অর্থনৈতিক সাফল্যে ঢাকা পড়েছে
শফিকুর রহমান রয়েল
ভেতরটা আসলে অন্তঃসারশূন্য আর বাহিরটা ফোলান ফাঁপানো এবং যত গর্জে তত বর্ষে না- এ জাতীয় কত কথাই না বলেছে সমালোচকেরা। রুয়ান্ডা সরকার কর্তৃক বর্ণিত অর্থনৈতিক সাফল্যগাঁথা ও উচ্চ প্রবৃদ্ধির হারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে মোটেও কুণ্ঠাবোধ করেনি অনেক অর্থনৈতিক বোদ্ধা। কিন্তু তারা এবার কী বলবে? আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) যে তাদের মুখে কুলুপ আঁটানোর বন্দোবস্ত করে দিয়েছে। আইএমএফ ঘটা করেই বলে দিয়েছে যে, চলতি বছরে জিডিপি বৃদ্ধির হার বিবেচনায় শীর্ষস্থানটি দখল করবে আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডা। ২০১৯ সালে তাদের প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়াবে ৭.৮ শতাংশ। ৭.৩% নিয়ে দুই নম্বর স্থানে থাকবে বাংলাদেশ। তাদের ঘোষণা ও বর্ণনা অনুযায়ী একই হার সত্ত্বেও ভারত থাকবে এর পরের অবস্থানে, অর্থাত্ তিন নম্বরে।
গবেষকরা দেখিয়েছেন ২০০০ থেকে ২০০৫, এই সময়ে মাথাপিছু ভোগ প্রবৃদ্ধি ও জিডিপি এগিয়েছিল প্রায় সমান তালে। কিন্তু ১৯৯৫ থেকে ২০১৩, এ সময়ে এ দুটিতে ব্যবধান গড়ে ওঠে বেশ বড়ো আকারেরই। অথচ মাথাপিছু জিডিপি পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে যে, ঐ সময়ে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ৫.৫%। গবেষকরা এর মাধ্যমে বুঝিয়ে দেন যে, রুয়ান্ডার জিডিপি প্রবৃদ্ধির মানদন্ড কিছুটা ত্রুটিপূর্ণ। তারা একেবারে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেন যে, খানা জরিপ উপাত্তের চেয়ে রাষ্ট্রীয় হিসাবের অর্থহীন হওয়াটা অধিকতর সহজ। প্রমাণ দিতে গিয়ে গ্রিসের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন, যারা সম্প্রতি তাদের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানসমূহকে বিকৃত করেছিল।
অনেক ক্ষেত্রেই রুয়ান্ডার জনগণকে যে প্রেসিডেন্ট পল কাগামের স্বৈরাচারি আচরণ সহ্য করতে হয়, এতে কোনো সন্দেহ নেই। ৯৮ শতাংশ ভোট নিয়ে তার তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়াটাও যথেষ্ট সন্দেহযুক্ত। তবে তিনি কাজের কাজটি কিন্তু ঠিকই করছেন। ২০০০ সালে তার সরকার ক্ষমতায় আসার পরই প্রতিষ্ঠিত হয় দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশল ভিশন ২০২০, যার মূল লক্ষ্যই হচ্ছে ওঠতি বেসরকারি খাতকে কাজে লাগিয়ে ঐ সময়ের মধ্যে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে রূপ দেওয়া। তখন থেকেই প্রতিবছর কমপক্ষে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে রুয়ান্ডার অর্থনীতি। তার প্রমাণ হচ্ছে বেশ কয়েক বছর আগেই আফ্রিকার সবচেয়ে দ্রুততম অর্থনীতির দেশসমূহের একটি হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া।
টানা প্রায় দুই দশক যাবত্ দৃঢ় অর্থনৈকি প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। এর পেছনে রুয়ান্ডা সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি বহুবিধ কারণ রয়েছে। প্রথমেই যে বিষয়টি উল্লেখ করতে হয় সেটি হচ্ছে, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে হালকা ও ভারি অবকাঠামো নির্মাণের পেছনে পর্যাপ্ত সময় ও সম্পদ বিনিয়োগ করেছে রুয়ান্ডা সরকার। ২০১৭ সালের দুর্নীতি উপলব্ধির সূচকে রুয়ান্ডা হচ্ছে আফ্রিকা মহাদেশের মধ্যে তৃতীয় সর্বনিম্ন দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ। তারা শুধুমাত্র ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করেই ক্ষান্ত থাকছে না, প্রায় পুরোপুরিভাবে কৃষিনির্ভর পরিচিতি থেকে বেরিয়ে আসার যথাযথ চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে। উন্নত হচ্ছে সেবাসমূহ; বিস্তৃত হচ্ছে ম্যানুফ্যাকচারিং খাত। বিশ্ব ব্যাংকের ২০১৯ সালের ডুয়িং বিজনেস সূচক বলছে রুয়ান্ডা হচ্ছে ব্যবসা করার সহজতর প্রশ্নে বিশ্বের ২৯তম আর শীর্ষ ত্রিশের মধ্যে থাকা একমাত্র নিম্ন আয়ের দেশ। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডার মাথাপিছু জিডিপি ছিল মাত্র ১৪৬ মার্কিন ডলার। ২০১৮ সালে তা পৌঁছে ৭৯১ মার্কিন ডলারে (আইএমএফ)। টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও রুয়ান্ডা সরকারের সামনে সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ হচ্ছে দারিদ্র্যের উচ্চ হার নামিয়ে আনা এবং জনসংখ্যার সর্ববৃহত্ অংশ তরুণদের জন্য কাজের সৃষ্টি করা। তাদের জাতীয় পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউটের দেওয়া তথ্যানুসারে ১৬ থেকে ৩০ বয়সি লোকের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ২৬.৫ শতাংশ। লেখাপড়া জানে তাদের ৮৫ শতাংশ লোক। ৫৩ শতাংশ লোকের বয়স ১৯ বছরের নিচে হলেও মোট জনসংখ্যার ১৮.৭ শতাংশ লোক বেকার। এ জনসংখ্যাগত বৈশিষ্ট্যকে সমস্যার বদলে সম্ভাবনা বানাতে গেলে অনেক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে হবে দেশটিকে। তাদের ৩৮ শতাংশ লোক এখনো দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করে।
—টিআরটিওয়ার্ল্ড অনুসরণে
