অতএব দৌড়াও

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:১৩

চিররঞ্জন সরকার

এই যে দেশে এত এত চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, ক্যাসিনো, জুয়া, পারসেন্টেজ দাবি—এসবের কারণ কী? কিচ্ছু না, স্রেফ চটজলতি বড়োলোক হওয়ার দৌড়। এই দৌড়ে কেউ পিছিয়ে পড়তে রাজি নয়। তাই তো ক্ষমতাসীন এবং ক্ষমতাহীন সবাই চায় ফাস্ট হতে, যে কোনো মূল্যে দ্রুত বড়োলোক হতে। এজন্য সবাই রুদ্ধশ্বাসে ছুটে চলেছে।

উসাইন বোল্ট, কার্ল লুইস কিংবা বেন জনসনের দৌড় নয়, আসলে আমাদের জীবন কাটে অন্য এক দৌড়ের মধ্যে। এর নাম জীবনের দৌড়। এ দৌড়ে ক্লান্তিহীন আমরা লড়েই চলেছি। যদিও এর কোনো স্বীকৃতি নেই। আমরা সবাই কমবেশি দৌড়ে অভ্যস্ত। জন্মগ্রহণের পর প্রথম কয়েকটা বছর কোলে-দোলনায় ট্যাঁ ট্যাঁ। তারপর হাঁটি হাঁটি পা পা করে আরো কিছুদিন। তারপর শুধু দৌড় আর দৌড়। কবর কিংবা চিতায় না যাওয়া পর্যন্ত কিংবা প্যারালাইজড হয়ে চিত হয়ে বিছানায় না পড়া পর্যন্ত দৌড় চলতেই থাকে। সেদিক থেকে আমরা প্রত্যেকেই একেকজন ছোটোখাটো উসাইন বোল্ট।

যদি বলি ধনী হওয়ার, বড়োলোকের হওয়ার দৌড়ে অংশগ্রহণের জন্য মানুষের জন্ম হয়েছে—তাহলে ভুল বলা হবে না। পা-হীন ব্যক্তিও গড়িয়ে গড়িয়ে অথবা কৃত্রিম কাঠের পা-লাগানো ব্যক্তিও লাফিয়ে লাফিয়ে দৌড়ায়। মানুষ নানা কারণে দৌড়ায়। কুকুর বা ষাঁড়ের তাড়া খেয়ে, ডাকাতের ভয়ে, উত্তেজিত জনতার ধাওয়া খেয়ে, প্রতিপক্ষের তাণ্ডবে ভীত হয়ে, পুলিশের প্যাঁদানি এড়াতে কিংবা নিদেনপক্ষে আপন স্ত্রীর রুদ্রমূর্তি দেখে কিংবা স্বামীর অসুর আচরণের মুখে দৌড়ায়। জীবনে একবারও দৌড়ায়নি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ছোটোকালে যখন স্কুলে স্বাস্থ্যবিভাগের লোকজন সাদা অ্যাপ্রোন পরে টিকা দিতে আসত তখন আমরা সেই টিকা-বিভীষিকা থেকে রেহাই পেতে দল বেঁধে মাইলের পর মাইল দৌড়ে গিয়ে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতাম। সেই দৌড়ের স্মৃতি আজও অম্লান।

আগে এলাকায় এলাকায় স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, ঈদ ইত্যাদি বিশেষ দিবস উদ্যাপন উপলক্ষ্যে নানা রকম প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হতো। এর মধ্যে একটা ‘অনিবার্য’ আইটেম ছিল দৌড় প্রতিযোগিতা। সেসব প্রতিযোগিতায় আমরা অনেকেই অংশগ্রহণ করেছি। সেসব প্রতিযোগিতার মর্মবাণী ছিল—বিজয়ী হওয়া নয়, প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করাটাই বড়ো কথা। সেই মর্মবাণী আমাদের জীবন চলার পথে পাথেয় হয়ে রয়েছে। আমরা জীবনের নানা ইভেন্টে অংশগ্রহণ করেছি, এখনো করছি। সাফল্য খুব একটা আসেনি। তাতে কী? অংশগ্রহণই যে বড়ো কথা!

