টক শো—হাংগম, দেহনং, গর্দামি

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২০:৪২

বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলোতে বেশ কয়েক বছর ধরে টক শো অনুষ্ঠান চলে আসছে এবং এর প্রশংসাও কুড়িয়েছে। টক শোর মাধ্যমে বিভিন্ন জন তাদের মত প্রকাশের সুযোগ পেয়ে থাকেন। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলের পক্ষে এ সুযোগ বেশি থাকে। সাংবাদিক, সমালোচক, পর্যবেক্ষক কিংবা বিশ্লেষকসহ বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিবর্গ টক শোতে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর তাদের মত প্রকাশ করেন। এ অনুষ্ঠানে সাধারণত দুইটি পক্ষ থাকে যারা আলোচ্য বিষয়ের পক্ষে-বিপক্ষে তর্কবিতর্ক করে থাকেন। রাজনৈতিক আলোচনার জন্য টিভি কর্তৃপক্ষ দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদেরকে আহ্বান করে থাকেন এবং উপস্থাপক অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন। টক শোতে রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গকে দেখা যায়, তারা তাদের যুক্তিতর্ক দিয়ে যে যার পক্ষে কথা বলেন এবং নিজেদেরটাই সঠিক ও বাস্তব বলে বিশ্বাস করেন এবং করাতে চান। বাংলাদেশের প্রধান দুইটি রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রী যখন টক শোতে আসেন এবং তর্কবিতর্কে অবতীর্ণ হন, তখন দেখি তারা কখনো কখনো এতই উত্তেজিত হয়ে পড়েন যে, তাদেরকে নিবৃত্ত করতে উপস্থাপক রীতিমতো হিমশিম খেয়ে যান। ধৈর্য ধরে কেউ কারো কথা শুনতে চান না। উভয়ে একই সঙ্গে বাগ্যুদ্ধ চালিয়ে যান। কে যে কী বলছেন কারো পক্ষে শোনা বা বোঝার উপায় থাকে না। যিনি উপস্থাপক থাকেন তিনি অসহায়ত্ব বোধ করেন। তাদের উত্তেজিত বাক্য ব্যবহার, একে অপরের প্রতি ঔদ্ধত্য আচরণসহ অঙ্গুলি প্রদর্শন এমনকি কে বেশি বেয়াদব বলাবলির ভিতর দিয়ে পরিস্থিতি চরমে পৌঁছে টক শোটি ঝগড়াঝাটিতে রূপ নেয়, যা দর্শক-শ্রোতাদেরকে তাদের মূল্যবান সময় ব্যয় করে দেখতে হয়। এমন টক শো দেখে দর্শক-শ্রোতারা কী পেলেন সেটি একটি প্রশ্ন। বলতেই হয় আমাদের দেশের প্রধান দুইটি রাজনৈতিক বড়ো দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের অতিথিরা যখন টক শোতে তর্কবিতর্কে অবতীর্ণ হন তখন দর্শক-শ্রোতারা তাদেরকে যুদ্ধংদেহি মনোভাবে দেখতে পান। তাদের মধ্যে এমন একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যেন এই বুঝি তারা মারামারিতে অবতীর্ণ হবেন। আগে যাদেরকে টক শোতে দেখা যেত তাদের অনেককে এখন তেমন দেখা না গেলেও উভয় দলেরই নতুন নতুন মুখ দেখতে পাওয়া যায়। বিশেষ করে বিএনপি থেকে নতুন মুখ সংরক্ষিত আসনের মহিলা এমপি ও আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতার দুই-একটি টক শো দেখার সৌভাগ্য আমার হলেও তা দুর্ভাগ্যে পরিণত হয়েছে। কথা বলতে গিয়ে যেভাবে তারা উত্তেজিত হয়ে যান তাতে মনে হয়—টক শো যেন হাংগম, দেহনং, গর্দামিতে পরিণত হয়েছে। মনে হয় দর্শক হিসেবে সময়টা অযথাই ব্যয় হয়েছে। তারা আলোচনায় আশাতীত কোনো ভালো দিক-নির্দেশনা দেখাতে না পারলেও অতীত কর্মকাণ্ডের পুরোনো রেকর্ড বাজিয়ে নিজেদের কৃতিত্ব বজায় রাখতে চান এবং এ প্রতিযোগিতায় কে কাকে নিচে ফেলে ওপরে থাকবেন তার জন্য জীবন বাজি রাখেন। এতে দর্শক-শ্রোতারা যেটা বোঝার সেটা বুঝে নিলেও তারা কিন্তু বুঝতে চান না। যার কারণে পরিবর্তনের সিদ্ধান্তটা বাংলার নীরব দর্শকরা সময়মতো নিজেরাই নিয়ে থাকেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নতুন মুখ সংরক্ষিত আসনের বর্তমান মহিলা এমপি ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা একটি টক শোতে বলেছেন, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে তাকে দুই মিনিট সময় দেওয়া হয়েছিল কথা বলার জন্য। তিনি নাকি আধা মিনিটও কথা বলতে পারেননি। সংসদের নিয়ম অনুযায়ী তিনি যদি নির্ধারিত দুই মিনিট সময় পেয়ে থাকেন তবে কি তার উচিত হবে না নির্ধারিত আলোচ্য বিষয়ের ওপর ভেবেচিন্তে সহজ করে প্রাসঙ্গিক কথাটুকু সুন্দরভাবে সংসদে উপস্থাপন করা? কিন্তু তিনি যদি তা না করে সংসদের বিধি অনুযায়ী বক্তব্য না রেখে অতীত ঘটনার পুনরাবৃত্তি করে পুরো সময়টাই ব্যয় করে দেন তাহলে বাকি মূল্যবান কথা বলার সময় থাকবে না—এটাই স্বাভাবিক। এমনি অবস্থায় বিরোধী দল থেকে আশান্বিত মূল্যবান কথা শোনা থেকেও জাতি বঞ্চিত হয়। রাগ কিংবা তেজি গলায় কথা বলে দৃষ্টি আকর্ষণ করা যেতে পারে; কিন্তু কোনো সমস্যার সমাধান হয় না। টক শোতে রেগে গিয়ে কোনো একজন এ কথাও বলে ফেললেন যে, তিনি চলে যাবেন। কেউ চলে যাবেন আর একটু হলে কেঁদে ফেলবেন—এটা তার নিজস্ব ব্যাপার; কিন্তু নীরব দর্শক-শ্রোতাদের কী হবে তা তাদেরকেই ভাবতে হবে। চলে গেলে বা কেঁদে ফেললে দর্শক-শ্রোতারা যে তাদের মূল্যবান সময় ব্যয় করে ভালো কথা শোনার আগ্রহে সময় ব্যয় করলেন সে ক্ষতির দায় কে নেবে? পুরোনো রেকর্ড বাজানো ছাড়া তাদের কি আর কিছুই বলার নাই। তাই অনুরোধ জানাতে চাই, টক শোতে এসে ধৈর্যের সঙ্গে মূল্যবান কথাগুলো বলুন এবং জাতিকে আগামী দিনের সুন্দর পথ দেখান। মনে রাখবেন আপনাদের কাছে দর্শক-শ্রোতা ভালো কিছু আশা করলেও অন্তত হাংগম, দেহনং, গর্দামি আশা করে না।

n লেখক :কবি ও প্রবন্ধকার, সখীপুর, শরীয়তপুর