উচ্চ আয়ের কর্মসংস্থান সৃষ্টিই বড়ো চ্যালেঞ্জ

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:৩৩

এম এ খালেক

অর্থনীতিবিদগণ এ ব্যাপারে একমত যে, শুধু রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানে চাকরি প্রদানের মাধ্যমে বেকার সমস্যা সমাধান তথা দারিদ্র্য বিমোচন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। উচ্চ আয়ের কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্র্য বিমোচন এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে হলে বেসরকারি খাতের পরিকল্পিত বিকাশ এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন একান্ত জরুরি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার প্রসঙ্গক্রমে বলেছেন, শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির মাধ্যমে বেকার সমস্যা নিরসন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বেকার সমস্যা সমাধান করতে হলে প্রতিটি হাতকে কর্মীর হাতিয়ারে পরিণত করতে হবে। কর্মক্ষম এক জন মানুষও যাতে বেকার না থাকে তার ব্যবস্থা করতে হবে। যেহেতু শুধু রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ করে দিয়ে বেকার সমস্যা নিরসন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়, তাই বর্তমান সরকার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে চাকরির পাশাপাশি আত্মকর্মসংস্থানের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকের মাধ্যমে দেশের পল্লি এলাকায় কৃষি ও পল্লি ঋণ নামে একধরনের বিশেষ ঋণদান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কৃষি ও পল্লি ঋণ সাধারণ কৃষি ঋণের মতো কোনো ঋণদান কার্যক্রম নয়। এই ঋণদান কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে পল্লি এলাকায় কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন ক্ষুদ্র উদ্যোগ গড়ে তোলার বিষয়ে আগ্রহী উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন করা। ব্যাংকের প্রচলিত ঋণদান কার্যক্রমের মধ্যে কৃষি ও পল্লি ঋণের সুদের হার সবচেয়ে কম। এই ঋণদান কার্যক্রম কাজে লাগিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নানা ধরনের ক্ষুদ্র উদ্যোগ গড়ে উঠছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে বর্তমানে যে ইতিবাচক রূপান্তর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে তার পেছনে কৃষি ও পল্লি ঋণের অবদান কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না।

চলতি অর্থবছরের জন্য প্রণীত জাতীয় বাজেটে প্রথমবারের মতো ‘স্টার্ট আপ বিজনেস’ নামে একটি বিশেষ খাত সৃষ্টি করা হয়েছে। ‘স্টার্ট আপ বিজনেস’ খাতের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সম্ভাবনাময় তরুণ (তরুণ-তরুণী) উদ্যোক্তাদের খুঁজে বের করে তাদের প্রশিক্ষণদানের ব্যবস্থা করা হবে। প্রশিক্ষণ শেষে যারা নিজেদের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত্ উদ্যোক্তা হিসেবে প্রমাণ করতে পারবেন, তাদের ব্যবসায়-শিল্প স্থাপনের জন্য প্রাথমিক পুঁজির জোগান দেওয়া হবে। এজন্য চলতি অর্থবছরের (২০১৯-’২০) জাতীয় বাজেটে ১০০ কোটি টাকার প্রাথমিক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। চাহিদা বৃদ্ধি পেলে এ খাতে ব্যয়-বরাদ্দের পরিমাণ আরো বাড়ানো হতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে সারা দেশব্যাপী সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দান এবং অর্থায়নের উদ্যোগ এটাই প্রথম। অবশ্য কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সীমিত পরিসরে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। কিন্তু সেটা জাতীয় পর্যায়ে তেমন একটা প্রভাব ফেলতে পারে না। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে যারা উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন তাদের অধিকাংশেরই প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছিল না। তারা ‘অন জব ট্রেনিং’-এর মাধ্যমে নিজেদের গড়ে তুলেছেন। কিন্তু অন্য সব পেশার মতো উদ্যোক্তা হিসেবে সফল হতে হলে প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। এই বিষয়টি উপলব্ধি করেই সরকার দেশব্যাপী উদ্যোক্তা উন্নয়নের লক্ষ্যে ব্যাপক প্রশিক্ষণ প্রদান এবং তাদের প্রাথমিক পুঁজি চাহিদা পূরণের জন্য অর্থায়নের ব্যবস্থা করেছেন।  বাংলদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (বিডা) ইতিমধ্যেই দেশব্যাপী সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা বাছাই কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। ‘উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও দক্ষতা উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় দেশব্যাপী প্রচারণা ও উদ্যোক্তা সংগ্রহ কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশব্যাপী ২৪ হাজার নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের দক্ষতা উন্নয়ন করা হবে। ইতিমধ্যেই দেশের ৬৪টি জেলায় প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা নিয়োগদান এবং অন লাইনে উদ্যোক্তা নিবন্ধন শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের রেটিং অনুযায়ী ইতিমধ্যেই নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। জাতিসঙ্ঘ বাংলাদেশকে প্রাথমিকভাবে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ চূড়ান্তভাবে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করবে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সেক্টরে এটাই সবচেয়ে বড় অর্জন। বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে কার্যকর মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালে উন্নত দেশে পরিণত হওার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে অঙ্গিকারবদ্ধ। এই অঙ্গিকার পূরণ করতে হলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার অন্তত ১০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।

