হামীম রায়হান
ঠিকানাবিহীন
বন্ধুত্বের কোনো ধরা বাঁধা নিয়ম-গণ্ডি নেই। কখন কে কোন কারণে বন্ধু হয়ে যায় তার যেমন হিসাব নেই, তেমনি কখন সেই বন্ধুই হয় বিপদের কারণ তারও হিসাব নেই। এই যেমন ধরুন এক রাতের ঘটনা।
গ্রামে তখন প্রতিরাতেই ডাকাতি হচ্ছিল। সবাই বেশ চিন্তিত। পাড়ায় পাড়ায় পাহারা বসানো হয়েছে। বাড়ির যুবক-বৃদ্ধরা পালা করে রাতে পাহারা দেয়। পাহারা বসানোয় ডাকাতি কিছুটা কমেছে। বাড়ির দা, ছুরি, লাঠি নিয়ে পাহারা দেয় লোকজন। কয়েক জায়গাই ডাকাত ধরে আচ্ছা পিটিয়ে পুলিশের কাছে তুলে দেওয়া হয়েছে। আবার ডাকাত মারার ঘটনাও আছে। গরমের রাত। আমরা আসছিলাম বন্ধুর বোনের মেহেদি অনুষ্ঠানের দাওয়াত খেয়ে। বন্ধু আলমগীরের একটা অভ্যাস ছিল কোথাও দাওয়াত খেতে গেলে, সেখানে দেওয়া কোক/ফানটা দিলে বোতলসহ নিয়ে আসা। সেদিনও তাই করল আলমগীর। অন্ধকারে হেঁটে হেঁটে সবাই কোক খাচ্ছিলাম। গভীর রাত। রাস্তায় কোনো লোকজন নেই। গ্রামের রাস্তায় হাঁটতে ভালোই লাগছিল। মাসুদ আর মোরশেদ গান ধরল। গানের টানে আলমগীর খালি বোতলে মারল জোরে লাথি। বোতলটা গিয়ে লাগল এক বাড়ির গেইটে! বিকট শব্দ! একে তো গভীর রাত, তার ওপর এমন শব্দ! আর যায় কই! এই বাড়ির ভেতরে সবাই ছিল পাহারায়। পাহারার জন্য সবাই দেশীয় অস্ত্র, দা, চুরি, লাঠি ইত্যাদি নিয়ে প্রস্তুত। এমন আওয়াজ শুনে তারা ভাবল হয়তো ডাকাতের আক্রমণের শব্দ। সবাই দেখি দেশীয় অস্ত্রসহ বেরিয়ে আসছে। কী করব বুঝতে পারলাম না। মোরশেদ বলল, ‘দৌড়া! দৌড় লাগা!’ সবাই দিলাম দৌড়! জীবন বাঁচানোর দৌড়। সবাই দৌড়াচ্ছে, পেছনে যমদূতরা! মনে আছে, সেদিনের দৌড়ে আমাদের সঙ্গে উসাইন বোল্টও পারত না! দৌড়ে সবাই মেইন রোডে চলে এলাম। ল্যাম্পপোস্টের আলোর নিচে এসে সবাই দাঁড়ালাম। তারাও আলোর নিচে আমাদের চিনতে পারল। বুঝতে বেশি সময় লাগল না। তারা এবার জিজ্ঞেস করল, ‘তোমরা তাহলে দৌড় দিলে কেন?’ মোরশেদ উত্তর দিল, ‘সাদেক চাচার ভয়ে। চাচার সিস্টেম তো, আগে মার, পরে কথা।’
আমি আশপাশে দেখছিলাম কোথাও আলমগীরকে দেখা যায় কি না। বেটা কোথাও নেই। সুযোগ বুঝে চম্পক দিয়েছে বেটা। বেটাকে পেলে তার গলায় কোপটা আমিই দিতাম প্রথমে! এরপর এক সপ্তাহ আলমগীরের কোনো দেখা পাওয়া যায়নি।
সেই রাতের ঘটনায় সুজন ছিলই না। কিন্তু সুজন যখন কোথাও তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর ঘটনা হিসেবে এ ঘটনার কথা উল্লেখ করে! আশ্চর্য! বেটা কেমন বানিয়ে বানিয়ে সে রাতের কথা উল্লেখ করে! আমরাও মুচকি হেসে তার কথায় সায় দিই।
