সোহেল দ্বিরেফ
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যে সকল দেশ খুব ঝুঁকির তালিকায় আছে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাংলাদেশ প্রাথমিকভাবে এটার প্রভাব কমানোর জন্যে চেষ্টা করলেও আশানুরূপ তেমন সাফল্যের দেখা এখনো পায়নি। তবে চেষ্টার ধারাবাহিকতা বজায় রাখলে এবং যথোপযুক্ত কিছু কৌশলী পদক্ষেপ গ্রহণ করলে দেশটি নিশ্চিত বড়ো এক ক্ষতির মুখ থেকে রক্ষা পেতে পারে। আমরা খুব ভালোমতো লক্ষ্য করেছি যে, বিগত কয়েক বছরের তুলনায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ বেশি বেশি প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হচ্ছে। যেমন:বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, জলোচ্ছ্বাস, টর্নেডো, ভূমিকম্প, নদীভাঙন ইত্যাদি। তবে এসবের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে বজ পাত! যার ছোবলে প্রতিবছর শতশত মানুষ মারা যাচ্ছে। বর্তমানে এটিও খুব উদ্বিগ্ন করে তুলছে আমাদের।
উন্নত রাষ্ট্রগুলোর কিছু স্বেচ্ছাচারিতার কড়া মাশুল গুনতে হচ্ছে বাংলাদেশসহ উপকূলীয় দেশগুলোকে। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়েছে, আবাদি জমিগুলো ক্রমান্বয়ে নষ্ট হয়ে আয়তন সংক্ষিপ্ত হয়ে আসছে, সেইসঙ্গে মৌসুমি ফসল উত্পাদনও কমে যাচ্ছে! এটা কেন বা কী কী কারণে হচ্ছে সেটার কারণ খুব সহজেই অনুমেয়। তবে পরিসংখ্যান বলছে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ কার্বনডাই-অক্সাইড নিঃসরণ করছে চীন। তারপর যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া। জলবায়ু সম্মেলনগুলোতে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পশ্চিমা দেশগুলোর তেমন কোনো আগ্রহ নেই। কিছু সামাজিক সংগঠন এগুলোর ব্যাপারে আওয়াজ তুললেও তেমন কোনো লাভ হচ্ছে না। ফলে পৃথিবী কঠিন এক সমীকরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সম্মেলন করে যারা কার্বন নিঃসারণ কমাতে বলে ভেতরে ভেতরে তারাই বেশি কার্বন নিঃসারণ করছে। তাছাড়া তারা নেতৃত্ব স্থানে থাকার কারণে কারো কাছে জবাবদিহিও করার প্রয়োজন মনে করে না। তবে আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯-এ জাতিসংঘের মহাসচিবের এক বিশেষ আহবানে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ বিষয়ক সেমিনারে ‘বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০’ যদি সঠিকভাবে উপস্থাপন করা যায় তাহলে সেটা বাংলাদেশের জন্যে স্বাভাবিকভাবেই বাসযোগ্য পরিবেশ রক্ষায় অসাধারণ ভূমিকা রাখবে। এটা সফল করার লক্ষ্য নিয়ে আমাদেরকে সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। তবে এই জলবায়ু পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্যে একটা অভিশাপের মতো কাজ করছে।
বায়ুমণ্ডলের নিঃসারিত কার্বনের এক-তৃতীয়াংশই শোষণ করে সমুদ্রের পানি। এভাবে যদি কার্বনডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বাড়তে থাকে তাহলে আমাদের এই সোনার বাংলাদেশ আর সোনার বাংলাদেশ থাকবে না! তখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে! ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্র স্তরের উচ্চতা বাড়তে পারে ৬২ সেন্টিমিটার থেকে ২৩৮ সেন্টিমিটার! সার্বিকভাবে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড এবং অ্যান্টার্কটিকায় জমে থাকা বরফও ক্রমে ক্রমেই গলতে শুরু করেছে। ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রাও বেড়েছে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস! এটা ৩-৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস হতে হয়তো আর বেশিদিন লাগবে না! বিগত ২০১৫-২০১৮ সাল ছিলো মানব ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণতার বছর? সে সময়েই সমুদ্রস্তরের বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, সময়ে অসময়ে নদীর দিক পরিবর্তন ইত্যাদি সবগুলোই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে আরো বহুগুণে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে বা ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেতে রাষ্ট্রের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে এবং সরকারি সহযোগিতার পাশাপাশি বেসরকারিভাবেও প্রচুর তহবিল গঠন করতে হবে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—এই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের ১৪ শতাংশ ভূমি পানির নিচে তলিয়ে যেতে পারে। এভাবে তলিয়ে যেতে থাকলে আস্তে আস্তে একটা সময় পৃথিবীর মানচিত্র থেকে বাংলাদেশ নামক নামটি মুছে গেলেও অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। অন্ততপক্ষে নিজের দেশকে বাঁচাতে পরিবেশবান্ধব কাজ করার পাশাপাশি বেশি বেশি বৃক্ষরোপণের কোনো বিকল্প নেই। ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে আমরা সবাই যদি একটি করে বৃক্ষ রোপণ করি তাহলে একসময় সবুজে সবুজে ভরে যাবে এই দেশ। এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিছুটা হলেও প্রশমিত করা যাবে। ভৌগোলিকভাবেই আমাদের দেশটি একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ। তাই এমতাবস্থায় নিজের দেশকে বাঁচাতে অধিক কার্বনডাই-অক্সাইড নিঃসরণের অপকারিতা এবং বৃক্ষরোপণের উপকারিতা সম্পর্কে বেশি বেশি জনসচেতনতা তৈরি করা ছাড়া বিকল্প কোনো রাস্তা নেই।
n লেখক :শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
