বছরের ৩৬৫ দিন থিয়েটার-চর্চা করার মানুষ শুধু বাংলাদেশে নয়, বোধকরি সারা বিশ্বেই খুব কম আছে। এমন একজন বাংলাদেশের অনন্ত হিরা। তিনি নাট্যকার, নির্দেশক ও অভিনেতা। ঢাকায় নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় তার শুরুর দল হলেও পরবর্তীতে নিজে গড়ে তুলেছেন প্রাঙ্গণেমোর। মঞ্চসফল প্রযোজনা হিসেবে তাদের প্রায় সবগুলো নাটকই স্বীকৃত। তার মধ্যে রয়েছে ‘রক্তকরবী’, ‘শ্যামা প্রেম’, ‘আওরঙ্গজেব’, ‘কনডেমড সেল’, ‘হাসনজানের রাজা’ উল্লেখযোগ্য। মঞ্চ নাটকের সমসাময়িক বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন মাহবুব আলম
বাংলাদেশের নাটক কোন দিকে প্রবাহিত হচ্ছে—নাট্যচর্চা নাকি আন্দোলন?
চর্চা ও আন্দোলনের মধ্যে বেসিক পার্থক্য আছে, তবে একটি আরেকটির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। আমি যেভাবে থিয়েটার চর্চা করতে চাই, সেরকম বাস্তবতা বাংলাদেশে নেই। থিয়েটার খুবই ব্যয়বহুল মাধ্যম। সত্য হলো, একটি চলচ্চিত্র মঞ্চে আনতে যে পরিমাণ অর্থ লাগে, একটি নতুন নাটক মঞ্চে আনতে তার চেয়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ অর্থ ব্যয় করতে হয়। একটু হিসাব করলে দেখা যায়, চলচ্চিত্রে প্রোডাকশন বয় থেকে শুরু করে সবাই শিফট অনুযায়ী টাকা পায়, কিন্তু থিয়েটারে কেউ একটি টাকাও পায় না। অথচ আমরা যারা থিয়েটার করি, তারা সকলেই চলচ্চিত্রের লোকের চেয়েও বেশি প্রফেশনাল, বেশি সময় ও শ্রম দিই। চলচ্চিত্রের চেয়ে থিয়েটার বেশি ব্যয়বহুল মাধ্যম। নাটকের মানুষেরা মঞ্চকে এগিয়ে নিচ্ছে শুধু ভালোবাসার জায়গা থেকে। সেক্ষেত্রে নাট্যচর্চা ও আন্দোলন একেবারেই মিলেমিশে একাকার। আন্দোলন না থাকলে চর্চা করা সম্ভব নয়।
সংস্কৃতি ও রাজনীতি একটি আরেকটির পরিপূরক। পথনাটক কম হওয়ার পেছনে কোনো রাজনৈতিক কারণ আছে কি না বা আমরা সংস্কৃতিকে রাজনীতির সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেছি কি?
সংস্কৃতিকে তো রাজনীতির সঙ্গে মিলিয়েই ফেলেছি। আমরা বলছি, এখনকার সরকার সংস্কৃতিবান্ধব সরকার। পথনাটক এক ধরনের রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে গেছে। এরশাদ-বিরোধী আন্দোলন যখন চলছিল, তখন পথনাটক সেই আন্দোলনকে তুঙ্গে তুলে এনেছিল। আবার জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ, স্বাধীনতাবিরোধীরা যখন ক্ষমতায় এসেছে, তখন এই যে নানা সংকট, সেই সকল সংকটে আমরা পথনাটকের মাধ্যমে জাতিকে সোচ্চার করতে পেরেছি।
অনেক নাটক আসছে, আবার অনেক হারিয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে সংকটগুলো কী মনে করেন?
