ফায়াজ শাহেদ
জ্ঞানার্জন ও গৃহত্যাগ—এ বিষয় দুটি যেন জলে মাছের বসবাসের মতো। মাছ যেমন জল ছাড়া বেঁচে থাকার ধারণা অযৌক্তিক, তেমনিভাবে গৃহত্যাগ ব্যতিরেকে জ্ঞানার্জন অযৌক্তিক ও অকল্পনীয়। মাছ বেঁচে থাকার প্রধান আস্থা হলো জল। একটি পুকুর অথবা দিঘিতে যখন জল শুকাতে থাকে তখন মাছের প্রাণনাশের ভয়ও বাড়তে থাকে দিনের পর দিন। অপরদিকে জ্ঞানপিপাসুদের জন্যে জ্ঞান আহরণের প্রধান আস্থা গৃহত্যাগের মাধ্যমে অন্যত্র কিংবা পৃথিবীর যে-কোনো স্থানে স্থানান্তর হয়ে জ্ঞানের রাজমহলকে প্রজ্বলিত করে তোলা। বিভিন্ন স্থান কিংবা বহির্বিশ্বের যে কোথাও গিয়ে জ্ঞানপিপাসুদের জ্ঞান অর্জন করতে না পারার অর্থ হলো জল শুকিয়ে যাওয়াতে মাছের প্রাণনাশের ভয় বৃদ্ধির মতো। কেননা গৃহত্যাগের মাধ্যমেই বহির্বিশ্বের কাছে গিয়ে প্রত্যক্ষ জ্ঞানার্জন করতে না পারলে জ্ঞান সমৃদ্ধির অপার সম্ভাবনার মৃত্যু ঘটার শামিল। অর্থাত্ অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীলতার বিশালতা থেকে নিজেকে বঞ্চিত করার নামান্তর।
এখানে গৃহ বলতে আপনার পরিবারকে নিয়ে বসবাসের যে ঘরটি রয়েছে শুধু তা এমনটিও নয়। সেটি আপনার গ্রাম থেকে শুরু করে জেলাসহ সমগ্র দেশও হতে পারে। অর্থাত্ যেখানে জ্ঞানার্জনের সুযোগ সীমিত মনে হবে এবং অন্যত্র গিয়ে জ্ঞানার্জনের অভাব দেখা দিবে তাকেই এখানে ‘গৃহ’ উদ্দেশ্য। ঘরে বসে থেকে জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করা যায় না কখনো। জ্ঞানের পরিধিকে ব্যাপক করতে হলে ভ্রমণের কোনো বিকল্প নেই। হিপ্পো অগস্টিন বলেছিলেন, “বিশ্ব একটি বই, যারা ভ্রমণ করে না তারা যেন এ বইয়ের শুধু একটা পৃষ্ঠা পড়ল’।
সুতরাং আপনি একটি পৃষ্ঠা পড়ে বাকি পুরো একটি বইয়ের জ্ঞান সম্পর্কে বেখবর।
অনেক ছাত্রের নিজ গৃহে একটি ব্যক্তিগত ছোট্ট লাইব্রেরি থাকে। লাইব্রেরির সমস্ত বই পড়া হয়ে গেলে জ্ঞানের পরিধিকে আরো বিস্তীর্ণ করার উদ্দেশ্যে বাইরের কোনো একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরির দ্বারস্থ হতে হয়। এভাবে একজন ছাত্রের জন্মের পর থেকে প্রাথমিক জ্ঞান মাতাপিতার কাছ থেকে শেখা হলেও, একটি সময় মাতাপিতার কাছ থেকে জ্ঞানার্জনের দরজাটি তালাবদ্ধ হয়ে যায়। এবং জ্ঞানের পরিধিকে আরো বিস্তীর্ণ করার লক্ষ্যে গৃহত্যাগ অনিবার্য হয়ে পড়ে।
পৃথিবীর ইতিহাসে কালজয়ীরা নিজ গৃহ, নিজ মাতৃভূমির মায়া বিসর্জন দিয়ে পৃথিবীর যে-কোনো সুদূর প্রান্তরে পাড়ি দিয়েছিলেন জ্ঞানার্জনের মতো সোনালি হরিণ খোঁজার লক্ষ্যে। বিজ্ঞানী এরিস্টটল মাতৃভূমি ম্যাসিডন ত্যাগ করে এথেন্সে এসে জ্ঞানের বিস্তীর্ণ জগতে স্বাক্ষর রেখেছিলেন। চিকিত্সাবিজ্ঞানী গ্যালেন চৌদ্দ বছর পর্যন্ত গৃহে বসে পড়াশোনা করেন এবং গৃহে অর্জিত জ্ঞান যথেষ্ট নয় জেনে, সুদীর্ঘ সতেরটি বছর স্মার্না কোরিন্থা ও আলেকজান্দ্রিয়াতে ভবঘুরের মতো গ্রিক দার্শনিক বিজ্ঞানীদের কাছে গিয়ে মতবাদগুলো জেনে নিয়েছেন। বিশ্ববিখ্যাত জ্যোতির্বিদ নিকোলাস কোপারনিকাসের জীবনে মাত্র একটি বিশ্ববিদ্যালয় তাকে জ্ঞানার্জনে পরিতৃপ্ত করতে পারেনি, বরঞ্চ তিনি ভিয়েনা, বোলেনা, পাদুয়া, ফেরারা ও রোম বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞানার্জনের জন্যে নিজেকে সঁপে দেন। চার্লস ডারউইনকে আমরা কম-বেশি সবাই জানি, তিনি গৃহ ছেড়ে বন-বাদাড়ে পোকামাকড় পশু-পাখির পেছনে দৌড়ে জ্ঞান অর্জন করতে যেতেন। আলফ্রেড নোবেল সুইডেন থেকে সপরিবারে রাশিয়াতে আসেন এবং সেখান থেকে প্যারিসে গিয়ে রসায়নের ওপর পাণ্ডিত্য অর্জন করে ইউরোপ ভ্রমণ শেষে এবার পাড়ি জমান আমেরিকায়। বিশ্বখ্যাত ভারতীয় বাঙালি বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু ফরিদপুরে স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে কলকাতায় চলে যান। আবার সেখান থেকে লন্ডনে পাড়ি দিয়ে জ্ঞানার্জনের সাহায্যে বিজ্ঞান জগতে অসামান্য অবদান রাখেন। এভাবে গৃহত্যাগ করেছিলেন লুই পাস্তুর, আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল, আলভা এডিসন, মাদাম কুরি ও আলবার্ট আইনস্টাইনসহ অসংখ্য বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী।
কোটি কোটি বছর আগে ধ্বংসাবশেষ ডাইনোসরের কঙ্কাল আদি মানবের মমি, আদিকালের সমাজব্যবস্থা ও শিক্ষাব্যবস্থার চিত্র, ক্ষমতার উত্থান-পতন এবং মানুষের নিত্যনৈমিত্তিক কৃষ্টি-কালচারসহ জাগতিক যত সব বিস্ময়কর আবিষ্কার রয়েছে সেসব জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। যেটি একটি জাতির ভুলে যাওয়া অতীতকে স্মরণ করে দিয়ে ভবিষ্যত্ জীবনকে সাজিয়ে তোলার জ্ঞান শেখায়। সুতরাং আমরা ভিন্ন ভিন্ন জাতিসত্তা সম্পর্কে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা জাদুঘর থেকেও জ্ঞানকে লব্ধ করতে পারি।
n লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
