সৌদি তেল স্থাপনায় হামলা

পরীক্ষার মুখে যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষা প্রতিশ্রুতি

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:১১

তালেব রানা

 

সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর দুটি স্থাপনায় গত ১৪ সেপ্টেম্বর হামলা হয়েছে। ঐ হামলায় আবাকাইক শহরে আরামকোর বৃহত্তম তেল শোধনাগার প্রকল্পে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। একই সময়ে খুরাইস তেলক্ষেত্রেও হামলায় আগুন ধরে যায়। হামলার পর সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল উত্পাদন দৈনিক ৫৭০ লাখ ব্যারেল হ্রাস পেয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বৃদ্ধি পেয়েছে তেলের দামও।

ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। ২০১৫ সালের মার্চ থেকে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত সামরিক জোট। এরপর থেকে বিভিন্ন সময় সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা করেছে হুথিরা। তবে সর্বশেষ তেল স্থাপনায় হামলার পর সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র  ইরানকে দায়ী করেছে। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পরীক্ষা করে তারা এই প্রমাণ পেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্যাটেলাইট ছবি প্রকাশ করে হামলার নেপথ্যে ইরান জড়িত রয়েছে দাবি করা হয়েছে। সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল-যুবায়ের বলেছেন, হামলার জন্য যেসব অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো ইরানের। এই হামলার পূর্ণ তদন্ত প্রতিবেদন শিগগিরই প্রকাশ করা হবে। তিনি বলেছেন, সৌদি আরব মিত্র দেশগুলোর সাথে যোগাযোগ রাখছে এবং পূর্ণ তদন্ত শেষ করার পর তারা যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।

সৌদি আরবের বড়ো মিত্র যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, তারা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে চায় না। তবে যেকোনো পরিস্থিতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সৌদি আরবে বাড়তি সেনা পাঠানোর ঘোষণা     দেওয়া হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের ওপর বিশেষ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সামনে সব পথই খোলা রয়েছে।

এর প্রেক্ষিতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভাদ জারিফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা সৌদি আরব সামরিক হামলা চালালে ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ’ শুরু হবে। বৃহস্পতিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা যুদ্ধ চাই না। কিন্তু নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষার ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র ছাড় দেব না। ইরানের একজন সামরিক কমান্ডার বলেছেন, যে কোনো ধরনের আগ্রাসন ধ্বংস করার জন্য ইরান প্রস্তুত আছে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, সীমিত হামলা হলে সেটি আর সীমিত আকারে থাকবে না। তাদের সম্পূর্ণ ধ্বংস না করা পর্যন্ত আমরা চালিয়ে যাব।

এই হামলার পর সৌদি আরব তার মিত্রদের বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত একটি বিষয় স্পস্ট হয়েছে যে, নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেবে না যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও বলেছেন, তারা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তিপূর্ণ সমাধান চান। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অবস্থানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে মিত্রদের রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের যে ‘গ্যারান্টি’ রয়েছে তা পরীক্ষার  মুখে পড়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, ১৯৯০ সালে কুয়েতে আগ্রাসনের পর থেকে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল সমৃদ্ধ রাজতন্ত্রগুলো মার্কিন সামরিক বাহিনীর সুরক্ষার প্রতিশ্রুতির ওপর ভরসা করে আসছে। ঐ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের আধা ডজন সামরিক ঘাঁটিও রয়েছে। কিন্তু প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের পর এই প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের সেই প্রতিশ্রুতি ভয়াবহ পরীক্ষার মুখে পড়েছে। সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত বলে জানিয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শক্ত কোনো পদক্ষেপ নেয়নি যা ঐ অঞ্চলে নতুন ‘টার্নিং পয়েন্ট’ এর ইঙ্গিত দেয়।

টেক্সাস এ এন্ড এম ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষক গ্রেগরি গউস বলেন, এটি খুবই গুরুতর। কুয়েতে ইরাকের আগ্রাসনের পর ঐ অঞ্চল থেকে অবাধে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। বর্তমান প্রেক্ষিতে ট্রাম্প প্রশাসন তাদের পদক্ষেপের ক্ষেত্রে বড়ো ধরনের পরিবর্তন না আনলে ঐ অঞ্চলের নেতারা নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করবে।

আরব দেশগুলোর শাসকরা অতীতে ঐ অঞ্চলে মার্কিন প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার জন্য সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে দোষারোপ করেছিল। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সুপরিচিত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আব্দুল খালেক আব্দুল্লার মতে, এখন মধ্যপ্রাচ্যের কিছু শাসকের মতে, ট্রাম্প ওবামার চেয়েও বড়ো ‘বিশ্বাসঘাতক’। কারণ ইরানের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নিতে ট্রাম্প ব্যর্থ হয়েছেন। এর ফলে আরবের মিত্রদের আস্থা নষ্ট করেছেন। এটা ট্রাম্প প্রশাসনের পূর্ণ ব্যর্থতা, যা পূর্ণ হতাশাজনক।

ব্রুকিং ইনস্টিটিউশনের ইরান বিশেষজ্ঞ সুজানে ম্যালোনে বলেন, ইরানিরা অতীতে ট্রাম্পের বিভিন্ন হুমকিতে উদ্বিগ্ন ছিল। কিন্তু তারা এখন দেখছে, ট্রাম্প তার কথা অনুসরণ করে না। যে কারণে তারা হামলার কথা অস্বীকার করলেও তাদের সফলতা গোপন করছে না। ওবামা প্রশাসনের পররাষ্ট্র দফতরের কর্মকর্তা জেরেমি শাপিরোর মতে, ট্রাম্প হলেন কড়া হুমকি আর দুর্বল পদক্ষেপের মিশ্রণ। এ দুটি বৈশিষ্ট্য বিশ্বের জন্য খারাপ। বর্তমান উত্তেজনা সামাল দিতে ট্রাম্প প্রশাসনকে নির্বোধের মতো হয় আরেকটা উত্তেজনায় জড়াতে হবে, নয়তো অবমাননাকর নতি স্বীকার করতে হবে।