সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রতিদিন আমাদের বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর খাবার খাওয়া জরুরি। কিন্তু আমাদের মাঝে খাবার সম্পর্কে অজ্ঞতাবশত মনগড়া কিছু ধারণা বা বিশ্বাস প্রাচীনকাল থেকেই দেখা যায়; যেগুলোর বেশিরভাগই নারী ও শিশুদের উপলক্ষ করেই সৃষ্টি। শুধু গ্রামে নয়, শহরের শিক্ষিত মানুষের মাঝেও অপ্রয়োজনীয় এসব প্রথার প্রচলন আছে। খাবারের ট্যাবু বা কুসংস্কার নিয়ে লিখেছেন
পুষ্টিবিদ মুনমুন হক
কখনো কখনো তারা নিজেরাও জানেন যে; এসব হয়তো সত্যি না, তারপরও তারা ওইসব গোঁড়ামি থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না। ফলে তারা নিজেরা যেমন বঞ্চিত হন, তেমনি তাদের আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হন। খাবার নিয়ে এসব ধ্যান-ধারণা বা কুসংস্কার এতটাই প্রবল আর প্রকট আকার ধারণ করে যে, তা মানুষের অপুষ্টির কারণ তো বটেই, কখনো কখনো মৃত্যু ঝুঁকিও সৃষ্টি করতে পারে। যেমন—
l পাকা কলা খেলে ঠাণ্ডা লাগবে, সর্দি হবে তাই শীতকালে অনেকেই কলা খেতে চান না। এটি নিতান্তই ভুল ধারণা। ব্যক্তি বিশেষে কলায় কারও কারও অ্যালার্জি থাকতে পারে। তবে কলায় এমন কোনো উপাদান নেই যার কারণে সর্দি হতে পারে। বরং এতে রয়েছে শর্করা, আয়রন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ভিটামিন-সি, বি কমপ্লেক্স প্রভৃতি পুষ্টিকর উপাদান। আমাদের দেশে অনেকেই জোড় কলা খান না; এর কারণ তাদের ধারণা জোড় কলা খেলে যমজ সন্তান হবে। এটি নিতান্তই হাস্যকর ও যুক্তিহীন একটি ধারণা। সন্তান একটি হবে নাকি যমজ হবে তা সম্পূর্ণই একটি দৈব ঘটনা। এর সাথে জোড় কলা খাওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই।
l আরও একটি ব্যাপক প্রচলিত কুসংস্কার হলো, কোনো ব্যক্তির শরীরের কোনো অংশ কেটে গেলে কিংবা অপারেশন করার পর টক জাতীয় ফল খাওয়া যাবে না। অথচ প্রকৃত ঘটনা সম্পূর্ণ বিপরীত। শরীরের কোনো অংশ কেটে গেলে কিংবা অপারেশন করার পর টক জাতীয় ফল খেলে ক্ষতস্থান দ্রুত সেরে উঠে। কারণ ওইসব ফলে রয়েছে, ভিটামিন-সি যা ঘা শুকাতে সাহায্য করে। এ কারণে এমন অবস্থায় ভিটামিন-সি জাতীয় ফল যেমন—লেবু, কমলা, আনারস, জাম্বুরা, আমড়া, মাল্টা ইত্যাদি খাওয়া উচিত।
l আমাদের দেশে গর্ভবতী নারীদের বিভিন্ন কুসংস্কারে আবদ্ধ করে রাখা হয় ফলে তারা মাতৃত্বকালীন অপুষ্টিতে ভোগেন। যেমন—গর্ভাবস্থায় আনারস খেলে গর্ভপাত হয়। এ কারণে অনেক গর্ভবতী নারী আনারস খাওয়া থেকে বিরত থাকেন। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো আনারসে এমন কোনো উপাদান নেই যা গর্ভপাত ঘটাতে পারে। আনারস ভিটামিন-সির খুব ভালো উত্স। গর্ভাবস্থায় আনারস খুবই উপকারী একটি ফল।
l অত্যন্ত হাস্যকর আরও একটি কুসংস্কার হলো কেউ কেউ মনে করেন গর্ভাবস্থায় বোয়াল মাছ খেলে শিশুর ঠোঁট বোয়াল মাছের মতো হবে। প্রকৃত সত্য হলো এই; সৃষ্টিকর্তা যেভাবে চাইবেন সন্তান সেভাবেই জন্ম গ্রহণ করবে। মাছ খাওয়ার সাথে মাছের মতো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। একই ভাবে মৃগেল মাছ নিয়েও রয়েছে ভুল ধারণা। এ মাছ খেলে নাকি মৃগী রোগ হয়! এক্ষেত্রেও একই কথা; এই মাছ খেলে মৃগী রোগ হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। এসব প্রাচীন কুপ্রথার কারণে আমাদের দেশের গর্ভবতী মায়েরা পরিবারের সামর্থ্য অনুযায়ী খাবার কিনে খেতে পারেন না, ফলে প্রোটিনের অভাবে ভোগেন, সেই সাথে অনাগত শিশুটিও অপুষ্টি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে।
l তেমনিভাবে মাংস নিয়েও রয়েছে অবান্তর ধারণা। গরুর মাংসে অ্যালার্জি থাকায় কেউ কেউ খাসির মাংসের উপর নির্ভর করে থাকে। কারও কারও ধারণা গর্ভবতী মা খাসির মাংস খেলে নাকি শিশুর শরীরে ঘন লোম গজাবে। এটিও কুসংস্কার ছাড়া আর কিছুই নয়। ফলে দেখা যায় গর্ভবতী মা যেকোনো ধরনের মাংস খাওয়া থেকেই বিরত থাকেন; তিনি নিজে তো বটেই শিশুটিও অপুষ্টির শিকার হয়। আবার কেউ কেউ বলে মাংস অপেক্ষা ঝোল ভালো। কিন্তু ঝোলে থাকে শুধু তেল, চর্বি, মসলা আর পানি। কাজেই ঝোল থেকে প্রোটিন পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
l আরও প্রচলিত আছে গর্ভবতী মা বেশি খেলে নাকি শিশু আকারে বড় হবে আর জন্মদানের সময় মায়ের ও সন্তানের ক্ষতি হবে। বাস্তবে গর্ভাবস্থায় পুষ্টি চাহিদা একজন সাধারণ নারীর চেয়ে বেড়ে যায়। আর সেই বাড়তি চাহিদা পূরণের জন্য তাকে পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করতে হবে। তা নাহলে মা ও শিশু উভয়েরই ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কখনো কখনো মৃত্যুও হতে পারে। একইভাবে সন্তান প্রসবের পরও মায়ের উপর নানা রকমের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। যেমন—সদ্যপ্রসূতি মাকে স্বাভাবিক খাবার কিংবা রসালো খাবার দেওয়া যাবে না, তাকে শুকনো খাবার যেমন—মুড়ি, ভর্তা দিয়ে ভাত ইত্যাদি দিতে হবে তাহলে ক্ষতস্থান তাড়াতাড়ি শুকাবে। এসব ভুলের কারণে তখনো মা সঠিক পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হন আর নানা রকম রোগে আক্রান্ত হন। ফলে সন্তানের দেখা-শোনাও ঠিকমতো করতে পারেন না। এসব ভ্রান্ত ধারণা যদি দূর করা না যায় তবে মা ও শিশুর অপুষ্টি দূর করা যাবে না।
