যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সমবায়বিষয়ক সম্পাদক এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীম নগদ ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা, ১৬৫ কোটি টাকা এফডিআরের নথি, অস্ত্র, মাদকসহ গ্রেফতার হয়েছেন। একই সঙ্গে গ্রেফতার হয়েছে তার সাত জন নিরাপত্তাকর্মী। শামীমের কাছ থেকে অত্যাধুনিক একটি আগ্নেয়াস্ত্র এবং তার সাত দেহরক্ষীর কাছ থেকে সাতটি শটগান ও কয়েক বোতল বিদেশি মদ জব্দ করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর গুলশান নিকেতনে ৫ নম্বর রোডের ১৩ নম্বর বাসায় শামীমের জি কে বিল্ডার্স কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে র্যাব তাকে গ্রেফতার করে। পরে দুপুর ১২টার দিকে একই রোডের ১৪৪ নম্বর বাড়িতে অভিযান চালায় র্যাব। ঐ বাড়ি শামীমের নিজস্ব। গতকাল সন্ধ্যা ৬টা ১৪ মিনিটে তাকে জি কে বিল্ডার্স কার্যালয় থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য র্যাব-১ কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
র্যাবের একটি সূত্র জানায়, বুধবার রাতে র্যাবের অভিযানে গ্রেফতার হওয়া যুবলীগের নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী জি কে শামীমকে গ্রেফতারে অভিযান চালানো হয়। সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে আরো কয়েকজনের নাম বেরিয়ে এসেছে। তাদের ধরতেও অভিযান চালানো হবে। পাশাপাশি বিমানবন্দরকেও অবহিত করা হয়েছে, সন্দেহভাজন এসব নাগরিক যেন দেশ ছাড়তে না পারেন।
শামীম রাজধানীর সবুজবাগ, বাসাবো, মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রভাবশালী ঠিকাদার হিসেবে পরিচিত। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তাকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে র্যাব। জি কে শামীম যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সমবায়বিষয়ক সম্পাদক বলে লোকমুখে শোনা গেলেও সংগঠনটির শিক্ষা সম্পাদক মিজানুল ইসলাম মিজু বলছেন, শামীম যুবলীগের কেউ নন, তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি।
শামীমের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে ব্যবস্থা—র্যাব
শামীমের কার্যালয় থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ উদ্ধারের ঘটনায় মানি লন্ডারিং আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে র্যাব। অভিযান শেষে র্যাবের মুখপাত্র লে. কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম সাংবাদিকদের বলেন, ‘গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আমরা জানতে পারি, জি কে শামীমের কাছে কিছু অর্থ ও অস্ত্র রয়েছে। এছাড়া তিনি চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজিতে ব্যস্ত ছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমরা তার বাসা ঘেরাও করি। এ সময় তার সাত জন বডিগার্ডকে গ্রেফতার করি। তাদের কাছ থেকে সাতটি শটগান জব্দ করা হয়। বিপুল পরিমাণ গুলি উদ্ধার করা হয়। পরে তথ্য নিয়ে আমরা তার অফিসে অভিযান পরিচালনা করি।’
র্যাব কর্মকর্তা বলেন, তার বাসায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা উদ্ধার করা হয়, যার পরিমাণ ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার মতো। ১৬৫ কোটি টাকার এফডিআর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ১৪০ কোটি টাকার এফডিআর তার মায়ের নামে, বাকিগুলো তার নামে। কিছু মাদক ও একটি আগ্নেয়াস্ত্র পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা অবশ্যই স্বীকার করি, তার ঠিকাদারির ব্যবসা আছে। কিন্তু তার নামে টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আমরা মানি ল্ডারিং আইনে ফেলব। আমরা তদন্ত করে দেখব, তার কাছে এত টাকা কীভাবে এসেছে।’
অভিযানে অংশ নেওয়া র্যাব সদর দপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম বলেন, কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার মায়ের কোনো ব্যবসা নেই, কিন্তু তার নামে ১৪০ কোটি টাকার এফডিআর ছিল। যে সাতটি অস্ত্র পাওয়া গেছে, সেগুলো চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির কাজে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জব্দকৃত টাকা ঠিকাদারি ব্যবসার আড়ালে অবৈধ উপায়ে আয় করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। উনি যদি এসব অভিযোগকে আদালতে মিথ্যা প্রমাণ করতে পারেন, তাহলে ছাড়া পাবেন। আর যদি ওনার ওপর আনীত অভিযোগগুলো সত্য হয়, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আরো বলেন, ‘উনি কোনো দলের সদস্য কি না, তা আমরা জানি না। এটা দলীয় নেতারা সিদ্ধান্ত নেবেন। তারা তাকে দোষী পেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।’
এদিকে শামীমকে গ্রেফতারের বিষয়টি কঠোরভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছে জিকে বিল্ডার্সের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। জি কে শামীমের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মো. দিদারুল ইসলাম জানান, ‘স্যার বাসায় ঘুমাচ্ছিলেন। র্যাবের কর্মকর্তারা তাকে ঘুম থেকে তুলে অফিসে নিয়ে আসে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার সময় হেনস্তা করা হয়।’ তিনি জানান, ‘জি কে বিল্ডার্স একটি বড়ো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ টাকার লেবার বিল দিতে হয়। শুক্রবার হওয়ার কারণে টাকাগুলো ব্যাংকে জমা দেওয়া যায়নি। সেগুলো অফিসের ক্যাশ ভলিয়মে ছিল। র্যাব ঐ টাকা জব্দ করে নিয়ে গেছে।’
জি কে বিল্ডার্সের কর্মকর্তা মিজানুর রহমান লিমন জানান, ‘জি কে বিল্ডার্স দেশের বড়ো বড়ো প্রতিষ্ঠানের কাজ করছে। তার বিষয়ে আগে থেকেই র্যাব জানত। কার ইশারাই তাকে আটক করা হলো তা কিছু বুঝে আসছে না।’
শামীমের সঙ্গে আটককৃত দেহরক্ষীরা হলেন: শহিদুল ইসলাম, মুরাদ, দেলোয়ার, জাহেদ, সায়েম, আমিনুল ও কামাল।
