বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রাণপুরুষ তারেক মাসুদ। মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষিতে নির্মিত ছবি তার ‘মাটির ময়না’। ধর্মীয় অনুভূতিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে তখন এদেশে ছবিটির প্রদর্শনী নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ক্ষমতাসীন সরকার। দেশে দেখানোর সুযোগ না পেলেও বিদেশের মাটিতে বিপুল সমাদৃত হয় তার কাজ। কান চলচ্চিত্র উত্সবে আমন্ত্রিত হয়ে নন্দিত হয় ভূয়সী প্রশংসায়। বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে গুরুত্ব দিয়ে লেখা হয় মাটির ময়না আর তারেক মাসুদকে নিয়ে।
বিবিসি নিউজ লেখে, ব্রিটেনে সাধারণ ক্যাটাগরিতে মুক্তি পাওয়া বাংলাদেশের প্রথম ছবি ‘মাটির ময়না’। ১৯৬০-৭০-এর সামাজিক এবং রাজনৈতিক পালাবদল এর উপজীব্য। বৃহত্তর সংগ্রামকে প্রেক্ষাপটে রেখে আনু নামের এক ছোট্ট বালকের গল্প বলা হয়েছে এতে। এতে ফুটে উঠেছে ইসলামি শিক্ষায়তনে মুক্ত মতবাদের সঙ্গে জড় মৌলবাদের দ্বন্দ্ব। আনু চায় বাধাহীন স্বাধীনতা। অথচ রক্ষণশীল ধর্মভীরু বাবা তাকে ভর্তি করিয়ে দিয়েছে এক মাদ্রাসায়। এখানে আরবি শেখার পাশাপাশি এক বেলা অন্তত পেটপুরে খেতে পারবে সে।
মাদ্রাসার কঠোর শৃঙ্খলার চাপে রুদ্ধ হতে বসে তার মু্ক্তচিন্তার পাখ-পাখালি। রোকন নামে এক বন্ধু আসে তার জীবনে এমন সময়। সরল রোকন কিছুতেই মেনে নিতে পারে না কোনো ধরনের বাঁধা-বন্ধন। এদিকে দেশজুড়ে ঘনীভূত হয় বৃহত্তর সংঘাত। বাংলাভাষী বনাম উর্দুভাষীর মধ্যে। এর ছায়া পড়ে আনুর বাবা-মা’র সম্পর্কের মাঝে। এই সংকট থেকে তখনই তারা মুক্ত হতে পারে যখন নির্মম সামরিক অভিযানের মোকাবেলা করতে গিয়ে স্বাধীন হয়ে গিয়েছে দেশ, এবং ব্যক্তি, উভয়ই।
বাংলাদেশের মনোলোভা গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে দুই শিশুর হূদয়ছোঁয়া অভিনয়ের মধ্য দিয়ে নিজের ফেলে আসা শৈশবের গল্পটাকে ধরতে চেয়েছেন তারেক মাসুদ। তার ছবিতে স্পষ্ট হলো, এদেশের মুসলমানের যুক্তিবাদী উদার দৃষ্টিভঙ্গিকে এত সহজে ধবংস করা অসম্ভব।
নিউ ইয়র্ক টাইমস এক নিবন্ধে লেখে, বুদ্ধিদীপ্ত ‘মাটির ময়না’ রিলিজের জন্য এর চাইতে উত্তম সময় আর কী হতে পারে। বিশাল ক্যানভাসে সাবলীল গতি নিয়ে মন ছুঁয়ে যাওয়া এক গল্প বয়ান করেছেন তারেক মাসুদ। তার ছবি দেখতে গিয়ে মনে হয়েছে দুই দিকপাল ভারতের সত্যজিত্ রায় আর ইরানের আব্বাস কিয়ারোস্তামির কথা। ছবিতে ধর্মীয় আচারের মধ্য দিয়ে দুজনই সূক্ষ্মভাবে তুলে আনেন বিরাজমান সামাজিক সংকটের বিষয়টি।
২০০২ সালে কান চলচ্চিত্র উত্সবে প্রথম প্রদর্শিত ছবিটির নাম ‘মাটির ময়না’। নিজের দেশে ছবিটি তখনো নিষিদ্ধ। তদানীন্তন সরকারের অভিযোগ, ছবিতে দেশের মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার ভাবমূর্তিকে খাটো করে দেখানো হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে। এসব খোঁড়া অজুহাত শুনে সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে শিল্পীসমাজ। সৃষ্টির অবাধ স্বাধীনতা দাবি করে সরকারের প্রতি তারা আহ্বান জানায় নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জন্য।
একই বছরের জানুয়ারিতে তার এক সাক্ষাত্কার নেওয়া হয় প্যারিসে। নিচে তুলে ধরা হচ্ছে সেই সাক্ষাত্কারের একাংশ :
আপনার ছবির মূল বার্তা কী?
