লাওসের উত্তরাঞ্চলের পাহাড়ি প্রদেশগুলোতে আজকাল ট্যুর বেড়েছে বিস্তর, সেইসাথে কাজের বেহদ চাপ। এককালের ছোট্ট এ দেশের রাজকীয় রাজধানী লুয়াংপ্রবাং শহরে আসতে হচ্ছে ঘন ঘন। এখানে আমাদের সংস্থার একটি ছোট্ট কটেজ হয়েছে নদীর তীরে। তাই সুযোগ পেলেই ডে-অফ নিয়ে এক বা দুই রাত্রি নিরিবিলিতে কাটিয়ে যাই। আমাদের কটেজের পাশেই ফরাসি কেতার ঝুরঝুরে একটি চাঙবাংলো। তাতে বাস করেন দাড়িগোঁফভুরু পেকে ধবধবে সফেদ হয়ে আসা এক ফরাসি চিত্রকর। অনেকদিন ধরে তিনি লাওসে বাস করছেন। শোনা যায়, একসময় তিনি একটি লাও তন্বী মেয়ের সঙ্গে ব্যাপকভাবে মজে ঘর বেঁধেছিলেন। তাকে মডেল করে চিত্রও এঁকেছিলেন অনেকগুলো—নানা দৃষ্টিকোণ থেকে। বছর চারেক আগে মেয়েটি ডেঙ্গু জ্বরে মারা যায়। সে থেকে চিত্রকর একাই আছেন।
আজকের দিনটা আমি কটেজের সামনে নদীর তীরে জারুল গাছের নিচে ইজি চেয়ারে শুয়ে কাটিয়ে দেব ভেবেছিলাম, এমন সময় চিত্রকর আমাকে ডেকে নেন তার চাঙবাংলোতে। চুনসুরকির থামের ওপর বেশ উঁচু বাংলোর নিচতলায় তার দুই দিক খোলা স্টুডিও। তার ছত্রিঢাকা গাড়িবারান্দায় দাঁড় করানো খুব পুরনো মডেলের ক্যনভাসের ছাদওয়ালা একটি সিঁত্রোন গাড়ি। চিত্রকর হামানদিস্তায় তামাকপাতা গুঁড়া করে তা মধু দিয়ে ব্লেন্ড করছেন। স্টুডিওর দেয়ালে মেয়েটির দুটি জলরঙের কাজ। একটি চিত্রে স্তনবৃন্তের উদ্ভিন্নতা ও পা ভাঁজ করে সৃষ্ট মসৃণ কোণ একটি বিশেষ রিপুকে করে তোলে সহসা ঝড়ো ও উন্মাতাল। এবং অন্যটিতে অত্যন্ত সাদামাটা মুখশ্রী, তাতে বাঁশের চিক গলে আসা আলোর রেখায় মৃত মেয়েটি যেন স্নিগ্ধ আবেশ ছড়ায়। চিত্রকর আমাকে বসতে বলে ধীরেসুস্থে পাইপে তামাক ভরেন। তার চারদিকে স্ট্যান্ডে, ফ্লোরের মাদুরের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা অনেকগুলো পেনসিল ও চারকোল আর চায়নিজ ইনেক আঁকা লুয়াংপ্রবাংয়ের হরেক রকমের স্থাপত্যের নকশা, স্কেচ ও ফুলফ্লেজেড চিত্র। এগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়—লুয়াংপ্রবাংয়ের নানারকমের ঘরদুয়ার যেন সময় করে ফরাসি চিত্রকরের সঙ্গে দেখাসাক্ষাত্ করতে এসেছে।
চিত্রকর পাইপ ধরিয়ে ইজেলে আটকানো একটি ফরাসি কেতার ঝুরঝুরে ভিলার ওপর পেনসিলের আঁকিবুঁকি করতে করতে সিঁত্রোন গাড়ির বিষয়ে টুকটাক কথাবার্তা বলেন। ভিলাটির সিঁড়িতে বসে আছে দীনদরিদ্র চেহারার এক লাও প্রৌঢ়। তার মুখশ্রীতে আছে এমন এক গাঢ় বিষাদ যে তা থেকে চোখ ফেরানো মুশকিল হয়। মনে হয় মানুষটি তার কোনো প্রিয়জনকে এই মাত্র শ্মশানে দাহ করে এসে সবকিছু হারিয়ে একেবারে হাল ছেড়ে বসে পড়েছে ভিলার নোনাধরা সিঁড়িতে।
