অর্থনীতির ভিতরে নীরব রক্তক্ষরণ ঘটিলে তাহা রাষ্ট্রের অবয়বকে ক্রমশ ফ্যাকাশে করিতে থাকে। আর এই নীরব রক্তক্ষরণ ঘটিতে থাকে রাঘববোয়াল দুর্নীতিবাজ, ঋণখেলাপি এবং লুটেরাদের কারণে। ইহাদেরই বিষাক্ত নিশ্বাসে ক্রমশ ভারী হইয়া উঠিতেছে দেশের অর্থনীতির বাতাস। অথচ ইহারা যেন রাষ্ট্রক্ষমতার বারান্দায় হাঁটাচলা করিয়া বুঝাইতে চাহেন—তাহাদের টিকিটিও স্পর্শ করা হইবে না। যদিও সরকারপ্রধানের নিকট আমরা প্রায়শই শুনিতে পাই, যত শক্তিশালী হউক না কেন—ছাড় দেওয়া হইবে না কোনো লুটেরা কিংবা দুর্নীতিবাজকে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার লাইন যেন এইক্ষেত্রে পরিহাসের মতো আমাদের কানে অনুরণন তোলে—‘নাগিনীরা চারি দিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস,/ শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস—।’ প্রশ্ন হইল, কেন সরকারপ্রধানের কথা ব্যর্থ পরিহাসের মতো শোনাইবে? কেন বড়ো দুর্নীতিবাজরা ইহা মনে করিবেন যে, সরকারের যতোই অচিন্তনীয় ক্ষমতা থাকুক না কেন, সেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সদ্ব্যবহার তাহাদের উপর প্রযোজ্য হইবে না? কেন এই সকল লুটেরা ও দুর্নীতিবাজরা এমন আত্মবিশ্বাসে টগবগ করিবেন যে, ক্ষমতাশালী সরকার যাহাই চাউক না কেন—শুদ্ধিতার কড়া অ্যাসিডও তাহাদের গলাইতে পারিবে না? রাষ্ট্রের অন্ত্রের মধ্যে এইসকল প্রতাপশালী ফিতাকৃমি এমনভাবে ভেক ধরিয়া রক্ত চুষিতে থাকে যে, তাহারা যেন রাষ্ট্রের অন্ত্রেরই গুরুত্বপূর্ণ অংশ—ফিতাকৃমি নহে। কিন্তু সরকার তো জানে, তাহারা অন্ত্রের নাড়ি নহেন, ফিতাকৃমি—শরীরকে নীরবে রক্তশূন্য করিতেছে নিরন্তর।
ব্যাংকগুলির অবস্থা কতটা খারাপ তাহা সকলেই জানেন। তারল্য সংকট চরমে। তাহার মধ্যেই কোনো কোনো ব্যাংকের মালিক স্বয়ং নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করিয়া টাকা তুলিয়া লইয়া যাইতেছেন। এইসবের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ হইতেছে না। অথচ সত্ ও প্রকৃত উদ্যোক্তাগণের প্রতি অবিচার করা হইতেছে। তারল্য সংকটের চাপ আসিয়া পড়িতেছে ব্যাংকের ক্লায়েন্টের উপর। এমনকি ক্লায়েন্টের উপর নিয়মের বাহিরে গিয়াও চাপ সৃষ্টি করা হইতেছে। বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৯৯ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা। এইজন্য ঋণখেলাপিদের দেখা হয় রাষ্ট্রের শত্রু হিসাবে। প্রশ্ন হইল, ব্যাংকগুলি যে নানান ছিদ্র দিয়া ফাঁকা হইয়া গেল—কী করিয়া হইয়া গেল? ইহার কি একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়া উচিত নহে? এই ধরনের তদন্তের কেন উদ্যোগ লওয়া হইতেছে না? পরিতাপের বিষয় হইল, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা থাকিয়া যাইতেছেন বহাল তবিয়তে। অথচ প্রকৃত উদ্যোক্তারা অবর্ণনীয় কষ্টের ভিতর দিয়া প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করিয়া জাতীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখিয়া যাইতেছেন। গ্যাস-বিদ্যুত্ সংকটে কলকারখানা সক্ষমতা অনুযায়ী চালু রাখা অসাধ্য। অথচ নির্দিষ্ট সময়ের পর হইতে উদ্যোক্তার সুদসহ ঋণের কিস্তি পরিশোধের শিডিউল চালু হইয়া যায়। অধিকন্তু সুদের সিঙ্গেল ডিজিট এখনো কার্যকর হয় নাই। এই ধরনের নানান কারণে উদ্যোক্তারা খেলাপি হইয়া পড়িলে ইহার দায় কিন্তু উদ্যোক্তার ঘাড়ে আসিয়াই পড়ে। এই ধরনের অনিচ্ছাকৃত খেলাপিরা যখন কিস্তি দিতে ব্যর্থ হন, তখন দণ্ডসুদ আরোপ করিয়া তাহাকে আরো চাপে ফেলিয়া দেওয়া হয়।
সুতরাং সার্বিকভাবে লুটেরা দুর্নীতিবাজদের শায়েস্তা করিতে লাল ঘোড়া ছুটানো কিংবা যত বড়ো হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হউক না কেন, ফিতাকৃমিদের যতক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্রের অন্ত্রে আশ্রয় দেওয়া হইতেছে ততক্ষণ অবধি সামান্য উকুন বা পুজলি ধরিয়া আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলিবার কোনো মানে হয় না।
