চিত্তবিনোদন হোক সুস্থ সংস্কৃতির

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:১৪

সাইফুল ইসলাম হাফিজ

মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যতগুলো মৌলিক চাহিদা রয়েছে তার মধ্যে চিত্তবিনোদন হলো অন্যতম। এই চিত্তবিনোদনের দ্বারা মানসিক প্রশান্তি লাভ কিংবা মনোরঞ্জন করা যায়। অন্যান্য চাহিদাগুলো মেটাতে মানুষকে ব্যস্ত থাকতে হয় মানসিক বা কায়িক শ্রমে। কিন্তু একজন মানুষ যতই উদ্যমী হোক না কেন সে কিন্তু সবসময় শ্রম দিতে পারে না। কারণ, তার দেহ ও মস্তিষ্ক কর্মের মধ্যে একটু বিরতি বা অবসর চায়। ঠিক এই বিরতির সময় একজন মানুষের দরকার বিনোদন। বিনোদন কিংবা আত্মতৃপ্তির জন্য কেউ গান শোনেন, কেউ খেলাধুলা করেন, কেউ গল্প, কবিতা উপন্যাসসহ বিভিন্ন ধরনের বই-পুস্তক পড়ে থাকেন। যাতে তার মস্তিষ্কের নিষ্ক্রিয়তা দূর হয় এবং দেহে একটা সতেজ ভাব আসে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই বিনোদনটা কী রকম হবে? হ্যাঁ, এই বিনোদনটা হতে হবে সামাজিক, অশ্লীলতামুক্ত এবং সুস্থ বা সভ্য সংস্কৃতির। আর এই বিনোদন যাদের মেধা, সৃজনশীলতায় এবং প্রতিভায় তৈরি হয় তাদেরও হতে হবে মুক্তমনা, সুরুচিপূর্ণ মনোমুগ্ধকর, সুন্দর সাহিত্যের কারিগর। খুব গৌরবের সঙ্গেই বলতে পারি যে, আমাদের এই বাংলা সাহিত্যে এমন অনেক মহাপুরুষের আগমন ঘটেছে, যাদের জন্য বাংলাভাষা, বাংলা সাহিত্য, কবিতা, গল্প, গান স্থান পেয়েছে বিশ্ব দরবারে। যাদের সৃজনশীল অবদানে সমৃদ্ধ হয়েছে বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডার। যারা সৃজন করেছেন বাংলা সাহিত্যের গৌরবময় ঐতিহ্য। এই গৌরবের যাত্রা এখনো চলমান। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো বর্তমানে কিছু গায়ক, লেখকের তথাকথিত সাহিত্যকর্ম চোখে পড়ছে। তারা গায়, লেখে ঠিকই কিন্তু ভালো ভাষায় নয়। তারা অশালীন, উদ্ভট, অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করে। বাংলাভাষার সঙ্গে কিছু ইংরেজি শব্দ মিশিয়ে তারা তাদের সৃজনশীল প্রতিভার জানান দিচ্ছে। হ্যাঁ, তাদের প্রতিভা, সৃজনশীল শক্তি আছে এটা মানতে হবে। কিন্তু সেই সৃজনশীলতায় রয়েছে অশ্লীল সৃজন। বর্তমানে বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হলো সোশ্যাল মিডিয়া। এই সোশ্যাল মিডিয়াকে তারা কাজে লাগিয়ে দিন দিন তারকা বনে যাচ্ছে। গানের জগতে একপ্রকার গানকে  র্যাপ গান বলা হয়। যা বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে খুব দ্রুত গতিতে গাওয়া হয়। যার অর্থ কিংবা ভাব বোঝা তো দূরের কথা মূল শব্দই বোঝা যায় না। এই গানের মধ্যে তারা অনেক মন্দ কথা (স্ল্যাঙ্গ ওয়ার্ড) ব্যবহার করে থাকে। সাধারণত, এই শ্রেণির শিল্পীরা পশ্চিমা ঢঙে সাজে, বাঙালি সংস্কৃতির কোনো ছাপ তাদের মধ্যে লক্ষ্য করা যায় না। সমাজের বিভিন্ন লোককে তারা গালিগালাজও করে থাকে। তারা বলে যে এর মাধ্যমে তারা নাকি অন্যায়ের প্রতিবাদও করে! একজনের কথা, কাজ আপনার পছন্দ না-ই হতে পারে, তবে তাকে দুই, তিনটি মন্দ, অশ্লীল কথা বললেই কি প্রতিবাদ হয়ে গেল? এদের সঙ্গে আরেক শ্রেণির মানুষের সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়, যারা কবিতা লেখে। তারাও প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বেছে নিয়েছে নোংরা, অশ্লীল ভাষা। কাউকে গালি দিলে, পশুর নাম ধরে ডাকলেই কি প্রতিবাদ হয়ে যায়? মুখের ভাষা খারাপ করে যেমন কারো কাছে প্রিয় হওয়া যায় না, তেমনি শুধু অশ্লীল ভাষায় কবিতা লিখলে, গান গাইলেও গায়ক বা কবি হওয়া যায় না। আমাদের বাংলা সাহিত্যের সাহিত্য সম্রাট, কবিগুরু, বিদ্রোহী কবি, কিশোর কবি তারাও তো প্রতিবাদমুখর লেখা লিখেছেন, গান গেয়েছেন। আমরা কি তাদের শিল্পকর্ম পড়ে প্রতিবাদের ভাষা শিখতে পারি না? আরেক শ্রেণির নব লেখকদের কথা তো বলতেই হবে। কিছু লেখক আছে, যারা গল্প লেখে মানুষকে বিনোদন দিতে। যেই গল্পে এত পরিমাণে অশ্লীল ও নোংরা শব্দ ব্যবহার করা হয়, যা ভাষায় প্রকাশ করা দুষ্কর। যা চটি গল্প নামে পরিচিত। অনলাইন দুনিয়ায় এখন এই অশালীন গল্পের ছড়াছড়ি। এই সব গল্প, মানুষকে বিনোদন তো দূরের কথা মানুষের সুস্থ মস্তিষ্ককে বিকৃত করে তোলে। স্মার্টফোন ব্যবহারকারী তরুণরা এই গল্প পড়ে আসক্ত হয়ে পড়ছে নানা ধরনের অশ্লীল কাজে। তাদের গল্পগুলো বাংলাভাষাকে নিম্ন থেকে নিম্নতর পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। মানুষকে বিনোদন দেওয়াই যদি তাদের লক্ষ্য হয় তবে তাদের সৃজনশীলতার অশ্লীল সৃজন না করে, তাদের কলম যদি ভালো পথে পরিচালনা করে এবং প্রতিভার, সৃজনশীলতার শ্লীল সৃজন করে তবে তাদের কাছ থেকেও মানুষ সুস্থ বিনোদন লাভ করতে পারে। তাহলে চিত্তবিনোদন হতে পারে সুস্থ সংস্কৃতির। মানুষের মস্তিষ্কও পেতে পারে সুন্দর চিত্তবিনোদনের সন্ধান। তাদের লেখাও তো হতে পারে তরুণদের চরিত্র গঠন করার হাতিয়ার। সঙ্গে তারাও হতে পারে সবার পছন্দের মানুষ।

n লেখক :শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়