলনায় অনেক বেশি পলিফেনল ও পুষ্টি উপাদান রয়েছে। পলিফেনল ডায়াবেটিক, ক্যান্সার, আথ্রাইটিস, হূদরোগ, অ্যালার্জি, চোখের ছানি, বিভিন্ন ধরনের প্রদাহসহ প্রভৃতি রোগ সৃষ্টিতে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে। আমলকি, আপেল ও কমলার তুলনায় কেওড়া ফলে পটাশিয়াম, আয়রন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ম্যাগনেশিয়াম ও জিংকের পরিমাণ বেশি। এ ফলের রয়েছে ডায়রিয়া প্রতিরোধী এবং ব্যথানাশক গুণ। ডায়রিয়া, আমাশয় ও পেটের পীড়ার জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়াকে কার্যকরভাবে দমন করতে সক্ষম। তাছাড়া কেওড়া ফলে রয়েছে প্রচুর পালমিটিক অ্যাসিড, অ্যাস্করবাইল পালমিটেট ও স্টিয়ারিক অ্যাসিড, যা খাদ্যশিল্পে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণে এবং তৈরি খাদ্য সংরক্ষণে ব্যবহূত হয়।
বনবিভাগের পাথরঘাটা রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, জোয়ার-ভাটা হয় এমন চরভরাটি জমিতে যদি বাণিজ্যিকভাবে কেওড়া চাষ করা হয় তাহলে বাঁধ ও পরিবেশ এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের পাশাপাশি এর কাঠ জ্বালানি ও ফল বাজারে বিক্রি করে লাভবান হওয়া সম্ভব। এখন পর্যন্ত কেওড়া গাছ ও ফল বিক্রি আইনত দণ্ডনীয়। বাণিজ্যিকভাবে এর চাষ করলে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার মানুষের জীবনযাত্রায় অর্থনীতির নতুন দিগন্তের সূচনা হতে পারে।
