কুমিল্লায় বাড়ছে গ্যাং গ্রুপের তত্পরতা

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:৩৫

মামশাদ কবীর

 

কুমিল্লায় কিশোর অপরাধীদের তত্পরতা দিন দিন বাড়ছে। সন্ধ্যার পর নগরীর বিভিন্ন অলিগলি, বিপনিবিতান, ব্যস্ততম সড়কের আশপাশ এবং নগরীর একমাত্র রেসকোর্স-শাসনগাছা ফ্লাইওভারের ওপর গ্যাং দলের সদস্যদের হোন্ডা রেখে দলবেঁধে আড্ডা দিতে দেখা যায়। আর তাদের অস্তিত্ব জানান দিতে নগরীর ব্যস্ততম এলাকার বাসাবাড়ি, দোকানপাট বা বহুতল ভবনের দেয়ালে গ্যাং গ্রুপের তরুণ-কিশোররা তাদের সংগঠনের নাম লিখছে অবলীলায়।

কুমিল্লায় গ্যাং কালচারের শুরু প্রায় দু’দশক আগে। ২০০০ সালের প্রথম দিকে নগরীর বাদুরতলা এলাকায় কিছু তরুণ স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‘আতকা’ নামে একটি গ্রুপ তৈরি করে। এরপর একে একে নগরীর জিলা স্কুল রোড, ভিক্টোরিয়া কলেজ রোড, মোগলটুলী, বাদুরতলা, নজরুল অ্যাভিনিউ, রাজগঞ্জ, তালপুকুরপাড় এলাকায় বাড়তে থাকে গ্যাং গ্রুপের পৃথক পৃথক নাম-পরিচয়। বর্তমানে নগরীতে ৩০টির বেশি গ্যাং গ্রুপ রয়েছে—সিআর সেভেন, ব্লাক ড্রাগন, রেক্স, ভিল্লা গ্রুপ, ঈগল গ্যাং, ঈগল, আরজিএস, মডার্ণ, রকস্টার, ডিস্কো বয়েজ, ডি-ডব্লিউ, অ্যাকশন টাইম, নাইট ডেভিলস, সিজেএম-২, এসকে, আর-৭, রেঞ্জারস্ , ব্ল্যাক সেডো, কেএনএক্সটি, রিয়াদ রেক্স, এলআরএন, সিএমএইচ, বক্সার, বস, ডিভিসি, এনএক্সটি, রয়েল গ্যাং, ব্ল্যাকসেডো, আনলিমিটেড আড্ডা ইত্যাদি। এসব গ্রুপের তরুণ-কিশোরদের দলবেঁধে আড্ডা দিতে দেখা যায় নগরীর প্রতিটি ব্যস্ততম এলাকায়।

সন্ধ্যার পর যেখানে এসব তরুণ-কিশোরের লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করার কথা, সেখানে যত্রতত্র আড্ডা—তারা কতটা বিপদগামী বা অনিয়ন্ত্রিত তা সহজেই বোঝা যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক, অভিভাবক জানান, গ্যাং কালচারে জড়িতরা কিশোর অপরাধী—হত্যা, ধর্ষণ, মাদক সেবন বা পাচার, আগ্নেয়াস্ত্র বহন, হামলা, লুটপাট ও ছিনতাইসহ প্রায় সবধরনের অপরাধে জড়িয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রতিটি শিশুর জন্মের তারিখ ঠিকভাবে নিবন্ধিত হলে অপকর্মে জড়িত কিশোর অপরাধীর তকমা দিয়ে অনেকেই পার পাওয়ার সুযোগ পেত না। গ্যাং কালচারে জড়িতদের প্রধান বাহন মোটরসাইকেল। যখন তখন তাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তেব্যে দ্রুত ছুটে যাচ্ছে। কখনো সহযোগীকে প্রতিপক্ষের হামলা থেকে রক্ষা করতে, কখনোবা প্রতিপক্ষের ওপর হামলা, মাদক সেবন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি সবকিছুতেই এই বাহনের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে।

প্রতিদিনই এসব তরুণ-কিশোরকে গার্লস স্কুলগুলোর সামনে হোন্ডা নিয়ে অপেক্ষমাণ দেখা যায়। এই তরুণদের হাতে দামি মোবাইল ফোন, পকেটে বেনসন সিগারেট প্যাকেট। এদের বিব্রতকর নানা কমেন্টসে আতঙ্কিত অভিভাবকরা। নগরীর বাদুরতলা এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক জানান, তিনি কিছুতেই তাঁর দশম শ্রেণি পড়ুয়া সন্তানকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছেন না। তাঁকে কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিলে উলটো ছেলে হারানোর আশঙ্কা করেন। তিনি বলেন, এই বয়সেই ছেলেকে প্রতিদিন ৫০০-৭০০ টাকা দিতে হয়। যা খরচ করে সে নেশার পেছনে।

কুমিল্লায় সাম্প্রতিক সময়ে কিশোর গ্যাং কালচারে কমপক্ষে ৬ জন খুন হওয়াসহ আহত হয়েছে অগণিত। অনেক অভিভাবক সন্তানের ভবিষ্যত্ ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কায় হামলা বা মারধোরের বিষয়টি চেপে যান। দায়িত্বশীল সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গ্যাং কালচার অর্থাত্ তরুণ-কিশোর শিক্ষার্থীদের অপরাধে জড়িয়ে যাওয়ার পেছনে প্রথমত দায়ী তাদের অভিভাবকরা। ঘর থেকে তাদের নিয়ন্ত্রণ বা খোঁজখবর নিয়মিত রাখলে সন্তান বেপরোয়া হওয়ার আগেই লাগাম টানতে পারতেন। আর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত সন্ধ্যার পর আড্ডায় পেলে তাদের অভিভাবকদের না ডেকে সরাসরি আইনের কাছে সোপর্দ করা। এতে অভিভাবকদের মাঝেও একটা অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে সন্তানদের দেখভালের বিষয়ে।

কুমিল্লা