প্রিয় বন্ধু

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৮:৩২

রানা বিশ্বাস

গৌরীপুর, ময়মনসিংহ

টিনএজ একটা ছেলেকে বেশি চাপ দিলে বুঝি পড়া হজম হয়? হয় বদহজম। পেটে পুটপাট বাজতে থাকে বাজে ঢেঁকুরের ড্রাম। সেজন্য নিজেকে অহেতুক চাপ তো দিইই না, বরং চাপশূন্য রাখার জন্য সদা সতর্ক অবস্থায় থাকি। পড়ালেখা, সে একসময় হয়েই যাবে। আগে তো সুস্থতা, নাকি?

বেঁধে রাখা গরু বদ্ধ দশা থেকে মুক্তি পেলে যে অবস্থা, হঠাত্ বড় হয়ে যাওয়ার স্বাধীনতা পেয়ে সেই অবস্থা চলছে। চাষি না হয়েও সারা এলাকা চষে খাই। কলেজ কাঁপিয়ে আড্ডা মেরে তাস পেটানো আর কলজে কাঁপানো সুন্দরী দেখাই তখন প্রধান কাজ। জানে-জিগার বন্ধু সুমন আমার সব কাজের সঙ্গী। যা ভাবি তাই করি, সব একসঙ্গে। রাস্তার পাশে ছোট বাথরুম সারার সময় দমকলের গরম পানি ছেড়ে কাটাকাটি খেলার সাথিটা শুধু আমার ক্লাস ফ্রেন্ডই না, গ্লাস ফ্রেন্ডও। চায়ের টং দোকানের মাইক্রো সাইজের এক গ্লাস চা ভাগ করে খাওয়া দোস্ত সুমন।

বিধাতা নিজে একা বলেই হয়তো আমাদের এই দোকা থাকার সুখ বেশিদিন সহ্য করতে চাইল না। নইলে কোনো বজ্রপাত, ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোন ছাড়াই সু-মন কী করে কু-মন হয়ে হয়ে যায়!

ঘটনার শুরু পাশের বিল্ডিংয়ের তিনতালায় নতুন ভাড়াটে আসার পর থেকে। কে বলে সব পরীরা পরীরাজ্যে থাকে? ডাহা মিথ্যা। দুদিনের মাথাতেই তিনতলার ব্যালকুনিতে মাঝে মাঝে একটা পরীকে দেখা যেতে লাগল। পরীর ডানা কাটা, উড়ে না, পায়ে হেঁটে চলে। এটা জানা গেল আরো দুদিন পর। কোচিংয়ে পড়তে যাওয়ার উদ্দেশ্যে মেয়েটা সামনে দিয়ে হেঁটে না গেলে ব্যাপারটা বিশ্বাসই হতো না।

শ্যামলা ছিপছিপে একটা মেয়ে যে পরী হতে পারে, সৌন্দর্যের চূড়ান্তে অবস্থান করতে পারে সিনথিয়া তার জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ। ওকে দেখার পর থেকেই সব কেমন জানি এলোমেলো হয়ে গেল। কলজে মোচড় দেওয়া ব্যথায় আর কলেজে যেতে ইচ্ছা করে না। সিনথিয়ার নিরাপত্তায় বিনা বেতনে ওদের বাসার দারোয়ানের চাকরিতে নিজেকেই নিজে নিয়োগ দিয়ে দিলাম। ওর বাসার বারান্দাটা যেন সূর্য আর আমি সেই সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা পৃথিবী।  

সূর্যের ভালোবাসা কী আর কত প্রকার তা পৃথিবীর চেয়ে ভালো কে জানে? সূর্যের আকর্ষণে পৃথিবী এমনি কি আর চারপাশ জুড়ে ফিল্ডিং মারে? 

সিনথিয়ার ভালোবাসায় গলে গলে পড়তে কী যে সুখ। মেয়েটা বাসা থেকে বের হওয়ার সময় কেন জানি চুল বাঁধতে ভুলে যায়। খোলা চুলের পূর্ণ সুযোগ নেয় বখাটে বাতাস। সে এক দেখার মতো দৃশ্য। অবাধ্য চুলগুলোকে নিয়ে যখন বখাটে বাতাস খেলতে শুরু করে দেয়, রাস্তার উল্টো পাশের টং দোকানে অবস্থানরত ছেলেপেলেগুলো তখন চায়ের কাপে চুমুক দিতে ভুলে যায়। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে অপেক্ষা করে পরের দৃশ্যের। টেনশনে কেউ কেউ আবার সিগারেট ধরায়। সবার টেনশন সমাপ্ত করতে কেন যেন একটু বেশিই সময় নেয় সিনথিয়া। তারপর কব্জিতে থাকা চুলের ব্যান্ড দিয়ে অবাধ্য খোলা চুলগুলোকে সবার সামনে পোষ মানিয়ে রিকশা ডাকে। বেহায়া রিকশাওয়ালাগুলোও যেন কেমন। সিনথিয়াকে রিকশার প্যাসেঞ্জার করাতে কারোরই না নেই। ভাড়া নিয়ে দরাদরি তো দূরের কথা, পারলে মাগনা নিয়ে যায়। এমনি এক রিকশায় সিনথিয়ার পাশে আমি—চোখ বন্ধ করে এসব ভাবতে কী যে ভালো লাগে। 

