শরত্কাল চলে এসেছে। আকাশে মেঘগুলো মনের আনন্দে এখানে ওখানে ঘুরে বেড়াতে লাগল। আর মেঘগুলোর যখন নামতে ইচ্ছে করে তখন তারা ঝমঝম শব্দ করে নামতে থাকে। ওরা নামলেই তো বৃষ্টি। শরত্কালেই ওরা আকাশে নানারকম ছবি আঁকে। কখনো তা হয়ে যায় রবীন্দ্রনাথের ছবি কখনো ঘোড়া বা হাতির ছবি। এই শরতেও বৃষ্টি ঝরঝর করে পড়ে আর পড়ে। এই সময়টাতেও যেন ওদের নদী-খাল-বিল-সমুদ্রের সঙ্গে বেশ ভাব। এই রকম বৃষ্টির দিনগুলোতে যখন নিটোল, এষা, শোভন, স্নেহা, ঈক্ষণরা স্কুলে যায়, তখন প্রায় প্রতিদিনই বৃষ্টি এসে তাদের ভিজিয়ে দিতে লাগল, সঙ্গে ভিজিয়ে দিতে লাগল তাদের বইখাতা, টিফিন, রংপেনসিল সব। ব্যাগের ভেতর যা-ই থাক কোনোকিছু আর রক্ষা পায় না। বৃষ্টির দিন বৃষ্টি তো আসবেই। কিন্তু ওদের কারো ছাতা নিয়ে যেতে মনে থাকে না। ওদের মধ্যে যদি এক-দুজন ছাতা নিয়ে যায়ও—সেই এক-দুটো ছাতা দিয়ে তো আর এতজনের মাথা ঢাকবে না! ওদের সবার সঙ্গে সবার ভালো বন্ধুত্ব। যদি কেউ স্কুলে আসতে দেরি করে—তাহলে তার হয়ে অন্য কেউ প্রেজেন্ট মেম বলে চালিয়ে দেয়। মেম বুঝতেও পারে না। যদি কেউ টিফিন আনতে ভুলে যায় তাহলে সবাই মিলে সব খাবার একজায়গায় ঢেলে দেয়, তারপর তা থেকে তুলে খায়! ওরা পঞ্চরত্ন বলেও পরিচিত সবার কাছে। যদি কেউ কোনো কারণে পড়া না শিখে আসে—তাহলে অন্যরাও পড়া না পারার ভান করে। মেমই ওদের কাণ্ডকারখানা দেখে নাম দিয়েছেন পঞ্চরত্ন। তো এই পঞ্চরত্ন একদিন ঠিক করল—ওরা সবাই মিলে বেশ বড়ো একটা ছাতা বানিয়ে ফেলবে। যাতে পাঁচজনের এক ছাতাতেই মাথা ঢেকে যায়! নিটোল প্রথমে ছাতাটার একটা ছবি আঁকল। সেই ছাতার ছবি দেখতে হলো একদম আলাদা। গোলাকারের বদলে প্রজাপতির পাখার মতো। ছবি আঁকার পর সে সবাইকে দেখাল। এষা বলল—সব ঠিক আছে। কিন্তু এত বড় ছাতা বানাবি কী করে? নিটোল তখন একগাল হেসে দিয়ে বলল, সেটা কোনো ব্যাপার হলো? ওয়াটার প্রুফ কাপড় কেটে আমরা এটা বানাবো। তারপর খোঁজ খোঁজ খোঁজ, সবাই মিলে ওয়াটার প্রুফ কাপড়ের সন্ধানে নেমে পড়ল। কাপড়ও জোগাড় হয়ে গেল। শোভনদের ওয়াটার প্রুফ কাপড়ের বড় ব্যবসা আছে। বাকি থাকল স্টিক। এত বড় ছাতা হবে, তাই স্টিকও লাগবে অনেক। ঈক্ষণের মামার স্টিকের ব্যবসা। ঈক্ষণ অনেকগুলো স্টিক নিয়ে এল। সঙ্গে একটা স্টিলের বড় স্ট্যান্ডও। আর স্নেহার বাসার পাশেই থাকেন দর্জিচাচা। স্নেহাকে যে কিনা খুব আদর করেন। স্নেহার কাছে সব শুনে দর্জিচাচা বললেন, নিয়ে এসো সব। আমি সব একত্র করে সেলাই করে দিচ্ছি। দর্জিচাচা ছাতার ছবি দেখে আগে মাপ নিলেন। তারপর সুন্দর করে কাঁচি চালিয়ে দিলেন কাপড়ে। অনেকক্ষণ ঘরঘর ঘরঘর শব্দ করে ছাতার ছাউনি তৈরি হয়ে গেল। তারপর তিনি লাগালেন স্টিক ও স্ট্যান্ড। তৈরি হয়ে গেল এভাবে সেই সুন্দর ছাতাটি। ছাতাটার ওপর দর্জিচাচা অনেক রঙিন সুতো দিয়ে ঝালরও লাগিয়ে দিলেন। লাল, নীল, সবুজের ঝালর ছাতাটাকে একেবারে অন্যরকম করে তুলল। ছাতা তৈরি হওয়ার পর ওরা স্কুলে যাবার জন্য প্রস্তুত হলো। সেদিনও খুব বৃষ্টি হলো। সবার ভেতর উত্তেজনা টগবগ টগবগ করে ফুটছে। সেই ছাতা ওপরে তুলে দিয়ে ওরা মনের আনন্দে স্কুলে যাবে। ছাতা ওপরে তুলে দিতেই এত বড় ছাতায় সবার মাথা ঢেকে গেল। দূর থেকে মনে হবে—বৃষ্টিতে একটি রঙিন ফুল ভিজতে ভিজতে হাঁটছে!