ছোটোকালে উলটো দৌড় বলে এক রকম দৌড় প্রতিযোগিতা ছিল। সেখানে উলটো দিকে দৌড়ানো হতো; ব্যাপারটা খুবই আমোদজনক (একই সঙ্গে বেশ প্রতীকীও। আমাদের দেশের একশ্রেণির আমলা ও রাজনীতিক সব সময় এই প্রতিযোগিতায় অগ্রগামী। দেশটাকে উলটোদিকে পৌঁছে দিতে তাদের জুড়ি নেই)। এ দৌড়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চিতপটাং হয়ে পড়ে যেত প্রতিযোগীরা। অনেক সময় পুরস্কার দেবার মতোও কাউকে পাওয়া যেত না। এর জন্য উদ্যোক্তারা এ প্রতিযোগিতাটাকেই গুরুত্ব দিতেন বেশি।

আমরা যারা জীবনের মধ্যগগনে বা পড়ন্ত বেলায় অবস্থান করছি, তারা অনেকেই এক অদ্ভুত অবস্থার মধ্যে রয়েছি। যেন বুনো ষাঁড় বা পাগলা কুকুর তাড়া করছে। সবাই দিগিবদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটছি। শুধুই ছুটছি। এ ছুটে চলা সাধারণ অর্জনের জন্য। অসাধারণের জন্যও। ছাত্রলীগ, যুবলীগ, পদ, পদবি, শিক্ষা, চাকরি, প্রতিষ্ঠা—সবকিছুর জন্য দৌড়। প্রবল বেগে ছুটে চলা। সাধারণ শিক্ষায় আস্থা নেই, দ্রুত ভালো শিক্ষার জন্য তাই ইংরেজি মিডিয়াম। কষ্ট করে পরিশ্রম করে বড়োলোক হবার ইচ্ছা নেই, তাই ডাকাতি, চাঁদাবাজি, জুয়া, ক্যাসিনো, লুটপাট করে দুই-নম্বরী পথে রাতারাতি বড়োলোক হবার ইচ্ছা। বাবা-মা কবে বিয়ে দেয় সেই ভরসায় বসে না থেকে সময়ের আগেই ‘ওঠ ছুড়ি তোর বিয়ে’ বলে হুট করে কারোর সঙ্গে সেঁটে যাওয়া। এভাবে ঘণ্টায় ১০০, ২০০, ৩০০ কিলোমিটার বেগে বেড়ে যাচ্ছে জীবনযাপনের গতি। এটা গতি, অগ্রগতি, প্রগতি নাকি অধোগতি, সেটা আল্লাহ মালুম!

এই গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমাদের সমাজটা দ্রুত বদলাচ্ছে। দিন যত যাচ্ছে তত পরিবর্তনের গতি বাড়ছে। আর পরিবর্তনের নিয়মে তার ছন্দও বদলাচ্ছে। বদলাচ্ছে নিয়মকানুন-মূল্যবোধ-সংস্কৃতি—সবকিছু। মহাভারতের উপদেশমূলক গল্পের নির্যাস : ‘যে বসে থাকে তার ভাগ্যও বসে থাকে, যে শুয়ে পড়ে তার ভাগ্যও শুয়ে পড়ে, যে এগিয়ে চলে তার ভাগ্যও এগিয়ে চলে।’ অতএব এগিয়ে চলো! দৌড়াও।

এই দৌড়ের উন্মাদনায় আমাদের আর হুঁশ নেই। জীবন পালটে গেছে। জীবিকা বদলে গেছে। লেখাপড়া হচ্ছে এখন বোগাস! ছাত্ররাজনীতি হয়েছে পেশা। স্রেফ টাকা বানানোর টাকা কামানোর ধান্দা। অধ্যয়ন নয়—হল দখল, পাহারা, চাঁদা-টেন্ডার ভাগবাঁটোয়ারা; হাতে বই নয়—মোবাইল, অটোম্যাটিক অস্ত্র, গাড়ির হুইল; পুষ্টিকর খাদ্য নয়—হুইস্কি-মদ-গাঁজা-ইয়াবাই পরম পুষ্টি। শিক্ষকরাও এখন ‘রং-বাজ’। লাল-নীল-সাদা দলে বিভক্ত। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় সবই আছে; নেই ক্লাস, প্রকৃত জ্ঞানচর্চা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনুশীলন। আছে বক্তৃতা স্লোগান, উত্তেজনা। দলাদলি আর দালালি। সমুদ্রের চরের মতো অল্প কিছু ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে। আমলা-মন্ত্রী-ব্যবসায়ীদের সন্তানরা সেখানে লেখাপড়া করে। তারপর সোজা বিদেশে। এরা উপরে উঠবে হুহু করে। আলাদা সমাজ তৈরি হবে। এরা কন্ট্রোল করবে আর্থনীতি। তৈরি করবে রাজনীতি-কৃষ্টি-কালচার। যে কালচার বিজ্ঞাপন হয়ে উঠবে টিভি পর্দায়, জনপ্রিয় ঔপন্যাসিকের কলামে।

এখন চটজলদির যুগ। সিঁড়ি নয় লিফ্ট। লন্ড্রির বাইরে আজকাল লেখা থাকে—এক ঘণ্টায় আড়ং ধোলাই ও ডেলিভারি। সমস্ত অফিস কম্পিউটারাইজ। মিনিটে চেক ক্লিয়ার। ম্যারেজ রেজিস্ট্রির অফিসে পাঁচ মিনিটে বিয়ে। সাত মাসেই সিজারিয়ান বেবি। এক মিনিটে কালার ফটো। ইনস্ট্যান্ড কফি, ফাস্ট ফুড। হিট অ্যান্ড রান। ধরো আর মারোর যুগ। ঝোপেঝাড়ে আবডালে এখন আর অভিসারে যেতে হয় না। রিকশাতেই দ্রুত ‘শরীরচর্চা’ পর্যন্ত চালিয়ে নেওয়া হয়। এখন গাইড বইয়ের নাম দেওয়া হয়—‘টাচ অ্যান্ড পাশ’। সবাই এখন ‘মেড-ইজি’ খোঁজে। সবকিছু যত দ্রুত সম্ভব শেখা-বোঝা-গেলা যায় ততই মঙ্গল।

আমাদের চারদিকে শুধু মানুষ আর মানুষ। সবাই ছুটছে, সবাই ফাস্ট হতে চায়। শুধু চলা, ছুটে চলা। এখনকার সিনেমা বড়োজোর দেড় ঘণ্টার। এক-দুই মিনিটের ভিডিও ক্লিপিংস জনপ্রিয় হচ্ছে। টেস্ট ক্রিকেটে মানুষের আগ্রহ কম। ওয়ানডেও এখন দর্শক টানতে পারে না। টি-টোয়েন্টিতে দর্শকের উপচে পড়া ভিড়।

দৌড়, দৌড় এবং দৌড় দিয়ে আমাদের যে জীবন সাজানো হয়েছে সেখানে রয়েছে-মোবাইল-ইন্টারনেট, থ্রিজি, বিজ্ঞাপন-মিডিয়া-কম্পিউটার-স্যাটেলাইট ইত্যাদি। এ যেন শহুরে মেয়ের রূপ। বাইরে বর্ণের বাহার আছে, কিন্তু ভেতরে সৌন্দর্যের প্রলেপ নেই। মেকআপটুকু বাদ দিলে রক্তশূন্য ‘বাইলা’ মাছ। এ রূপের তেজ নেই, মমতা নেই, লাবণ্য নেই, ‘উসকানি’টুকু ছাড়া।

এই ‘ভারচুয়াল’ ছায়াজীবনে আমরা সেকেলেরাও দৌড়ের মধ্য দিয়েই চলছি। অথচ জায়গামতো পৌঁছতে পারছি না। আরো জোরে আরো জোরে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে পেছনের জনের ল্যাং খেয়ে ধরাশায়ী হতে হচ্ছে। তখন মওকা খুঁজছি আমার সামনের জনকে ল্যাং মারার!

সমৃদ্ধি, অর্থ, খ্যাতি, যশ, ক্ষমতা, রূপসি স্ত্রী, নধর সন্তান সবকিছুর জন্য রুদ্ধশ্বাসে আমরা দৌড়ে চলছি। যেন এ দৌড়ের শুরু আছে, শেষ নেই। জীবনের এ পর্বে এসে ক্লান্ত অবসন্ন শরীরে বলতে ইচ্ছে করে—

‘যাহা চাই তাহা পাই না, যা পাই/ হারাই কপাল দোষে।/ মুঠো করে যত চেপে ধরি এই/ জীবনটাকে,/ পথের ধুলায় ছিটাইয়ে যায়/ হাতের ফাঁকে।/ চাই ধন জন স্বাস্থ্য শান্তি,/ অভাবে পাই—/ রুগ্ণ পত্নী, মূর্খ পুত্র/ গোঁয়ার ভাই’ (যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত)!

n লেখক :রম্যরচয়িতা