আবু হেনা মোস্তফা কামাল
১-৪-৯৫
১৬-৭-৮৮
শনিবার
কিছুতেই বিশ্বাস হয় না-যে আমার মৃত্যু আসন্ন। এখন শুধু সময়ের ব্যাপার। আজ মধ্যরাতেই কাউকে না-জানিয়ে চলে যেতে পারি। আবার থেকেও যেতে পারি বেশ কিছু দিন। কিন্তু কত দিন? তা কেউ বলতে পারেন না। এরকম অনিশ্চয়তার ভেতরে বেঁচে থাকা যায়! যেন অস্থায়ী চাকুরি। পুনরাদেশ না-দেয়া পর্যন্ত নিয়োগ করা হলো। যদি জানতাম আরো ছ’মাস আছি, সেভাবেই কাজ-কর্ম অগ্রাধিকার অনুযায়ী গুছিয়ে-টুছিয়ে নিতাম। আগে তো ওসব হিসেব-নিকেশ করিনি। এখন দেখছি আমি একটা আপাদমস্তক ব্যর্থ মানুষ। নিজের জন্যে বা অপরের জন্যে কুটো ভেঙে দুটো করিনি। পরীক্ষার হলে শেষ ঘণ্টা বাজার পনেরো মিনিট আগে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখছি আমার খাতা সবটাই সাদা।
আজকে যদিও দিন ছিল পরিষ্কার, বৃষ্টি একটুও হয়নি তবু এমন রোদে-ভেসে-যাওয়া দুপুরেও আমার একেবারে ভালো লাগেনি। হাসপাতাল থেকে ফিরে এসে অবধি বুঝেছি, সংসারে আমি এখন অতিথি মাত্র। কোথায় একটা বাঁধন ছিল, সবাই জানি সেটা খুলে গেছে, অথচ কেউ আমাকে বলবে না। গত দু’সপ্তাহ ধরে অফিস করছি, অন্তত অর্ধেকটা দিন কাজের ভেতরে থাকি, তখন কিছু মনে পড়ে না। বাসায় ফিরলেই অন্য রকম লাগে কেন?
ডাক্তার বলেছেন আরো একমাস পরে আমাকে স্বাভাবিক জীবন-যাপনের, মানে দুই বেলা বাইরে চলাফেরার অনুমতি দেবেন। আরো তিরিশ দিন। ততোদিন আমি বাঁচব, তার নিশ্চয়তা কিন্তু নেই। অফিস থেকে ফিরে যাওয়ার পরে দুই চোখ ঘুমে জড়িয়ে যায়। কোনোদিন ঘুম ভেঙে দেখি বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আকাশ মাতাল হয়ে আছে বৃষ্টিতে। কোনোদিন অন্ধকার ঝাঁপিয়ে পড়ার আগেই জেগে উঠি। অতঃপর শুরু হয় রুটিন ধরে পথ্য আর অষুধ খাওয়া। অনেক প্রিয় খাবারই এখন নিষিদ্ধ। চিকেন সুপের মতো নিষ্পাপ পানীয় রোজ খেতে হয়। যে কোনো দুটি পথ্য খাবার মধ্যবর্তী সময়ে আমার কাছে কেউ আসে না। তখন আমি শুয়ে রাজ্যের ভালো-মন্দ বই, যা হাতের কাছে পাই, গোগ্রাসে গিলি। প্রথম প্রথম শুধু ভিডিও ক্যাসেটে ছবি দেখতাম। উহ্! যাবতীয় অবাস্তবতার ককটেল ঐসব ছবি দেখতে দেখতে প্রায় কল্পলোকের মানুষ হয়ে গেছিলাম। তবু স্বীকার করতেই হয় ভিসিআরটি না-পেলে তখন জীবন আমার জন্যে দুর্বহ হয়ে উঠত। কিছুই লেখার অথবা পড়ার মানসিক সামর্থ্য তখন আমার ছিল না, ক্ষতি হবে। আমার প্রাক্তন ছাত্রী আনোয়ারা শিক্ষকের অবস্থা বুঝেই তার ভিসিআরটি রেখে গেল। বলতে গেলে প্রায় জোর করেই একমাস পরে সেটি তাকে ফিরিয়ে দেয়া হলো। (অংশ)
সূত্র :আবু হেনা মোস্তফা কামাল স্মারকগ্রন্থ
(বাংলা একাডেমি, ১৯৯১)