স্টুডিওর একপাশে রাখা ফিফটিজ মডেলের সিঁত্রোন গাড়িটিকে বিদেশি ম্যাগাজিনে ছাপা অ্যান্টিক কোনো চিত্রের মতো দেখায়। কথাবার্তায় মনে হয় আজকাল চিত্রকরের ছবির বিক্রিবাট্টা একেবারেই কমে এসেছে। মেয়েটি মারা যাওয়ার পর থেকে তিনি আর তেমন কিছু বিশেষ আঁকেননি। অনেকদিন পর লুয়াংপ্রবাংয়ের বাড়িগুলোর স্কেচে একটি সিরিজ করছেন। কলোনিয়াল আমলের পুরনো ধাঁচের এ বাড়িগুলো ক্রমশ ভেঙে পড়ছে। আর বছর দশেক পরে এগুলো থাকবে কি না কে জানে। এখন বিষয় হচ্ছে—দিনকাল তার আসলেই খারাপ যাচ্ছে, সন্ধে বেলা নদীর তীরে বসে যে দুই পাত্র ব্র্যান্ডি খাবেন সে রেস্টও বোধকরি জুটছে না। তাই ভাবছেন শখের সিঁত্রোনটি মাঝেমধ্যে ভাড়া দেবেন একটু সাইড ইনকামের জন্য। আমি ঘণ্টাকয়েকের জন্য সিঁত্রোনখানা রেন্ট করতে রাজি হই। গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসতে গিয়ে আরেকবার চিত্রে মেয়েটির আবেশ ছড়ানো মুখের দিকে তাকাই। একটু খটকা হতেই গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে গলা বাড়িয়ে ইজেলের ছবিটিও আরেকবার দেখি। মনে হয় মেয়েটির সঙ্গে ভিলার সিঁড়িতে বসা দীনহীন মানুষটির বেশকিছু মিল আছে।
লুয়াংপ্রবাং শহরে ট্রাফিক এত কম যে ঢিমে তালে অ্যান্টিক সিঁত্রোন চালাতে ভালোই লাগে। কিছুদিন আগে আমি সস্তায় জেনিথ বলে একটি রাশিয়ান ক্যামেরা কিনেছি। একটু আগে ফরাসি চিত্রকরের স্পডুডিওতে বাড়িঘরের কিছু চিত্র দেখেছি বলে লুয়াংপ্রবাংয়ের ঘরদুয়ারকে আজ অন্যরকম দেখায়। আমি গাড়ি থামিয়ে ফরাসি কেতার একটি ভিলার সামনে নামি। চিত্রকর ইজেলে এ বাড়িটি নিয়ে কাজ করছেন। ভিলাটি নোনা ধরে ঝুরঝুরে হলেও এখনো তার শাটার দেওয়া প্রশস্ত ফ্রেঞ্চ উইন্ডো, ঝুলবারান্দা ও টাইলস বসানো সিঁড়ি নিয়ে কলোনিয়াল যুগের মাসকট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এ ভিলার সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে কেন জানি একটু আগে চিত্রকরের চাঙবাংলোর সিঁড়িতে বসা বিষাদগ্রস্ত মানুষটির কথা মনে আসে।