বর্তমান সরকারের অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গিকার হচ্ছে, ‘যুব শক্তি, বাংলাদেশের সমৃদ্ধি’। এই স্লোগানের মাধ্যমে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার ক্ষেত্রে যুব সমাজকে কাজে লাগানোকে বোঝায়। বাংলাদেশ বর্তমানে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ অবস্থার মধ্যদিয়ে সময় অতিবাহিত করছে। একটি দেশের মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ বা তারও বেশি যখন কর্মক্ষম থাকে সেই অবস্থাকে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বলা হয়। অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন, ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ অবস্থা একটি জাতির জীবনে একবারই আসে। আবার কারো কারো মতে, হাজার বছরে একবার এই অবস্থার সৃষ্টি হয়। যারা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ অবস্থার সুফল সঠিকভাবে পরিকল্পিত উপায়ে কাজে লাগাতে পারে তারাই অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করতে পারে। কিন্তু এই অবস্থার সুযোগ সঠিকভাবে কাজে লাগাতে না পারলে তা একটি জাতির জন্য মারাত্মক ‘দায় বা অভিশাপ’ হয়ে দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশের ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ অবস্থা ২০৩০-২০৩২ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। কাজেই এই সময়ের মধ্যে আমাদের যুব শক্তিকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উচ্চ আয়ের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। সাধারণ চাকরির মাধ্যমে সবার জন্য উচ্চ আয়ের কর্মসংস্থান তো দূরে থাক সাধারণ মানের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করাও সম্ভব নয়। তাই উদ্যোক্তা অনুসন্ধান ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উদ্যোক্তা উন্নয়নের যে কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে তা খুবই তাত্পর্যপূর্ণ একটি উদ্যোগ। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের শিডিউল ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে কৃষি ও পল্লি ঋণ নামে যে ঋণদান কার্যক্রম পরিচালনা করছে তাকেও পর্যায়ক্রমে ‘স্টার্ট আপ বিজনেস’ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। এটা করা হলে তরুণ উদ্যোক্তা যারা প্রশিক্ষণ লাভ করবেন তাদের ব্যবসায় বা শিল্পোদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে পুঁজি স্বল্পতায় ভুগতে হবে না। কৃষি ও পল্লি ঋণ কার্যক্রম নানা কারণেই সঠিকভাবে কার্যকর হচ্ছে না। এতে যে সব অসঙ্গতি আছে তা দূর করা যেতে পারে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে নানা ধরনের ইতিবাচক রূপান্তর প্রক্রিয়া চলছে। এই রূপান্তর প্রক্রিয়ার সুযোগ করতে হবে। আগে দেখা যেত একটি পরিবারের এক জন বা দুই জন কাজ করছে আর অন্যরা বসে বসে খাচ্ছে। এখন পরিবারের প্রতিটি সদস্যই কাজ করতে চায়। আগে কোনো শিল্পকারখানা স্থাপন করলে প্রথমেই উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক বাজারের কথা বিবেচনায় রাখতে হতো। এখন অবস্থা সম্পূর্ণ পালটে গেছে। এখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারকে উপলক্ষ্য করেই যে কোনো শিল্পকারখানা গড়ে উঠতে পারে। আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী মহলও বাংলাদেশের এই পরিবর্তনের প্রতি দৃষ্টি রাখছে। তাই তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ যদি আগামী দিনের পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে টিতে থাকতে চায়, তাহলে প্রতিটি কর্মীর হাতকে উদ্যোক্তার হাতিয়ারে পরিণত করতে হবে।

n লেখক :অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক