আমাদের দেশে গ্রাম তো দূরের কথা, শহরের বেশির ভাগ মানুষই জানেন না ভোক্তা অধিকার কি? বিষয়টি সম্পর্কে সকলের একটা পরিষ্কার ধারণা থাকলে হয়তো আমাদের দেশের ভোক্তাদের অধিকার রক্ষায় ভোক্তা অনেক আগেই প্রতিবাদী হয়ে উঠতো। আর অজ্ঞাত বলেই এরা প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছে পণ্য বা সেবা ক্রয় করতে গিয়ে। তারা জানে না আমাদের দেশে ক্রেতা-ভোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণে আইন আছে। অধিদপ্তর স্থাপন করা হয়েছে। বেসরকারি ভোক্তা স্বার্থ সংগঠন রয়েছে। সচরাচরই দেখা যায়, বিভিন্ন দোকান থেকে কোমল পানীয় বা অন্য কোনো বস্তু কিনতে গেলে ২৫ টাকার জায়গায় ৫০ টাকা দিতে হয়। আর এজন্যে দোকনির সঙ্গে তর্কবিতর্ক করেও লাভ হয় না। এছাড়াও আটা কিংবা গুড়াদুধ কেনার পর দেখা গেলো পণ্যটির মেয়াদ উত্তীর্ণ। পরে দোকানির কাছে ফেরতের জন্যে নিয়ে আসলে তা ফেরত তো নেয় না বরং খারাপ আচরণ করে। আর এ ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটে। প্রতিনিয়তই ক্রেতা তথা ভোক্তা হয়রানির শিকার হচ্ছে। আর এর মূল কারণ হলো ভোক্তার অজ্ঞতা, অসচেতনতা ও উদাসীনতা। অসচেতন ও উদাসীন বল্লাম এই কারণে যে, অনেকে আছে যারা এই আইন সম্পর্কে জ্ঞাত। আর যখন তারা দোকানিদের কাছে হয়রানির শিকার হয় তখন তাদের ভাষ্য হলো: ‘অভিযোগ করে কি লাভ! কোনো লাভ নেই। কোনো ফল পাওয়া যাবে না। শুধু-শুধু সময় নষ্ট।’ ইত্যাদি আরো অনেক ধরনের উদাসীনতামূলক উক্তি শোনা যায়। আরেক শ্রেণির লোক আছে তারাও হয়রানির শিকার হওয়ার পর বিভিন্ন আড্ডায় গল্প করতে-করতে বলে, ‘বাংলাদেশে এখনও ভোক্তাদের হাটে-বাজারে হয়রানির শিকার হতে হয়। বাইরের দেশে এইসব হলেই তত্ক্ষণাত্ ব্যবস্থা নেয়া হয়।’ এই ধরনের আলোচনা যারা করে থাকে তাদের মধ্যে অধিকাংশই শিক্ষিত। আর এই শিক্ষিত সমাজগুলোই পরিচয় দিচ্ছে তাদের অসচেতনতার পরিচয়। অনেকেই আছে এই আইন সম্পর্কে অবগত কিন্তু অভিযোগ করার পদ্ধতি জানেন না। আবার যে তথ্যটা অনেকের কাছে অজানা, কোনো ব্যক্তি যদি লিখিত অভিযোগ করেন আর যদি তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হয় তাহলে জরিমানার টাকা থেকে অভিযোগকারী ২৫ শতাংশ পাবেন। সম্প্রতি অনেক ভোক্তা অভিযোগ করে সফলতা পেয়েছেন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে যেভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাতে আমরা চাই আর না চাই দেশ ডিজিটাল হবেই। ধীরে-ধীরে কিন্তু ডিজিটালের দিকে ধাবিত হচ্ছে। কিন্তু কথা হচ্ছে ডিজিটাল বাংলাদেশে এই আইনের বিদ্যমান ধারা নিয়ে ভোক্তার আস্থা কতটুকু অর্জিত হবে! ধরুন, ক্রেতা অনলাইনে কোনো একটি পণ্য বা সেবা দেখল এবং কেনার জন্য অর্ডার দিলো। তার আগে তাকে বিল পরিশোধ করতে হয়েছে ক্রেডিট কার্ড কিংবা অন্য কোনো ডিজিটাল পদ্ধতি অবলম্বন করে। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেল ক্রেতা তার অর্ডারকৃত পণ্য বা সেবাটি পাচ্ছে না। কেননা সে অনলাইনে প্রতারিত হয়েছে। অর্থাত্ যে ওয়েব সাইটে পণ্যটি অর্ডার দিয়েছে সেটি ভুয়া। আরেকটি বিষয় হলো- ভোক্তা অনলাইনে তার পছন্দের পণ্যটি যখন হাতে পায় না তখনই বা এই আইনের কার্যকারিতা কতটুকু হবে! এমনও তো হতে পারে বিক্রেতা তার ভোক্তার ঐ পছন্দসই অর্ডারকৃত পণ্যটি সুন্দর করে প্যাকিং করে কুরিয়ার করে পাঠাল। কিন্তু পথে নিরাপত্তাজনিত কারণে ঐ পণ্যটির প্যাকেট খুলতে হলো। এতে করে ভোক্তার যে একটা প্রত্যাশা ইনটেক পণ্য ভোগ করা তা তো হলো না বরং আরো সমস্যর সৃষ্টি। এইক্ষেত্রে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর কিভাবে এই সমস্যার সমাধান করবেন এটা একটা বিরাট প্রশ্ন। কেননা প্রচলিত বা বিদ্যমান আইন ডিজিটাল দুনিয়ার ভোক্তার অধিকার সংরক্ষণে মোটেও ভূমিকা পালন করবে না। পরবর্তীকালে দেখা যাবে ডিজিটাল অবস্থায় পণ্য বেচাকেনা, সেবাদান ও আর্থিক লেনদেনে আইনের ধারাগুলো অনেক ক্ষেত্রেই সাংঘর্ষিক। এছাড়াও ডিজিটাল যুগে বিক্রেতা ক্রেতার তথ্য সংগ্রহ করে সেই তথ্য কাকে দিচ্ছে, কোন কাজে লাগাচ্ছে তার কোনো অন্ত খুঁজে পাওয়া ক্রেতার পক্ষে কঠিন। আইনে এখনও এমন কোনো বিধান নেই যার ফলে ক্রেতা নিজেকে রক্ষা করতে পারবে। তাই ডিজিটাল বাংলাদেশে ভোক্তা যাতে তার সকল আস্থা নিয়ে কোনো ধরনের উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠা ছাড়া যেন জীবনকে স্বাভাবিক গতিতে চালাতে পারে সেজন্য বিদ্যমান আইনের সংস্কার একান্ত কাম্য।
স্বীকার করতে হবে যে, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ সাল থেকে কাজ করছে। মানুষ ফল পাচ্ছে। তবে সবাই নয়। সবাই পাচ্ছে না কারণ সবাই এই আইন সম্পর্কে অবগত নয়। তার মানে এই নয় যে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এই আইন নিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছে না। ইতপূর্বে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছিল। কিন্তু সেই তুলনায় ফল পাওয়া যায়নি। কিন্তু এখানেই থেমে থাকা শোভা পায় না। প্রচারণা নিয়মিত চালিয়ে যাওয়া উচিত। প্রয়োজনে অভিনব পদ্ধতিতে ভোক্তাকে অবহিত করতে হবে। এছাড়াও ভোক্তার আস্থা অর্জনের জন্যে জাতীয় অধিদপ্তরকে সদা সক্রিয় ও প্রাণবন্ত থাকা উচিত। যাতে জনগণ সেবা পেয়ে গঠনমূলক সমালোচনা করতে পারে। তাই প্রয়োজন সর্বোচ্চ দক্ষতা দিয়ে কাজ করে যাওয়া। এছাড়াও এই আইনের অনেক অংশ সংশোধন করা প্রয়োজন। আর জাতীয় অধিদপ্তরকে সক্রিয় ও প্রাণবন্ত রাখার জন্যে যে সমস্ত প্রয়োজনীয় উপকরণ প্রয়োজন তা অতিদ্রুত জোগাড় করে নেয়া দরকার।
উন্নত বিশ্বে ভোক্তা অধিকার অনেকদূর এগিয়েছে, যার তুলনায় আমাদের দেশ কিছুই না। আর এর প্রধান কারণ হলো জনগণের অসচেতনতা। ১৯৯৪ সালে ইসা লিসবেক নামে এক মার্কিন নারীর শরীরে ম্যাকডোনাল্ডসের ৫০ সেন্টের কফি পড়ে পুড়ে যাওয়ার ঘটনায় ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছে ছয় লাখ ডলার! শুধু স্বাভাবিক তাপমাত্রা থেকে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কফি দেওয়ার অভিযোগে। উন্নত বিশ্বে মানুষ ভোক্তা অধিকার সম্পর্কে বেশি সচেতন। নিয়মতান্ত্রিকভাবেই ভোক্তাদের অধিকার সংরক্ষিত আছে। তাই সেখানে ভোক্তাদের অধিকার সংরক্ষণের জন্য কোনো আন্দোলন বা আইনের আশ্রয় নিতে হয় না। তাই দেশেও একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের সকলের এ বিষয়ে জানা দরকার এবং অধিকার আদয় করে নেয়া প্রয়োজন।
n লেখক :শিক্ষার্থী, নটরডেম কলেজ