আমি আবার সিঁত্রোন চালাই। অনেকদিনের পুরনো গাড়ি বলে সারাক্ষণ ক্লাচ দাবিয়ে রেখে গাড়ি চালাতে হয়। থেকে থেকে আশঙ্কা হয় মাঝপথে যদি না লজ্ঝড়খানা বিকল হয়ে পড়ে। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হচ্ছে। লুয়াংপ্রবাং শহরে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার জায়গা খুবই কম। মেইন স্ট্রিট বলতে যা বোঝায় তা মোট একটি বা দুটি, গলিগুজি মিলিয়ে বড়জোর চার-পাঁচটিও হতে পারে। এতক্ষণে আমার তো সিঁত্রোন হাঁকিয়ে প্রায় সবকিছুই দেখা হয়ে গেছে। বর্ষীয়ান এ যানবাহন নিয়ে শহরের বাইরে যাওয়া রিস্কি। তাই মেইন স্ট্রিট দিয়ে আরেকবার গাড়ি চালাই। দোকানপাটে খদ্দের নেই একেবারে। ফুটপাত ধরে আলসে ভঙ্গিতে হাঁটেন বাসন্তি রঙের সেলাইহীন বস্ত্রপরা দুই বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। আমি আরেক সারি ভিলার সামনে এসে গাড়ি থামাই। না, এগুলো ফরাসি কেতার ধ্রুপদী ভিলা নয়। এখানে এক জামানার ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের হয়েছে লাও কেতার স্থানীয় ঘরদুয়ারের সঙ্গে দিব্যি দোঁ-আশলা মিশ্রণ। ফরাসি স্টাইলের সিঁড়ির সঙ্গে সংগতি রেখেই ছায়া দিচ্ছে লাও রীতির টালির ছাদ, চালের প্রান্তে কাঠের কড়িবর্গার কারুকাজ করা কৌণিক বিন্যাস। বাড়ি দুটির ছবি তুলতে গিয়ে খেয়াল হয় চিত্রকরের স্টুডিওর ফ্লোরে এ বাড়িগুলোর স্কেচ করা চিত্রও দেখেছি।
না, লুয়াংপ্রবাংয়ে আর গাড়ি হাঁকিয়ে দেখার বিশেষ কিছু নেই। নদীতীরের সড়ক ধরে কটেজে ফিরছিলাম। আমার সামনে খুব আস্তে ধীরে যাচ্ছে ফিফটি সিসির হোন্ডা ড্রিম মোটরবাইক। আরোহী হিলহিল করে কেঁপে কেঁপে সড়কে সাপের মতো এঁকেবেঁকে বাইক চালাচ্ছেন। সংকীর্ণ রাস্তায় পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। সিঁত্রোন এমনিই আস্তে যাচ্ছে, আর স্পিড কমালে তো রাস্তায় আটকে পড়ব। হর্ন দিতে গিয়ে দেখি তাও বিকল হয়ে আছে অনেকদিন হলো। ঘটনা কী? সামনের বাইক যে একেবারে থেমে গেল। দ্রুত ব্রেক করতে চাই, ব্রেক কাজও করে, কিন্তু সামনের বাইক থেমে যাওয়াতে তার সঙ্গে বাম্পারের একটু ছোঁয়াছুঁয়ি হয়, তাতে বাইক নিয়ে আরোহী হুড়মুড় করে সড়কে ছিটকে পড়েন। আমি গাড়ি থেকে নামি। ভদ্রলোকের হাতের কনুই ছিলে গেছে। সন্ন্যাসী দুজন এসে তাকে ওঠান। আমি সড়ক থেকে ধরাধরি করে চাকা ঘূর্ণায়মান বাইককে সাবধানে দাঁড় করাই। ভদ্রলোক কনুয়ের রক্ত প্যান্টে মুছে থরথর করে কাঁপছেন, তার সারা শরীর থেকে ভকভক করে বেরোচ্ছে লাওলাও বলে কড়া ধেনো মদের গন্ধ। বাইকের ক্যারিয়ার থেকে সড়কে ছিটকে পড়ে ভেঙেছে একটি লাওলাওয়ের বোতল। ক্যারিয়ারে বেতের খাঁচায় রাখা একজোড়া হাঁস ও দড়ি দিয়ে বাঁধা মিষ্টি কুমড়া ও একগুচ্ছ ঝিঙ্গা। সড়কের পিচে ঘষা খেয়ে দুমড়ে গেছে আনাজপাতি; আর বেতের খাঁচার ডালা খুলে যেতে হাঁস দুটি ঝটপটাচ্ছে বেদম হারে।