তারেক মাসুদ : জীবনের কোনো বিষয়েই পরম কিংবা চরম বলে কোনো বার্তা থাকতে পারে না, এটাই আমার ছবির মূলবার্তা। এ ছবিতে ইসলাম থেকে শুরু করে কমিউনিজম এমনকি হোমিওপ্যাথি নিয়েও কথা বলা হয়েছে। আলাদা আলাদা করে ভাবলে এগুলো সমস্যা উদ্রেককারী কোনো কিছু নয়। সমস্যা শুরু হয় ঠিক তখনই, আমরা যখন গোঁয়ারের মতো ভাবতে শুরু করি, পার্থিব জীবনে সকল মানুষের সকল সমস্যার সমাধান কেবল আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাসলালিত মতবাদের পক্ষেই নিশ্চিত করা সম্ভব। বাস্তবতা হচ্ছে, যে কোনো ধর্মেই চরমপন্থি গড়ে ওঠা সম্ভব। ইসলামও এর ব্যতিক্রম নয়। যদিও ইসলামে কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন মতের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ধারার প্রবর্তন আছে। ‘বাহাস’ বা ধর্মীয় বিতর্ক আয়োজন ইসলামের ঐতিহ্যবাহী একটি প্রথা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অনুসন্ধান অব্যাহত রাখা এবং প্রশ্ন করার এই অতিশয় কার্যকর প্রথাটি নাটকীয়ভাবে বিলুপ্ত হয়েছে বর্তমানে। ভিন্ন ব্যাখ্যার মধ্যে সমন্বয়ের স্বার্থেই বিতর্ক প্রক্রিয়াটির পুনরুদ্ধার প্রয়োজন। মোল্লার ফতোয়ার চাইতে ব্যক্তির বিবেচনাবোধকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া আছে ইসলামে। জোর দেওয়া হয়েছে ‘ইলম’ বা ইসলামি প্রজ্ঞা অর্জনের ওপরও। এর কারণ মানুষকে যাতে পদে পদে মোল্লার শরণ হতে না হয়। পাপমোচন কিংবা স্বীকারোক্তি দেওয়ার জন্য মোল্লার দরজায় যেতে হয় না কোনো মুসলমানকে। অন্য ধর্মের সাথে ইসলামের আরেকটি ব্যবধান হচ্ছে, এতে অন্যান্য ধর্মের প্রবর্তক, যেমন, ইব্রাহিম, মুসা কিংবা ঈসাসহ সকল নবির প্রতি শর্তহীন আনুগত্য পোষণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে নিষেধ করা হয়েছে ‘শেরেক’ বা স্রষ্টার সাথে কারো তুলনা না করার জন্য। কোনো ব্যক্তি কিংবা বস্তু, এমনকি কোনো নবিকেও আল্লাহর সাথে তুলনা করা যাবে না। ইসলামে নবি মোহম্মদকে বলা হয় ‘হাবিব’ অর্থ ‘আল্লাহর বন্ধু’। তিনি তার পুত্র নন, কিংবা নিজেই নিজের প্রভুও নন। সবচাইতে কঠোর অনুশাসন কিংবা ‘শরিয়া’ স্কুলেও ভিন্ন ভিন্ন মতের মধ্যে বিতর্কের পর্যাপ্ত অবকাশ রয়েছে। আমার ছবিতে ইব্রাহিম চরিত্রটিকে দেখানো হয়েছে পরম ব্যাখ্যাদাতা হিসেবে। চরমপন্থি দৃষ্টিভঙ্গিটাকেই একসময় প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে সে।
প্রশ্ন : একজন নির্মাতা এবং একজন মুসলিম হিসেবে নিজের কাজের মূল্যায়ন কীভাবে করবেন?
