সড়ক দুর্ঘটনা ও দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতা

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:০৩

সড়ক দুর্ঘটনা কমবেশি সারা বিশ্বেই ঘটিতেছে। উন্নত দেশ হিসাবে আমেরিকা-ইউরোপে সড়ক দুর্ঘটনার হার কম হইলেও তৃতীয় বিশ্ব তথা এশিয়া ও আফ্রিকার অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে ইহা নৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হইয়াছে। এইসব দেশে সড়ক-মহাসড়কের প্রশস্ততা ও রোড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের যেমন অভাব আছে, তেমনই ট্রাফিক আইন মানিয়া চলা ও ঝুঁকিহীন রাস্তা ব্যবহারে সচেতনতার অভাবও প্রকট। বিশেষ করিয়া দক্ষিণ এশিয়ায় এই সংকট একটু বেশি বলিয়াই প্রতীয়মান হয়। গত শুক্রবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক একটি বৈশ্বিক প্রতিবেদন প্রকাশ করিয়াছে। ‘গ্লোবাল স্ট্যাটাস রিপোর্ট অন রোড সেফটি ২০১৮’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে যে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গিয়াছেন ২৪ হাজার ৯৫৪ জন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর দিক হইতে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে রহিয়াছে ভারত ও পাকিস্তান। ভারতে প্রতি বত্সর সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান প্রায় তিন লক্ষ মানুষ এবং পাকিস্তানে এই সংখ্যা ২৭ হাজারের অধিক। সরকারি-বেসরকারি ও নিজস্ব সমীক্ষার ভিত্তিতে প্রণীত হওয়ায় এই রিপোর্টটি অধিকতর গ্রহণযোগ্য বিধায় ইহাকে আমলে নিয়া সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আমাদের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া দরকার।

খুব বেশিদিনের কথা নহে। গত শুক্রবার নরসিংদীর শিবপুর ও ধামরাইয়ে পৃথক দুইটি সড়ক দুর্ঘটনায় তিন ছাত্রসহ নিহত হইয়াছেন সাত জন। আহত হইয়াছেন ১১ জন। এভাবে প্রায়শ মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটিতেছে। দুই ঈদসহ বিভিন্ন উত্সবের সময় দুর্ঘটনার হার আরও বাড়িয়া যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই রিপোর্টে বলা হইয়াছে যে, প্রাণঘাতী রোগের চাইতেও সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার বেশি। যক্ষ্মা ও এইডস-এর চাইতেও সড়ক দুর্ঘটনায় বেশি মৃত্যু ঘটিতেছে। বর্তমানে বিশ্বে মৃত্যুর অষ্টম বৃহত্ কারণ হইল সড়ক দুর্ঘটনা। অর্থাত্ এই মহামারির বিরুদ্ধে বিশ্ববাসীকে সম্মিলিত ব্যবস্থা নিতে হইবে। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে পথচারীর সংখ্যা বেশি। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী তাহা ৩২ শতাংশ। সুতরাং এখানে যাত্রীসাধারণের সচেতনতা যেমন দরকার, তেমনই রাস্তায় চলাচলে যেসব প্রতিবন্ধকতা আছে তাহার অবসানে সর্বত্র পর্যাপ্ত ও প্রশস্ত ফুটপাত, পৃথক লেন ইত্যাদিরও ব্যবস্থা করিতে হইবে।

প্রকৃতপক্ষে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আমাদের দেশে এই পর্যন্ত যে সকল ব্যবস্থা নেওয়া হইয়াছে তাহা যথেষ্ট নহে। অবৈধ যানবাহন, অদক্ষ চালক ও সড়কের সংস্কার— এই তিনক্ষেত্রে জোরালো পদক্ষেপ নিতে হইবে। যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে অত্যাধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি গ্রহণ করা দরকার। উন্নত দেশে ভিডিও ফুটেজ দেখিয়া গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ ও শাস্তি বিধানের যে ব্যবস্থা আছে— তাহা অনুসরণ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের মহাসড়কে গাড়ির গতি ঘণ্টায় ১১২ কিলোমিটার। অথচ ভারতে ইহা ১০০ কিলোমিটার। তাহারপরও শুধু বাংলাদেশে নহে, বিশ্বের ১০৪টি দেশেই সড়ক দুর্ঘটনা বাড়িয়াছে। ইহা হইতে মুক্তি পাইতে জাতিসংঘের মানদণ্ড অনুযায়ী যেসকল নির্দেশনা আছে, তাহা আমাদের মানিয়া চলিতে হইবে। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জন করিতে হইলে নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ যানবাহন, দুর্ঘটনার পর জরুরি সেবার মানোন্নয়নের বিকল্প নাই।