ইত্তেফাক রিপোর্ট
দুর্নীতি আমাদের একটি জাতীয় ব্যাধি বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। তিনি বলেন, দুর্নীতি আমাদের একটি জাতীয় ব্যাধি। এটি সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি করে ও সুষম রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন ব্যাহত করে। জাতীয় এই সমস্যা প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে দুদককে একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠান সৃষ্টির ফলে ক্ষমতাবান দুর্নীতিবাজরা শঙ্কিত হয়ে পড়ে। গতকাল রবিবার বেলা ১১টায় রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমিতে দুর্নীতিবিরোধী এক সমাবেশে প্রধান বিচারপতি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, দেশপ্রেম, আদর্শ ও নৈতিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। দুর্নীতি প্রতিরোধের আন্দোলনকে সার্বজনীন করার লক্ষ্যে জাতিসংঘ বছরের একটি দিনকে আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। আমাদের পূর্বপুরুষেরা অনেক ত্যাগ ও কষ্টের বিনিময়ে আমাদেরকে এই স্বাধীন বাংলাদেশ উপহার দিয়েছেন। কিন্তু আজ এই দুর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ও চেতনাকে অবমাননা করছে। সমাজ হতে দূরে সরে যাচ্ছে আদর্শ ও নৈতিকতা। এই অবস্থার পরিবর্তন করতে এদেশের যুবসমাজ সবচেয়ে বড় শক্তি এবং অপার সম্ভাবনা। অদম্য আগ্রহ, সৃজনশীলতা এবং সুন্দর বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্ন নিয়ে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে তাদের সর্বাত্মক অংশগ্রহণ আজ সময়ের দাবি।
তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, আজ আমি প্রবীণদের প্রতিনিধি হিসেবে আপনাদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলতে চাই। প্রাজ্ঞ প্রবীণরা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। তাদের অভিজ্ঞতা, সততা, দক্ষতা এবং ন্যায়নিষ্ঠার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। কিন্তু জাতির ভবিষ্যত্ গতিপথ নির্ভর করে দেশের তরুণ প্রজন্মের ওপর। বিশ্বব্যাপী পরিবর্তনের যে জোয়ার আজ সৃষ্টি হয়েছে তার মূলেও রয়েছে তরুণ শিক্ষার্থী। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে আমাদের ছাত্রসমাজের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা আমাদের অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করেছে। আত্মশক্তি বিকাশের মধ্যদিয়ে শিক্ষার্থী সমাজ তথা তরুণ প্রজন্ম দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালে দেশ দুর্নীতিমুক্ত হতে বাধ্য। ছাত্রসমাজ আগামীদিনে যেমন বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিবে, তেমনি আজকের বাংলাদেশের দুর্নীতির বিরুদ্ধে এবং সুশাসন ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি বলেন, আসুন দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে হতাশার অন্ধকার ঠেলে উজ্জ্বল আলোয় প্রিয় স্বদেশকে এগিয়ে নিতে অঙ্গীকারাবদ্ধ হই। দুর্নীতিকে ‘না’ বলার প্রত্যয়দীপ্ত অঙ্গীকার নিয়ে সর্বাত্মক নৈতিকতা চর্চার সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলি। দুর্নীতি দমনের জন্য সামাজিক আন্দোলনের বিকল্প নেই। এ জন্য প্রয়োজন গণসচেতনতা, দেশপ্রেম এবং তারুণ্যের অঙ্গীকার। তরুণ এবং যুবকদেরকে দুর্নীতি প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে। দেশের যুবসমাজ অসততা, অন্যায় ও দুর্নীতির বিরোধিতা শুরু করলেই কেউ কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি করার সাহস পাবে না।
প্রধান বিচারপতি বলেন, আমরা প্রত্যেকে যদি আমাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেশপ্রেম, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে দুর্নীতির মূলোত্পাটন করতে পারি, তবে এর সুফল দেশের প্রতিটি নাগরিক ভোগ করবে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আমাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। তিনি আরো বলেন, দুর্নীতি প্রতিরোধের মাধ্যমে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার প্রত্যয়ে দুদক সমাজের বিভিন্ন স্তরের গণমানুষের সঙ্গে তাদের মতামত গ্রহণ ও আলোচনা সভার আয়োজন করে থাকে। এটা সত্যিই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। দুদকের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের গতিশীল নেতৃত্বে দুদকের দুর্নীতি প্রতিরোধ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে আমি আশাবাদ ব্যক্ত করছি। প্রধান বিচারপতি বলেন, সকলে দুর্নীতিকে ‘না’ বলে এবং দুর্নীতিবাজদেরকে সামাজিকভাবে বয়কটের মাধ্যমে এ দেশকে একদিন দুর্নীতিমুক্ত করবই- এটাই হোক আজকের সমাবেশে আমাদের অঙ্গীকার।
আলোচনা সভায় প্রধান বিচারপতিকে ধন্যবাদ জানিয়ে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, একসঙ্গে একযোগে সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন সৃষ্টি করে জাতিকে দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে মুক্ত করতে চাই। আলোচনা সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দুদক কমিশনার ড. মোঃ মোজাম্মেল হক খান, এএফএম আমিনুল ইসলাম, সচিব ড. মোঃ শামসুল আরেফিন প্রমুখ।