তা মা : জীবন তো চলচ্চিত্রেরই ধারাবাহিকতা। ‘মাটির ময়না’ কেবল আমার শৈশবের দিকে, কিংবা আমার চারপাশের মানুষগুলোর অন্তঃপ্রদেশের উদ্দেশে যাত্রা নয়। এ আমার নিজের নিয়মে নিজেকেই খুঁজে ফেরা। সমাজের বাইরে থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতার ফসল নয় মাটির ময়না। এর নাম ভেতর থেকে দেখা। নিজেকে জানা, নিজের মানুষগুলোকে জানা এবং একজন মুসলমান হিসেবে নিজের ধর্মটাকে আরো একটু ভালোভাবে জানার প্রয়াস। আমি সৌভাগ্যবান। ভিন্ন ধর্মের একজনকে বিয়ের মধ্য দিয়ে ভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে জানতে পেরেছি আমি। আমার দৃষ্টিভঙ্গিকে বড়ো করে দিয়েছে এ অভিজ্ঞতা। ছবিতে আমি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ইব্রাহিম নামের চরিত্রটি তৈরি করেছি। কারণ এটাই হচ্ছে ইহুদি-খ্রিশ্চান এবং মুসলিম বিশ্বাসের মধ্যেকার অন্যতম ঐক্যসূত্র। ভিন্ন সংস্কৃতিকে অনুধাবন করতে হলে আমাদের প্রথমে খুঁজতে হবে দুইয়ের মধ্যেকার মিল। এখন যা দেখছি আমরা প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের মধ্যে। মুসলমানদের যদি আরো একটু ভালোভাবে বুঝত মার্কিনিরা, কিংবা মার্কিনিদের যদি আরো একটু ভালোভাবে বুঝত মুসলমানরা, তাহলে কতই না বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারত আমাদের এই প্রিয় পৃথিবীটা।
ভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে সম্পর্ক গঠনের মাধ্যমে আমরা সহনশীল হয়ে উঠব আরো। পাশাপাশি তাদের সাথে তৈরি হবে নিবিড় বন্ধন। আমি নিউ ইয়র্ক শহরে কাটিয়ে গেছি পাঁচ বছর। সেখানে থাকাকালীন আমার নিজের সংস্কৃতিকে আমি যেভাবে উপলব্ধি করেছি তেমনটি আমার জীবনে আর কখনো ঘটেনি। তাই বলে নিউ ইয়র্কে এক মুহূর্তের জন্য বহিরাগত বলে মনে হয়নি নিজেকে। এত বহুবিচিত্র সংস্কৃৃতি এখানে পাশাপাশি সহাবস্থান করে যে এটাকে ‘আমার শহর’ মনে না করে থাকাটা কঠিন। সেদিক থেকে বরং বাংলাদেশে থাকাকালে আমার কখনো কখনো মনে হয়েছে, আমি বুঝি এখানকার কেউ নই। আমি এখানে বহিরাগত। টুইন টাওয়ার হামলায় মারা গিয়েছিল আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তার অফিস ছিল ১০২ তলায়। খবরটা শুনে ভীষণ ভেঙে পড়েছিলাম। পরেরবার যখন নিউ ইয়র্ক এলাম, অবাক ব্যাপার হলো, প্রথমবারের মতো নিজেকে আমার বহিরাগত মনে হলো। মাঝে মাঝে নিজেকে মনে হয় ছবির ‘আনু’ চরিত্রটির মতো। বাড়ি কিংবা মাদ্রাসা, সর্বত্রই সে যেন এক বহিরাগত।
আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত এ ছবি?