মূল হলো পৃষ্ঠপোষকতার সংকট। সেটা ঢাকা হোক বা ঢাকার বাইরে। অর্থনৈতিক সংকটই আসলে বর্তমানে থিয়েটারকে কোণঠাসা করে তুলছে। এর বাইরে অনেক ধরনের সংকট আছে, তার অন্যতম হলো হলের সংকট। তবে অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলে প্রোডাকশন টিকিয়ে রাখা মুশকিল। আমাদের পাশের দেশ, ভারতে প্রোডাকশন গ্রান্ট আছে, উত্সব গ্রান্ট আছে, স্যালারি গ্রান্ট আছে। ওরা নানা দিক থেকে সরকারের কাছ থেকে পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে। যাহোক, নানা সংকটের মধ্যেও প্রোডাকশন বানানোর পর প্রদর্শনের জায়গা কতগুলো আছে? ঢাকা শহরে তিন কোটি লোকের জন্য মাত্র একটি জায়গা—শিল্পকলা একাডেমি; আর দীর্ঘদিন পরে নতুন করে মহিলা সমিতি মঞ্চ। গুলশান, উত্তরা, বনানী, মিরপুর—এসব এলাকায় কোনো মঞ্চ থাকলে প্রতিবছর মঞ্চে আসা নাটকগুলো হারিয়ে যেত না। তবে নাটক হারিয়ে যাওয়ার আরো একটি কারণ হলো মানহীন নাটক।
নাট্য শিক্ষা থিয়েটারের সঙ্গে কিভাবে সম্পৃক্ত হলে মানসম্পন্ন নাটক হবে বলে মনে করেন?
থিয়েটার একেবারেই ব্যবহারিক পর্যায়ে চর্চা করার শিল্পমাধ্যম। শুধু ঢাকাতেই ৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি করে নাট্যতত্ত্ব বিভাগ আছে। আর বাংলাদেশের সবগুলো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্য বিভাগ আছে। সেখান থেকে অনেক ছেলেমেয়ে প্রতিবছর নাটকে অর্নাস-মাস্টার্স করে বের হচ্ছে, কিন্তু অদ্ভুত বাস্তবতা হলো, এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে পাস করে বের হয়ে আসা ছেলেমেয়েদের পাঁচ পারসেন্টও থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত নেই, যারা আসলে থিয়েটার চর্চার মধ্যে দিয়ে বেড়ে উঠবে। এখন যারা থিয়েটার পড়ে বের হচ্ছে, তারা মিডিয়াতে নানা ধরনের কাজ করছে, কিন্তু থিয়েটারের যে ধারাবাহিক চর্চা, সেখানে যুক্ত থাকছে না। শুধু দলগুলোর সঙ্গে যাদের সম্পৃক্ততা আছে, তারাই থাকছে। বাংলা নাটকের বৈশ্বিক রূপ কেমন দেখছেন? আর আমাদের মৌলিক নাট্যচর্চার প্রসার নিয়ে কী ভাবছেন?
অনেক হতাশার কথা বলেছি, কিন্তু তারপরও আমি বাংলাদেশের নাটক নিয়ে অনেক আশাবাদী। আমি যে জেনারেশনকে প্রতিনিধিত্ব করি, সেই জেনারেশন এবং এর পরে আরো দু-তিনটা জেনারেশন কাজ করছে। ভালো কাজ করছে। একেবারে চমকে দেওয়ার মতো কাজ করছে। আমি মনে করি যে, বাংলাদেশের নাটক এগোচ্ছে এবং ভালোভাবেই এগোচ্ছে। শিল্পের একটি দৃঢ় শক্তি আছে, সেটা হলো যত বেশি প্রতিবন্ধকতা আসে, ততই বিকশিত হয়। আর বাস্তবতা হলো, তোমরা যারা ভালো নাটক লিখছ, তারা কিন্তু এখান থেকে কোনো অর্থ পাচ্ছ না, আবার উপরন্তু তোমাদের পাণ্ডুলিপি নিয়ে এই দল সেই দল, এই নির্দেশক সেই নির্দেশকের কাছে ধর্ণা দিতে হচ্ছে কন্যা দায়গ্রস্ত পিতার মতো। আর একটি বাস্তবতা হলো, তোমার নাটকটি বই আকারে ছাপা হলে সেটা কেনার পাঠক নেই। তার মানে নাটক লিখে তুমি কিছুই পাচ্ছ না—অর্থ তো পাচ্ছই না, সম্মানও পাচ্ছ না।
