আলি আব্বাসউদ্দৌলা
১৯ সেপ্টেম্বর বাংলার বীর দেশপ্রেমিক সন্তান নবাব সিরাজউদ্দৌলার শুভ জন্মদিন। এটি তার ২৯২তম জন্মবার্ষিকী। তিনি ১৭২৭ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিরাজউদ্দৌলা নামক ফুটফুটে সুন্দর এক ফুল ফোটে বাংলার বাগিচায়। জায়েনউদ্দিন ও আমিনা বেগমের ঘর আলো করে পৃথিবীতে আসেন সিরাজউদ্দৌলা। সিরাজের শিক্ষাজীবন কেটেছে নানা নবাব আলিবর্দি খানের কাছে। নবাব আলিবর্দি খান শাসনকাজ পরিচালনা ও একজন যুবরাজের জন্য দরকারি সব গুণাবলিতে তাকে পারদর্শী করে তোলার চেষ্টায় কোনো ত্রুটি রাখেননি। তাইতো আলিবর্দী খান ঘোষণা দিয়েছিলেন : ‘আমার পরে সিরাজউদ্দৌলা বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার মসনদে আরোহণ করবে’। আলিবর্দি খান নিজেই ইরাজ খানের কাছে তার কন্যা লুত্ফুন্নিসার জন্য সিরাজের বিয়ের প্রস্তাব দেন। ১৭৪৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি দুই পরিবারের সম্মতিতে সিরাজ ও লুত্ফার শুভ নিকাহ সম্পন্ন হয়। তাদের ঘর আলোকিত করে একমাত্র সন্তান কন্যা উম্মে জোহরা। নবাব সিরাজের চরিত্রের মতো সিরাজ বংশধরগণকে জনসাধারণ্যে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য পূর্বের সেইসময় থেকে আজ পর্যন্ত চিহ্নিত কিছু স্বার্থান্বেষী মহল ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। নবাব আলিবর্দি খানের পরিবারের সময় থেকেই, নিজ সন্তান থাকার পরও পালক সন্তানরা খারপ্রথা অনুযায়ী সিরাজপরিবারে বসবাস করত। এই নিয়ম দীর্ঘ সময় ধরে প্রচলিত আছে। এই পালক সন্তানেরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়েছিটিয়ে আছে এবং নিজেদের সিরাজপরিবারের অংশ হিসেবে দাবি করে। একইভাবে দাবিদারিত্ব করে সিরাজের দুই বোনের বংশধরেরা। আর মিরজাফর, মিরনের বংশধরদের কেউ কেউ তাদের পূর্ব-পুরুষদের অপকর্মে লজ্জিত হয়ে, তাদের আসল বংশপরিচয় থেকে সরে এসে নবাব সিরাজউদ্দৌলা বংশের অংশ কিংবা নবাবের বংশধর হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
সিরাজের প্রিয়তমা সহধর্মিণী লুত্ফুন্নিসা বেগম ১৭৬৭ সালে কন্যা উম্মে জোহরা ওরফে কুদসিয়া বেগমকে ১৪ বছর বয়সে সিরাজের ভাই ইকরামউদ্দৌলার পুত্র মুরাদউদ্দৌলার সঙ্গে শাদি দেন। দুই আপন ভাইয়ের ছেলেমেয়ের নিকাহ হওয়াতে সিরাজউদ্দৌলা-পরিবারের বংশের বাতি জ্বলতে থাকল, যা আজও বর্তমান। সিরাজউদ্দৌলা মৃত্যুবরণ করেন ২ জুলাই ১৯৫৭ সালে।
নবাব সিরাজউদ্দৌলার সহধর্মিণী বেগম লুত্ফুন্নিসা ছিলেন ইরাজ খানের কন্যা। ইরাজ খান ছিলেন অতি সম্ভ্রান্তবংশীয়। লুত্ফুন্নিসার আপন একজন ভাইও ছিলেন, নাম তার ইরাজ খান। ইরাজ খানের পিতা আকবরকুলি খান ভাগলপুরের নবাব ছিলেন। শাহজাদা আজমের মৃত্যুর পর তিনি বাংলায় চলে আসেন। আলিবর্দি খান বংশীয় মর্যাদার জন্য ইরাজ খানকে সম্মান দেখান এবং দরবারের উচ্চপদে নিয়োগ দেন। তিনি নিজেই ইরাজ খানের কাছে তার কন্যা লুত্ফুন্নিসার জন্য সিরজদ্দৌলার সঙ্গে শাদির প্রস্তাব দেন।
বাংলার স্বাধীনতার নাম নিলে সিরাজউদ্দৌলার নাম উচ্চারণ অনিবার্য হয়ে ওঠে। চার চারটি যুদ্ধের সফল অধিনায়ক, স্রেফ একটি বিশ্বাসঘাতকতার যুদ্ধে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়। তারও নায়ক তিনি। মাত্র ১৪ মাস ১৪ দিনের রাজত্বকালের পুরো সময়টা কেটেছে অস্থিতিশীল অবস্থার মধ্য দিয়ে। তা সত্ত্বেও তার দৃঢ়তা, সাহস ও স্বদেশপ্রেম তাকে জাতীয় বীরের মর্যাদা দান করে। পারিবারিক জীবনেও তিনি সহধর্মিণী লুত্ফুন্নিসা এবং একমাত্র সন্তান কন্যা উম্মে জোহরার সঙ্গে সুখী জীবনযাপন করেছেন। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও নবাব সিরাজউদ্দৌলা গবেষক ড. মুহাম্মদ ফজলুল হকের মতে...‘সিরাজ ছিলেন আদর্শবান ও মহান দেশপ্রেমিক নবাব। আদর্শ চরিত্রের ছিলেন বলেই তার তরুণী সহধর্মিণী বেগম লুত্ফুন্নিসা তার মৃত্যুর পর প্রায় অর্ধশতাব্দী স্বামীর কবরে পবিত্র কোরআন শরিফ পড়ে এবাদত-বন্দেগি করে কাটিয়ে দিয়ে ছিলেন। নবাব সিরাজউদ্দৌলার সন্তান এবং ৯ম রক্তধারা সৈয়দ গোলাম আব্বাসের প্রতিষ্ঠিত সংগঠন SHAB ফ্রেন্ডশিপ গার্ডেনসহ সহযোগীদের নিয়ে ঐতিহ্যের ভালোবাসায় দীর্ঘদিন যাবত্ পারিবারিকভাবে নবাব সিরাজউদ্দৌলার শুভ জন্মদিন পালন করে আসছে। আজ ১৯ সেপ্টেম্বর নবাব সিরাজউদ্দৌলার শুভ জন্মদিনে সিরাজপরিবারের নতুন প্রজন্ম বাংলার প্রতিটি হূদয়ের দোয়া ও ভালোবাসা কামনা করছে, যাতে আগামী দিনগুলো লালসবুজের বাংলায় নবাব সিরাজউদ্দৌলার আর্দশ, ভালোবাসা, চেতনায় জেগে ওঠে প্রতিটি তরুণ হূদয়।
n লেখক : নবাব সিরাজউদ্দৌলার
৯ম রক্তধারা প্রজন্ম