অ্যাকসিডেন্ট হয়ে যাওয়াতে আমি অপরাধ বোধ করি। বেচারি বোধকরি কাঁচাবাজার সেরে বাড়ি ফিরছিলেন। খানিক পান করে তার একটু মৌতাতও হয়েছে। সিঁত্রোনখানা আরেকটু হুঁশিয়ার হয়ে চালালে হতো। খালি খালি নিরীহ মানুষটিকে জখম করে সন্ধের মুখে তার মুড নষ্ট করে দিলাম। আচরণটি নিতান্তই নাহক। এখনই মাফ চেয়ে একটু ক্ষতিপূরণ দিয়ে বিষয়টির ফয়সালা করতে হয়। কিন্তু আরোহী ভদ্রলোক আমাকে সে সুযোগ দেন না; বরং উল্টা বারবার হাত জোড় করে তিনি আমার কাছে মাফ চান। আমি কী করব বুঝতে না পেরে তাকে ক্ষতিপূরণ হিসাবে তত্ক্ষণাত্ কিছু টাকা দিতে চাই। তিনি জোড়হাতে তা ফিরিয়ে দিয়ে আবার খুব বিনীতভাবে মাফ চেয়ে বাইকে চড়ে হিলহিল করে এঁকেবেঁকে চলে যান।
সন্ধ্যা লাগার মুখে জারুল গাছের নিচে নদীর দিকে মুখ করে ইজি চেয়ারে বসি। ঘোলাজলের ঢেউয়ে সওয়ার হয়ে দিনের শেষ আলোটুকু ভেসে যাচ্ছে ভাটির দিকে। বেশ কয়টি বুনোহাঁস ডানা আধেক প্রসারিত করে স্রোতের সঙ্গে ঝুঝে যেন ছুটছে উজানে। ঠিক এ সময় একটি মোটরবাইক এসে থামে কটেজের আঙিনায়। টলোমলো পায়ে প্রৌঢ় আরোহী চলে আসেন আমার দিকে। হয়তো তিনি ক্ষতিপূরণ নিতে এসেছেন। আমি মানসিক প্রস্তুতি নিই। না, তিনি হাতে করে নিয়ে এসেছেন রঙিন কাগজে তৈরি একটি ফানুস। আমার খুব কাছে এসে কাতরভাবে আবার মাফ চাইলে আমি তার চোখেমুখের গাঢ় বিষাদ দেখে ব্যথিত হই। খুব নড়বড়ে হাতে তিনি ফানুসের ভেতর মোমবাতি জ্বালান। আমার সৌভাগ্য কামনা করে তিনি নিয়ে এসেছেন রঙিন কাগজের পর্দায় আটকানো এ আলো। জারুলের নিচু ডালায় ঝুলিয়ে দিয়ে তিনি আমার দিকে তাকালে আমি হঠাত্ করে তাকে পরিষ্কার চিনতে পারি। হ্যাঁ, এইতো সেই মানুষ, তাকে না সকালের দিকে চিত্রকরের চাঙবাংলোর সিঁড়িতে বসে থাকতে দেখেছি? স্টুডিওতে ইজেলে আটকানো মৃত তরুণীর চিত্রের মুখের সঙ্গে তার যেন কোথায় বেশ খানিকটা মিল আছে। কৌতূহল হয় তার সঙ্গে ডেঙ্গু জ্বরে মৃত মেয়েটির কোনো সম্পর্ক আছে কি না? আমি তার ভাষা বলতে পারি না বলে খুব খারাপ লাগে। তিনি ফিরে যাওয়ার উদ্যোগ নিলে—আমি আঙুলের ইশারায় পাশের চাঙবাংলোটি দেখাই। তিনি থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে দু হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে ওঠেন হু হু করে। মৃদু হাওয়ার দুলে ওঠে ফানুসটি। দূরে নদীজলে প্রতিফলিত হয়ে স্রোতে ভেঙেচুরে একাকার হচ্ছে তার আলো। হাওয়ার তোড় একটু বাড়লে পাশের চাঙবাংলোর ব্যালকনি থেকে ভেসে আসে মধু মাখানো তামাকের সৌরভ।
