প্রত্যন্ত অঞ্চলে মেয়েদের এই সময়ে উপকরণ সরবরাহ এবং শিক্ষা প্রদান
করতে আগ্রহী হন। ফেসবুকে তিনি এই বিষয়টি শেয়ার করেন।
সর্বপ্রথম এগিয়ে আসেন মনিষা কায়সার নামের একজন।
যিনি এখনো তার সংগঠনের সাথেই আছেন।
এরপর মিরা আগ্রহীদের নিয়ে প্রতিষ্ঠা
করেন অল ফর ওয়ান
সংগঠন
মাহবুব নাহিদ
প্রিন্সেস ডায়ানার কথা কে না জানে! প্রিন্সেস ডায়ানা অ্যাওয়ার্ডের কথাও যে এখন আমাদের জানতে হবে। আমাদের দেশেরই এক রাজকন্যা এ বছর প্রিন্সেস ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড জিতেছেন। তিনি বিশেষ কোনো রাজ্যের রাজকন্যা নয়। তিনি আমাদের পুরো দেশের রাজকন্যা। তিনি কাজ করছেন মেনস্ট্রুয়াল হাইজিন নিয়ে। নাম তার কামরুন নেছা মিরা। মেয়েদের মাসিক ঘটিত সমস্যা নিয়ে শিক্ষা ও বিভিন্ন উপকরণ সরবরাহ করার মহত্ উদ্যোগের কারণে তিনি জিতেছেন এই অ্যাওয়ার্ড।
কামরুন্নেসা মিরা ছোটবেলা থেকেই বড়ো হয়েছে ঢাকার শেওরাপাড়ায়। বাবা সেকান্দার আলী ডেইলি স্টার পত্রিকায় ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত আছেন। মা একজন গৃহিণী। বংশগতভাবেই তারা সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত। তার ফুপু বাংলাদেশের প্রথম দিকের একজন নারী সাংবাদিক ছিলেন। নাম ফরিদা বেগম, কাজ করেছেন দৈনিক বাংলা পত্রিকায়। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে মিরা পড়েছেন মীরপুর গার্লস আইডিয়াল ইনস্টিটিউটে। এই প্রতিষ্ঠানে পড়া তাদের বংশীয় একটা ঐতিহ্য।
ছোটোবেলা থেকেই মিরার ঝোঁক ছিল সাংবাদিকতা ও লেখালেখির দিকেই। ছোটবেলায় বিভিন্ন পত্রিকার শিশু কলামে লিখতেন তিনি। বাংলা একাডেমির ক্ষুদে বইমেলায় ২০০২, ২০০৩ ও ২০০৪ সালে পুরস্কার জিতেছেন ছড়া বিভাগে। সাংবাদিকতার প্রতি ঝোঁক থাকার কারণে মেডিক্যালে চান্স পেয়েও ভর্তি হননি। স্নাতক করেছেন ইউল্যাবে মিডিয়া স্টাডিজ এবং জার্নালিজম বিভাগে। আমেরিকায় স্কলারশিপ পেয়েও যেতে পারেননি তার এই কাজের জন্যই। সাংবাদিকতা ও রিসার্চ নিয়ে কাজ করতে তিনি বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন। এ বিষয়ে তার লেখা দুটি পেপারও বের হয়েছে। ‘সোশ্যাল স্টিগমা এবাউট মিডিয়া স্টাডিজ স্টুডেন্ট’ প্রকাশ পায় ২০১৭ সালে মালয়েশিয়ায়। ‘উইমেন ইনভলবমেন্ট ইন বাংলাদেশ নিউজ মিডিয়া: রিপ্রেসেন্ট্যাশন ওর ডিপ্রাইভেশন’ প্রকাশ পায় ২০১৮ সালে ইন্ডিয়ায়।
তিনি প্রত্যন্ত অঞ্চলে মেয়েদের এই সময়ে উপকরণ সরবরাহ এবং শিক্ষা প্রদান করতে আগ্রহী হন। ফেসবুকে তিনি এই বিষয়টি শেয়ার করেন। সর্বপ্রথম এগিয়ে আসেন মনিষা কায়সার নামের একজন। যিনি এখনো তার সংগঠনের সঙ্গেই আছেন। এরপর মিরা আগ্রহীদের নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন অল ফর ওয়ান সংগঠন। এই সংগঠনের প্রধান কাজ হচ্ছে সঠিক যৌন শিক্ষা, সাহসিকতার শিক্ষা, মেনস্ট্রুয়াল হাইজিন ব্যবস্থাপনা। এই কাজগুলো করতে তারা বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে বঞ্চনার স্বীকার হন। তারা প্রথম পর্যায়ে অনেক প্রতিবন্ধকতা পার করেন। সর্বপ্রথম তারা ধামালকোট আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে এই কার্যক্রম শুরু করেন। বিভিন্ন স্কুলে স্কুলে তারা স্থাপন করে মেনস্ট্রুয়াল উপকরণ সমৃদ্ধ প্যাড ব্যাংক। ২০১৮ সালের মার্চে শুরু করেই অক্টোবর মাসে তারা ভূষিত হন জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ডে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় মিরার হাতে তুলে দেন এই পুরস্কার। এরপর তাদের আর পেছনের দিকে তাকাতে হয়নি। তরতর করে এগিয়ে চলছে তাদের সংগঠন। দেশের ১৮টি জেলার ৬৮টি স্কুলে তারা স্থাপন করেছেন প্যাড ব্যাংক। তারা ১২৫৭০০ নারীকে মেনস্ট্রুয়াল হাইজিন, লিডারশিপ ডেভেলপমেন্ট, সেল্ফ ডিফেন্সের ট্রেনিং দেন।
তাদের সংগঠনের রয়েছে উইমেন ডেভেলপমেন্ট সেন্টার। যেখানে নারীদের ব্যবসা, অর্থনীতি, সেলাই, ব্লক-বাটিকসহ বিভিন্ন শিক্ষা দেওয়া হয়, তাদের তৈরি করা জিনিসপত্র কিনে নিয়ে যান বিদেশি একটি সংগঠন। তাদের সংগঠনের আওতায় রাজশাহীতে রয়েছে জাগরণ পাঠশালা নামে একটি স্কুল। যেখানে পরিচয়বিহীন ৭৫ জন শিশুকে শিক্ষা ও সহশিক্ষা কার্যক্রম শিখানো হয়। পরবর্তীকালে এদের জাগরণ পাঠশালার অভিভাবকত্বে স্কুলে ভর্তি করানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। তাদের প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে আট জন ক্যানসারে আক্রান্ত নারী রয়েছে যাদের সব খরচ বহন করে মিরার ওয়ান ফর অল। ওয়ান ফর অলের অর্থনৈতিক দিকের অনেকটাই বহন করে সব সদস্য। কিছু বিশিষ্টজনেরা সাহায্য সহযোগিতা করেন, আর মিরার সবচেয়ে বড়ো হাত হচ্ছে তার প্রাণপ্রিয় বাবা। বাবা-মা ও ভাই সবার কাছেই তিনি কৃতজ্ঞ। এছাড়াও তিনি তার টিম, সালেহিন মনোয়ার, রায়হান ভাই, সব ডোনার, সব সেচ্ছাসেবী তাদের সবার প্রতি অনেক অনেক কৃতজ্ঞ তিনি। এমন একটি কাজে কোনো ধরনের সংকোচ না করে বরং তাকে এগিয়ে যাওয়ার সব সহযোগিতা তারা করেছেন।
