জুয়েনা আক্তার
বর্তমানে বাংলাদেশের একটি বড়ো সমস্যা হলো দুর্নীতি। দুর্নীতি এখন বাংলাদেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাসা বেঁধেছে। পুলিশ, সাধারণ প্রশাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ প্রায় সব খাতে ঢুকে পড়েছে দুর্নীতি। বাংলাদেশের জন্য দুর্নীতি এখন মহামারির চেয়েও ভয়ংকর। এছাড়া দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থতা শুধু আর্থসামাজিক উন্নয়নকে ব্যাহত করছে না বরং রাজনৈতিক অঙ্গনে সহিংসতা এবং অস্থিতিশীলতার বিস্তার ঘটিয়ে সুশাসন ও জবাবদিহিতামূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে ধূলিসাত্ করার ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।
নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো আদর্শের নৈতিক বা আধ্যাত্মিক অসাধুতা বা বিচ্যুতি হলো দুর্নীতি। বাংলাদেশে দুর্নীতি দিন দিন বেড়েই চলেছে। এর পেছনে সম্ভাব্য কারণগুলো হলো—দুর্নীতির বিরুদ্ধে অঙ্গীকারের সঙ্গে বাস্তবায়নের মিল না থাকা, হাইপ্রোফাইলের দুর্নীতি চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় না আনা, সরকার ও রাজনৈতিক দল এক হয়ে যাওয়া, আর্থিক ও ব্যাংকিং খাতে ঋণখেলাপি ও জালিয়াতি বৃদ্ধি। এছাড়াও দুর্বল জবাবদিহিতা, দুদকের কার্যকারিতা ও স্বাধীনতার অভাব, দায়মুক্তি ও দুর্বল আইনের শাসন এবং গণমাধ্যমের ক্ষেত্র সংকুচিত করা দুর্নীতি বৃদ্ধির জন্য দায়ী।
দুর্নীতিবাজদের সম্পদের পাহাড় বছর বছর যেন শিখর স্পর্শ করছে। অন্যদিকে শোষিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। দেশে বছরে গড়ে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের চেয়ে বেশি মূল্যের সম্পদ চুরি হয়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দরে শুল্ক ও কর বিভাগে বছরে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন থেকে ১ বিলিয়ন আমেরিকান ডলার মূল্যের সম্পদ চুরি হচ্ছে। ব্যাংক সেক্টরে উচ্চ দুর্নীতির জন্য মূলধন আমানত ও সুষ্ঠু ঋণ প্রদান ব্যাহত হচ্ছে। প্রায় ৫০% ব্যাংক ঋণ সঠিকভাবে কাজে লাগছে না দুর্নীতির জন্য। এছাড়াও ব্যাংক কর্মকর্তারা ৫-১০% ঋণ দেয় অবৈধভাবে। কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও দেখা যায় ব্যাপক দুর্নীতি। দফায় দফায় সময় বৃদ্ধি করে প্রকল্প ব্যয় বাড়ানো হয়। কিন্তু তারপরও দুর্নীতিবাজদের গায়ে কাঁটার আঁচড়টুকু লাগছে না।
একটি দেশের গণতন্ত্রের মাত্রা ও দুর্নীতির মধ্যে কোনো সংযোগ আছে কিনা তা খতিয়ে দেখেছে টিআই। এক্ষেত্রে যে দেশগুলো ১০০-এর মধ্যে গড়ে ৭৫ স্কোর করেছে সেগুলোতে পূর্ণ গণতন্ত্র আছে বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। যেসব দেশে গণতন্ত্রের সঙ্গে স্বৈরাচারের মিশ্রণ ঘটেছে তাদের স্কোর গড়ে ৩৫। দুর্নীতির মাত্রা অনুযায়ী বাংলাদেশও হুমকির সম্মুখীন।
প্রকৃতপক্ষে চুনোপুঁটি মেরে দুর্নীতি দমন করা যাবে না। এজন্য আইনের শাসন সবার ক্ষেত্রে সমভাবে প্রয়োগ করতে হবে। দুর্নীতি একটি কাঠামোগত সমস্যা। উপরি কাঠামোতে দুর্নীতি বজায় রেখে, নিচুতলায় সমাধান খোঁজা রসিকতা ছাড়া কিছু নয়। তাই শাসনকাঠামোর উঁচুতলাকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে।
প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ভালো কিন্তু অল্প কিছু দুর্নীতিবাজ বিশ্বদরবারে আমাদের ভাবমূর্তি খারাপ করছে। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, বাংলার কৃষক ভালো, মজুর ভালো, খারাপ হলো শিক্ষিত সমাজ। তাই শিক্ষিত সমাজকে সচেতন ও সত্ হতে হবে। আসুন দুর্নীতিকে প্রশ্রয় না দিই, আর সোনার বাংলা গড়ার অঙ্গিকার করি।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
