>> মাহবুব নাহিদ
পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত বাংলাদেশ এক অনবদ্য অর্জন বুকে ধারণ করে যাবে। আমাদের শ্রেষ্ঠ সংগ্রাম—আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। কখনো হানাদারদের হিংস্রতার কথা শুনে কান্নায় চোখ ভিজে যায়, কখনো আমাদের বীরদের বিজয়ের গল্প শুনে গর্বে বুক ভরে ওঠে। আমাদের বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কিংবা কী ঘটেছিল তখন, তা সঠিকভাবে জানি না। সাংবাদিক ও কবি হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ১৫ খণ্ডের ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ :দলিলপত্র’ মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দালিলিক প্রমাণ। কিন্তু এটি সংগ্রহ করা এবং তার ইংরেজি ভাষাকে আয়ত্তে আনা কষ্টসাধ্য বিষয়। ১৫ খণ্ডের সেই যুদ্ধদলিল অনুবাদ করার এক অবিস্মরণীয় প্রয়াস হাতে নেন নাজমুল হাসান লিও নামের একজন। প্রথমে তিনি এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে এই যুদ্ধদলিল অনুবাদ করার আমন্ত্রণ জানান। সেই ফেসবুক স্ট্যাটাস বিপুল সাড়া জাগায়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়, দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ সংগ্রামের ইতিহাস নিয়ে কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয়ে এগিয়ে আসেন অনেকেই। গড়ে ওঠে একটি ভিন্ন ধরনের সংগঠন। তারা সেই সংগঠনেরও নাম দেন ‘যুদ্ধদলিল’। নাজমুল হাসান লিও সংগঠনের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত আছেন। আমাদের কথা হয়েছিল কার্যনির্বাহী পরিচালক জান্নাতুল মনিকার সঙ্গে। তিনিই জানিয়েছেন তাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বিষয়ে।
তারা নিজস্ব ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে দেন যুদ্ধদলিল। অনুবাদকের নামসহ ১৫ খণ্ডের অনুবাদ রয়েছে তাদের ওয়েবসাইটে। এই ১৫ খণ্ড অনুবাদ করতে তাদের সময় লেগেছে প্রায় দুই বছর। ২০১৫ সালে তাদের যাত্রা শুরু হয়। প্রথমেই তারা সকলের জন্য সহজবোধ্য করে হাতের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসেন এই যুদ্ধদলিল।
পরবর্তীকালে তারা এই যুদ্ধদলিল ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য হাতে নেন। এই যুদ্ধদলিল থেকেই বাচ্চাদের জন্য তারা প্রকাশ করেন প্রথম কমিক ‘একাত্তরের দেবদাস’। প্রায় ১০ হাজার বাচ্চাদের হাতে পৌঁছে যায় এই কমিক। ২০১৭ সালে তারা দ্বিতীয় কমিক প্রকাশ করেন, যার নাম ‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধ’। তাদের ওয়েবসাইট (www.juddhodolil.com) ছাড়াও রয়েছে একটি ফেসবুক পেজ ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ :দলিলপত্র থেকে বলছি’ রয়েছে। যেখানে প্রতিদিন সকাল ১১টায় এবং সন্ধ্যা ৭টায় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একটি পোস্ট দেওয়া হয়। যুদ্ধদলিল নামে তাদের একটি গুগল অ্যাপ রয়েছে। যেখানে ১৫ খণ্ডের যুদ্ধদলিল এবং বিভিন্ন ছবি পাওয়া যায়। তাদের ওয়েবসাইটে সাউন্ড ক্লাউড নামক একটি অপশন রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন রেকর্ডিং পাওয়া যায়, যা মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সম্বলিত। ওয়েবসাইটে রয়েছে সার্চ অপশন। যেকোনো তারিখ কিংবা এলাকার নাম দিলে চলে আসবে তথ্য। তৃতীয় ধাপের কাজের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে যুদ্ধদলিল। তারা এই ধাপে দেশের প্রতিটি উপজেলায় কাজ করবে। প্রতি উপজেলায় প্রতিনিধি বানানোর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাত্কার নিয়ে ভিডিও বানানোর কাজ চলছে। তাদের ‘মুক্তিযুদ্ধের দলিল নিয়ে লেখালেখি’ ও ‘Thoughts of freedom’ নামে দুটি ফেসবুক পেজ রয়েছে। যেখানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বিভিন্ন বিষয়ে আলোকপাত করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এই নিদারুণ প্রয়াস এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। যুগে যুগে যত প্রজন্ম আসবে তাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সঠিকভাবে তুলে ধরাই যুদ্ধদলিলের প্রত্যয়।
