নদী হইল সভ্যতার বাহন। বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সভ্যতা নদ-নদীর তীরেই গড়িয়া উঠিয়াছে। যেই নদীকে কেন্দ্র করিয়া একটি সমাজ-সভ্যতা বিকশিত হয়, সেই নদীকে আমরা কীভাবে হত্যা করিতে পারি? বিশ্বে নদীর গুরুত্ব বিবেচনায় ইহাকে জীবন্ত সত্তার স্বীকৃতি দেওয়া হইয়াছে। কিন্তু অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশে কে শুনে কাহার কথা! নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশেরও একই অবস্থা। জাতিগতভাবে আমরা নদীর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হই, কিন্তু নদী দখল ও দূষণের প্রতিবাদ করি না সেইভাবে। এই কারণে প্রতি বত্সর জীবিত নদীর তালিকা ছোটো হইতেছে, আর বাড়িতেছে বিলুপ্তপ্রায় নদীর সংখ্যা। নদী নিয়া আমাদের বাংলা সাহিত্যে বিখ্যাত অনেক কবিতা, গল্প, উপন্যাস রহিয়াছে। রহিয়াছে চলচ্চিত্রও। সেইসব স্মরণীয় নদীগুলি রক্ষার ব্যাপারেও আমরা উদাসীন। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘পদ্মানদীর মাঝি’সহ কত কালজয়ী সাহিত্য রহিয়াছে আমাদের। কিন্তু বাস্তবে এই নদীগুলি দিন দিন নিস্তেজ হইয়া পড়িতেছে। ইহাতে সবচাইতে ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে আমাদের কৃষি-অর্থনীতি ও ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি।
গত রবিবার ছিল বিশ্ব নদী দিবস। যথারীতি নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়া দিবসটি উদ্যাপিত হইয়াছে সারাবিশ্বে। কিন্তু এই দিবস উদ্যাপন আমাদের নদী রক্ষার চেতনাকে কতটা শানিত করিয়াছে? নদীর অপমৃত্যুর জন্য যে কারণগুলি দায়ী তাহার অন্যতম হইল নদীর পাড় ও প্লাবন, ভূমি দখল করিয়া বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ ও কেমিক্যালসহ নানা রকম বর্জ্য-আবর্জনা ফেলিয়া নদীর দূষণ। নদী দখলের সহিত বলা হয় প্রভাবশালী মহল জড়িত। কিন্তু নদী দূষণের সহিত সাধারণ মানুষদের অনেকেই কি পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত নহে? বুয়েটের পানিবিজ্ঞান বিভাগের একজন শিক্ষক বুড়িগঙ্গা নদী ও তুরাগ নদ নিয়া সম্প্রতি তাহার এক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন যে, হাজারিবাগ হইতে ট্যানারি শিল্প সরাইয়া নেওয়ার পর বুড়িগঙ্গার পানির গুণগত মান উন্নত হইবে বলিয়া আশা করা হইয়াছিল। কিন্তু এই নদীর ৯টি পয়েন্টের পানি পরীক্ষা করিয়া দেখা গিয়াছে পরিস্থিতির তেমন কোনো পরিবর্তন হয় নাই। তাহার মানে বুড়িগঙ্গার পানি দূষণের জন্য শুধু ট্যানারিই নহে, আশপাশের অন্যান্য কলকারখানার বর্জ্যও বহুলাংশে দায়ী। একইসঙ্গে এই নদীর তলদেশে যে বর্জ্যের আস্তরণ রহিয়াছে তাহা অপসারণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের কোনো বিকল্প নাই। তুরাগ নদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। গবেষকরা বলিতেছেন, সোয়ারীঘাট হইতে আটিবাজার কিংবা বছিলা হইতে কলাতিয়া যাইতে বুড়িগঙ্গা কিংবা তুরাগের পানির রং একই। কোথাও গাঢ় কালো, কোথাও-বা তামাটে। কোথাও কোথাও আবার বিষাক্ত কেমিক্যাল গ্যাসের বুদ্বুদ উঠে।
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ২০০৫ অনুসারে (সংশোধিত ২০১০) সরকার ঢাকার চারিপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদনদীকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসাবে ঘোষণা করিয়াছে। মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশে সারাদেশে নদ-নদীর অবৈধ দখলদারদের তালিকা তৈরি হইয়াছে। মাদক ও ক্যাসিনো অভিযানের মতো এখন প্রয়োজন তাহাদেরও উচ্ছেদে দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা। এই ব্যাপারে প্রশাসনের মাসব্যাপী ক্র্যাশ প্রোগ্রাম হাতে নেওয়া। দেশের প্রধান ৪৮টি নদীর তথ্যভান্ডার তৈরি হওয়া ও বিভিন্ন নদীর ড্রেজিং অব্যাহত রাখা সরকারের একটি শুভ উদ্যোগ। তবে পানির বিভিন্ন ধরনের অপব্যবহার রোধসহ নদী রক্ষার কর্মসূচিতে স্থানীয় কমিউনিটির অংশগ্রহণও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
