হুমায়ূূন রশিদ চৌধূরী, সিলেট অফিস
আশ্বিনের বৃষ্টি মাখা রোদে জলের স্রোতে ভাসছে পাথর। পাথর ছুঁয়ে সেই জলরাশি খিল খিল শব্দে হাসতে হাসতে নেমে যাচ্ছে স্রোতঃস্বিনী পাহাড়ি নদীর বুক বেয়ে। সেই পাথরের ওপর আনন্দে-উল্লাসে লুটোপুটি খাচ্ছে হাজার নরনারী। শিশু-বৃদ্ধ কারো যেন আনন্দের কমতি নেই। কেউবা জলকেলি করছে। কেউবা পাথরের ওপর লম্বা হয়ে শুয়ে স্রোতের সঙ্গে পাথরের মিতালিপনা শুনছে। এমনি একটি নয়ন কাড়া প্রকৃতির অপ্সরা সিলেটের সীমান্তবর্তী এলাকার নাম ‘বিছনাকান্দি’।
চেরাপুঞ্জির কাছের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝরনা যখন বিছনাকান্দির পাথুরে বিছানার ওপর নেচে নেচে, হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ে তখন চোখ ও মন ভরে যায়। ‘এমন মনোরম স্পট বাংলাদেশে আছে, এখানে না আসলে বিশ্বাসই হতো না’—এই মন্তব্য করে যুক্তরাজ্য থেকে বেড়াতে আসা পলিন বলেন, এসব স্পটে পর্যটন সুবিধা দিলে অনেক লোকজন আসতো, আনন্দ পেতো।’
বহুকাল আগে থেকেই সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলা পাথুরে রাজ্য হিসাবে পরিচিত। এখানে কোটি কোটি টাকার পাথর বাণিজ্য হয় সারা বছর। মাটির নিচ থেকে বোল্ডার তোলে বিক্রয় হয়। পাথরের কোয়ারী রয়েছে এই উপজেলার বিছানাকান্দিতেও। ‘ফসল ফলানোর চেয়েও এক বিঘা জমি ভাড়া দিলে পাথর উঠিয়ে বড়ো লোক হওয়ার স্বপ্ন দেখে মানুষ’, বলেন গোয়াইনঘাট প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আলি হোসেন।’
তিনি বলেন ‘এখন নতুন ভাবে গোয়াইনঘাট পরিচিতি লাভ করছে ভ্রমণ পিপাসুদের মধ্যে। কারণ প্রকৃতি কন্যা জাফলং, রাতারগুল সোয়াম ফরেস্ট, জলপ্রপাতের পান্তুমাই, মায়াবতী ঝরনা জাফলং ঝরনা ও সমতল ভূমিতে বৃহত্তম জাফলং চা বাগানসহ অনেক পর্যটন কেন্দ্র সিলেটের সীমান্তবর্তী উপজেলা গোয়াইনঘাটে; কিন্তু অবকাঠামোগত সুবিধা আজও সেভাবে গড়ে ওঠেনি। সড়ক যোগাযোগের অব্যবস্থাপনাই প্রধান অন্তরায়।
স্কুল শিক্ষয়িত্রী পলমি ও গৃহিনী পান্না তাদের অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, বিছনাকান্দি আবারও পরিদর্শনে গেলে ভালো লাগবে না।
প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরিরত দেলওয়ার হোসেন এসেছিলেন পরিবারে অন্যদের নিয়ে বিছনাকান্দি দেখতে। তিনি বলেন, ‘বিছনাকান্দি দেখতে অপূর্ব। উপভোগ্য; কিন্তু ভাঙা রাস্তাঘাট গাড়ি পার্কিং-এর স্থানটির দুরবস্থা পর্যটকদের বেদনা দেয়।’ প্রকৃতিগতভাবে সৃষ্ট সৌন্দর্যের রানি গোয়াইনঘাটকে দেশ-বিদেশের পর্যটকরা বেছে নিয়েছেন। বছরের যে কোনো ছুটি ছাড়াও শুধু গোয়াইনঘাট উপজেলার পর্যটন কেন্দ্রগুলিতে প্রায় লাখো পর্যটকের সমাগম ঘটে; কিন্তু বঙ্গবীর-হাদারপার সড়কের যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক। স্থানীয়রা বলেন, আসন্ন শুকনো মৌসুমে বঙ্গবীর-হাদারপার সড়কের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলে আরো বেশি পর্যটক বিছনাকান্দি জলপ্রপাতে সমাগম ঘটবে।
এদিকে প্রকৃতি কন্যা জাফলংয়ে পর্যটকদের আগ্রহী করতে ইতিপূর্বে ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন সিঁড়ি নির্মাণ করা হয়। বিশেষ করে সাঁতার না জানা লোকদের পানিতে না নামতে উপজেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পক্ষ থেকে পৃথকভাবে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, ফেস্টুন ও ব্যানার দেওয়া হয়েছে। বিশেষ প্রাথমিক চিকিত্সা সেবার জন্য পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে কাজ করছে একটি মেডিক্যাল টিম। পর্যটকদের বাড়তি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, বিজিবি, ট্যুরিস্ট পুলিশ এবং আনসার বাহিনীর সমন্বয়ে প্রতিটি পর্যটন কেন্দ্রের জন্য আলাদা দলও গঠন করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিত কুমার পাল বলেন, দেশি ও বিদেশি পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত গোয়াইনঘাটের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে পর্যটকদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও সহযোগিতা প্রদানে উপজেলা প্রাশাসনের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