কিন্তু বেরসিক সুমন এসব বুঝলে তো। কোত্থেকে এসে সুখ-স্বপ্নে বুনতে থাকা তাসের ঘর ভেঙে টেনে নিয়ে যায় বন্ধুদের তাসের ঘরে। টুয়েন্টি নাইন খেলার দুর্ধর্ষ পার্টনার সুমন একটার পর একটা চোরা ইঙ্গিত দিয়ে যায় আর আমি ক্রমাগত সে ইঙ্গিত মিস করে যেতে থাকি। সুমনের চোট্টামি ইঙ্গিত দেখার সময় কই? হরতন, রুইতন, চিরতন আর ইস্কাপনের বিবির মুখে তখন যে দেখি সিনথিয়ার মুখ। 

অবস্থা দেখে সুমন বিজ্ঞের মতো জিজ্ঞাসা করে, ‘সত্যি কথা বল তো, ডালের মধ্যে কালা কালা কী ভাসে রে?’ জিগার দোস্তের কাছে মিথ্যে বলা যায় না। ডালের সেই কুচ কুচ কালা রহস্য সিসিম ফাঁক করে বললাম, ‘সিনথিয়াকে আমার চাই দোস্ত।’ সব শুনে সুমন বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়ায়, ‘আরে এটা কোনো ব্যাপার হলো? শোন, তুই এক কাজ কর। রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের বই ঘেঁটে সুন্দর করে একটা চিঠি লেখ। নাম-ঠিকানা দিবি না কিন্তু।’ নাম-ঠিকানা লিখব না কেন জিজ্ঞাসা করায় সুমন খেঁকিয়ে ওঠে, ‘আরে গাধা, অ্যাক্সিডেন্টের কোনো মা-বাপ আছে? এই চিঠি ওর মা-বাবার কাছে ধরা খেলে জামিন পাবি?’ ভেবে দেখলাম, আসলেই তো। এই না হলে জিগার দোস্ত? কতই না ভাবে আমার নিরাপত্তা নিয়ে। সুমন বলে চলে, ‘খুব ভালো হয়, ছন্দ মিলিয়ে একটা কবিতা লিখতে পারলে। আজকাল কবিতাটা বেশ চলছে। তারপর দেখ কী করি!’

সুমন তার বন্ধুর জন্য ডাকপিয়ন হয়ে জান কুরবান করে সিনথিয়ার হাতে চিঠি তুলে দিচ্ছে এই দিবাস্বপ্ন দেখতে দেখতে ঠিক করলাম, শুভস্য শীঘ্রম। একটু দেরি করে ফেলার জন্য রাবণ হারিয়েছিল স্বর্গের সিঁড়ি, আমি কি হারাব স্বর্গের পরী? কাভি নেহি।

সারারাত জেগে কবিতা প্রসব করার চেষ্টা করলাম। এই জিনিস প্রসব করায় যে এত প্রসব বেদনা তা কে জানত! একটা বিশ নম্বর রেজিস্টার খাতার প্রায় পুরোটা কাটা-ছেঁড়ার পর রাতে যে জিনিস প্রসব হলো, তা দেখে গর্বের হাসি হেসে বালিশে মাথা ছোঁয়ালাম।

‘ও মোর সিনথিয়া-

তোমার জন্য ধুকপুক হিয়া।

তুমি কি আমায় করবা বিয়া?

ছুরি মেরো না, পেছন দিয়া।’

 

এ কবিতা পড়ে সিনথিয়া নিশ্চয়ই অবাক হয়ে ভাববে, কবি মাত্র চার লাইনে ছন্দ মিলিয়ে পুরো ঘটনার গন্ধ কী নিপুণভাবেই না ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে!

পরদিন সকালে মহত্ উদ্দেশ্যে আমি আর সুমন রাস্তার মোড়ে দাঁড়ালাম। বুক পকেটে রাখা চিঠি আর হেলান দিয়ে দাঁড়ানো বিদ্যুতের খুঁটির দিব্যি কেটে বলছি, ঘুণাক্ষরেও যদি সেদিন বেইমানির কথা টের পেতাম, সুমনকে সঙ্গে আনার কথা মাথায়ই আনতাম না।  

অপেক্ষার চরম ধৈর্য পরীক্ষার পর সিনথিয়াকে বাসা থেকে বের হয়ে আসতে দেখে সুমনের হাতে চিঠিটা তুলে দিয়ে বললাম, ‘যা দোস্ত, ওর হাতে দিয়ে আয়।’ সুমন ঠিক তাই-ই করেছিল।

চিঠিতে কাজ হয়েছিল। চিঠি পড়ে মুগ্ধ সিনথিয়া তারপর থেকে আর একা না। হাত ধরে হাঁটে। তবে সে হাত আমার না, সুমনের। সুমন তার প্রিয় বন্ধুকে বাঁচাতে চিঠির আসল প্রেরকের নাম কখনোই ফাঁস করেনি যে।