ইংরেজিতে ‘আইডেনটিটি ক্রাইসিস’ বলিয়া একটি বহুল প্রচলিত শব্দযুগল রহিয়াছে—যাহা সভ্য দুনিয়ায় ব্যক্তিবিশেষের অস্তিত্বের সংকট হিসাবেও বিবেচনা করা হয়। অস্তিত্ব-সংকটের বিষয়টি নানান দৃষ্টিকোণ হইতে দেখা যাইতে পারে। প্রথম কথা হইল, মানুষ তাহার অস্তিত্বের বিষয়টি নিশ্চিত হইতে চাহে। অর্থাত্ পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রের তাহার অস্তিত্বের কোনো গুরুত্ব রহিয়াছে কি না, তাহার অবস্থান বা অনবস্থানে কোনো কিছুর উনিশ-বিশ পরিবর্তন ঘটায় কি না—এইসকল বিষয় মানুষ বুঝিয়া লইতে চাহে। বিশেষ করিয়া চিন্তাশীল ব্যক্তিমানসে জাগিয়া উঠে এইরূপ কত ধরনের জিজ্ঞাসা। দার্শনিক দিক হইতেও অস্তিত্বের বিষয়টি যথেষ্ট ধাঁধালো। অতটা জটিলে না গিয়া আমরা সহজভাবে বুঝিয়া দেখিতে চাহি যে, ‘আমি’ আছি, ‘আমার’ সামান্য একটুখানি হইলেও গুরুত্ব রহিয়াছে। অর্থাত্ আমি ‘অপদার্থ’ নই, পদার্থ—যাহা জায়গা দখল করে এবং যাহার ভর রহিয়াছে।
ব্যুত্পত্তিগত দিক হইতে ‘আইডেনটিটি’ শব্দটির গভীরে যাওয়া যাইতে পারে। ইংরেজি ‘আইডেন্টিটি’ শব্দটির উেস রহিয়াছে প্রাচীন লাতিন শব্দ ‘আইডেম’। সেই আদি শব্দের অর্থ, ইংরেজি ভাষায়, ‘সেম’। বঙ্গানুবাদে করিলে ইহা বলা যায়—‘সদৃশ’। ভাবনাকে কিঞ্চিত্ গভীরতর দিকে চালনা করিয়া এই কথা ভাবাই যায় যে, ‘আইডেন্টিটি’ শব্দের উত্সমূলে যদি সাদৃশ্যের ভাবনা থাকে, তাহা হইলে এই শব্দের আধুনিক ব্যবহারের ভিতরে নিহিত রহিয়াছে অন্য একটি অর্থের ব্যঞ্জনা। সেই ব্যঞ্জনার্থটি এই যে, ব্যক্তির ‘আইডেন্টিটি’ নির্ণয় করা যাইবে তখনই, যখন সেই ‘আইডেন্টিটি’ অন্য কাহারো ‘সত্তা’ হইতে সেই ব্যক্তিটিকে পৃথক করে। অর্থাত্, সদৃশ নয়, বরং কোন কোন দিকে তিনি নিজস্ব, স্পষ্ট করিয়া বলিলে বলা চলে ‘বিসদৃশ’, তাহাই বুঝাইয়া দেওয়ার দায়িত্ব ‘আইডেন্টিটি’র। একইভাবে যেইসকল পরিচয়পত্র সেই ‘আইডেন্টিটি’র, অর্থাত্ নিজস্ব সত্তার স্মারক হিসাবে ব্যবহূত হয়, তাহাও ব্যঞ্জনাময়। আইডেন্টিটি এই কারণে এত গুরুত্বপূর্ণ বলিয়া মনে করা হয়। ইহার পরিমাপও সমাজের নিচুস্তর হইতে শুরু করিয়া উঁচুস্তরে ভিন্ন ভিন্ন হয়, এবং সেই চিত্রটিও প্রকাশ করে ব্যক্তিবিশেষের ‘আইডেন্টিটি’।
সামাজিক মাধ্যম অধুনা যোগাযোগের তো বটেই, ব্যক্তির ভাবনা প্রকাশেরও একটি অতি তাত্পর্যপূর্ণ মঞ্চ। সেই ডিজিটাল মাধ্যমেও অতি সূক্ষ্ম বাইনারির হিসাবনিকাশে তৈরি হয় আরেক ধরনের ‘আইডেন্টিটি’। আর সেইখানে নানা সংকটে তৈরি হয় ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’ও। বিশেষ করিয়া আধুনিক যুগ অতি বেগের সহিত কাড়িয়া লইয়াছে আবেগও। অস্তিত্বের সংকটের নূতন নূতন রূপ এখনো বেশিরভাগ মানুষের নিকট অজ্ঞাত। সেই কারণে ‘দাও ফিরে সেই অরণ্যের’ আকুতির মতো নিস্তরঙ্গ নিরিবিলি জীবন ক্রমশ সোনার হরিণ হইয়া উঠিতেছে। ইহাও এক ধরনের অস্তিত্বের সংকট।