তা মা : আমার শৈশবের গল্প নিয়েই ছবিটি বানিয়েছি আমি। ছোটবেলায় আমি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছি। ওই সময়ে আমার মতো নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের এক ছেলের মাদ্রাসায় পড়াটা ছিল কিছুটা অস্বাভাবিক। অন্যদিকে, মাদ্রাসার অবকাঠামো বিষয়ে কোনো ধারণাই রাখে না আমাদের সমাজের মধ্যবিত্ত কিংবা অভিজাত অংশ। মূলধারা থেকে ছিটকে পড়া গরিব শিশুরা ভর্তি হয় এসব মাদ্রাসায়। আমি চাই মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া আরো বাড়ুক। আমার অর্জিত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অন্যের সাথে বিনিময় করার কাজটাকে মনে হয়েছে একজন নির্মাতা হিসেবে আমার একান্ত দায়িত্ব। আমার শিল্পসৃষ্টি আমার অভিজ্ঞতার যতটা ঘনিষ্ঠ হবে, ধরে নেব আমি ততটাই সফল। এবং পরবর্তীতে আমি আরো বেশি দিতে সক্ষম। মানুষের জীবনে তার শৈশবের গুরুত্ব অপরিসীম। জীবনের সকল কাজে এটাই আমাদের প্রেরণার উত্স। আমরা যদি তার প্রতি বিশ্বস্ত এবং অনুগত থাকি, তাহলে আমাদের সামনে একদিন সে ঠিকই খুলে ধরবে তার জাদুময় সম্ভাবনার অসীম দুয়ার।
অবশ্য মাটির ময়না কেবলমাত্র ইসলাম ধর্ম কিংবা আনুর শৈশব নিয়ে নির্মিত কোনো ছবিমাত্র নয়। এ হচ্ছে মানুষে মানুষে বন্ধনের গল্প। শিশুর সাথে বড়দের, এক বিশ্বাসের সাথে আরেক বিশ্বাসের... আমি আসলে দুই ধরনের মানুষের মধ্যেকার সম্পর্কটা তুলে আনতে চেয়েছি এতে। এক ধরনের মানুষ আছে যারা বড় হয় বেড়ে ওঠে, আরেক ধরনের মানুষ আছে, যাদের বেড়ে ওঠা যেন থেমে গেছে কবে, তারা সবাই আটকা পড়ে গেছে কোনো না কোনো বিশ্বাসের চোরাবালির ফাঁদে। এই ছবি সেই সমস্ত শিশু আর সেই সমস্ত বড়দের পক্ষে কথা বলে—যারা ক্রমশ বড় হতে থাকে আর বেড়ে ওঠে প্রতিদিন। এরা আমাদের চারপাশের অতি সাধারণ মানুষ, ‘অভিজ্ঞ’ পৃথিবী যাদের এখনো বলে ‘শিশু’ কেননা এখনো তারা নিজের গভীরে লালন করতে পারে নিষ্পাপ মানসিকতা আর চিরন্তন কৌতূহল। যারা বেড়ে ওঠে প্রতিদিন, নতুন নতুন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। এদের বিপরীতে অবশ্য আরো এক প্রকার মানুষ আছে যারা আঁকড়ে থাকে তাদের সংকীর্ণ বিশ্বাস। তা হতে পারে, রাজনৈতিক কিংবা ধর্মীয়। নিয়ত বদলে যাওয়া পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে তারা অসহায় অপারগ।
