সাই ইংওয়েন জেগে উঠছেন ধ্বংসস্তূপ থেকে

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:১১

এম এ আলআমিন

 

তাইওয়ানের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট সাই ইংওয়েনের জন্য বছরের শুরুটা ছিল বেশ অনিশ্চয়তাপূর্ণ। ২ জানুয়ারি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তাইওয়ানকে মূলভূখন্ডের সঙ্গে একীভূত হওয়ার আহ্বান জানান। তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জিনপিংয়ের আহ্বান উড়িয়ে দেন সাই। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, বেইজিংয়ের শর্ত মেনে তাইওয়ান কোনোদিনই চীনের সঙ্গে অঙ্গীভূত হবে না। এর ফলে এ ধারণা তৈরি হয় যে, সাই সম্ভবত বর্তমান মেয়াদের পর আর প্রেসিডেন্ট থাকবেন না।

তাইওয়ানের রাজনীতিতে চীনপন্থি অথবা স্বাধীনতাপন্থি দুটি ধারার জোরালো উপস্থিতি লক্ষণীয়। সাইয়ের নেতৃত্বাধীন ডেমোক্র্যাটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি (ডিপিটি) স্বাধীনতাপন্থি হিসেবে পরিচিত। দলটি দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আছে।

চীন ১৯৭৯ সালে তাইওয়ানকে একত্রিত হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। ৪০ বছর পূর্তিতে একই আহ্বানের পুনরাবৃত্তি করেন শি জিনপিং। এ সময়ের মধ্যে কোনো চীনা নেতাই বিষয়টি নিয়ে এভাবে সরব হননি। সাই জবাবে বলেন, ‘তাইওয়ান ‘এক দেশ, দুই সরকার’ নীতি কখনোই মানবে না। এক দেশ দুই সরকার নীতিতে স্বশাসনের ক্ষমতা তাইওয়ানের হাতেই দেয়ার কথা, যেমনটা হংকংয়ের ক্ষেত্রে রয়েছে। আমাদের দুই কোটি ৩০ লাখ মানুষ স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র নিয়ে যা ভাবে তার প্রতি সম্মান দেখান। দুই পক্ষের মধ্যে যে ভিন্নতা, সেটি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের দৃষ্টিতে দেখুন।’ সাই ২০১৬ সালের মে মাসে ডিপিপি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে জেতেন। তিনি কুয়োমিংটাঙ্গ (কেএমটি) প্রার্থী এরিক চুকে পরাজিত করেন। গত ৭০ বছরে বেশিরভাগ সময় কেএমটি ক্ষমতায় ছিল এবং এ সময় চীনের সঙ্গে তাইওয়ানের সম্পর্ক উন্নতি ঘটে। চীন তাইওয়ানকে সব সময় নিজের প্রদেশ হিসেবে বিবেচনা করে। এ কারণে চীন প্রায়ই তাইওয়ানের পুনর্নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয়ার জন্য হুমকি দিয়ে আসছে।

এ বছর জুনে হংকংয়ে চীন বিরোধী আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। হংকং পরিস্থিতি এখনো উত্তপ্ত অবস্থায়। হংকংয়ে আন্দোলন শুরুর আগে তাইওয়ানে সাইয়ের জনপ্রিয়তা পড়তির দিকে ছিল। হংকং বিক্ষোভ সাইকে রাজনীতির মাঠে আবার ফিরিয়ে এনেছে। বিক্ষোভটি যদিও একটি খসড়া আইন বাতিলের দাবিতে শুরু হয়েছিল কিন্তু লক্ষ্য ছিল মূলত চীনা আধিপত্যের বিরুদ্ধে। বিষয়টি সাইয়ের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে মিলে যায়। তাই হংকংয়ে বিক্ষোভ তাকে রাজনীতির মাঠে নতুন করে উজ্জীবিত করেছে। জানুয়ারিতে তাইওয়ানে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। হংকং পরিস্থিতির দিকে তাইওয়ানবাসী উদ্বেগের সঙ্গে নজর রাখছে। হংকং এবং তাইওয়ানের মর্যাদাগত পার্থক্যের বিষয়টি লক্ষণীয়। হংকং ‘একদেশ দুই ব্যবস্থার’ আওতায় চীনের অংশ, বিশেষ স্বায়ত্তশাসনপ্রাপ্ত কিন্তু চীনের অংশ। অন্যদিকে তাইওয়ান একটি স্বাধীন দেশ। তাইওয়ানের কাছে চীনের প্রত্যাশা দ্বীপ দেশটি চীনের সঙ্গে একীভূত হওয়ার পর একেও হংকংয়ের মতো ‘একদেশ দুই ব্যবস্থার’ সুযোগ দেওয়া হবে। যার অর্থ সর্বোচ্চ মাত্রায় স্বায়ত্তশাসন ভোগ করা। শির ২ জানুয়ারি দেওয়া ভাষণের মূল সারমর্ম সেটাই ছিল।

শি যখন ভাষণটি দেন তখনও হংকংয়ে বিক্ষোভ শুরু হয়নি। এখন সেখানে গণতন্ত্রপন্থিদের আন্দোলন দুই মাসের ওপর গড়িয়েছে। ‘একদেশ দুই ব্যবস্থার’ ধারণাটি বেইজিং যতই গুরুত্ব দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করুক না কেন দুই মাসের গণআন্দোলনে ধারণাটি পুরোপুরি জৌলুস হারিয়েছে। হংকং আন্দোলন সাইয়ের চীনের সঙ্গে কখনো একীভূত না হওয়ার দাবির প্রতি জনসমর্থন জোরদার করেছে। যারা এক সময় চীনের সঙ্গে তাইওয়ানের সুসম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর জোর দিতেন এরকম অনেক ভোটার এখন আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সাইকে ভোট দেবেন বলে মনস্থির করেছেন। তাইওয়ানে ‘৯২ মতৈক্য’ নামে একটি ধারণা চালু আছে। যার মাধ্যমে চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার বিষয়টিকে প্রাধান্য দেয়া হয়। তাইওয়ানের অনেকে এখন ভয় পাচ্ছে যে, কোনো রাজনৈতিক দল ‘৯২ মতৈক্য’ পুনঃপ্রবর্তন করলে হংকংয়ের মতো অবস্থা তৈরি হতে পারে।