ফেসবুকে ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী’ স্ট্যাটাসের জের ধরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ও একটি ইংরেজি পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ফাতেমা তুজ জিনিয়াকে সাময়িক বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। দেশব্যাপী প্রতিবাদ, মানববন্ধন, আন্দোলনের চাপে বহিষ্কারাদেশ তুলে নিলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে উপাচার্য পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন। সমসাময়িক এসব বিষয় নিয়ে আলোচিত ফাতেমা তুজ জিনিয়ার সাথে কথা বলেছেন— নিলয় মামুন ও মো. আবু হানিফ
মায়ের প্রচণ্ড শাসন আর বাবার অতিরিক্ত আদরে বেড়ে ওঠে জিনিয়া। তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোটো সে। উদয়ন প্রি-ক্যাডেট স্কুল থেকে শুরু হয় তার পড়ালেখার হাতেখড়ি। এরপর গলাচিপা মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষা সমাপনী উত্তীর্ণ হয় সে। তারপর গলাচিপা মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি এবং গলাচিপা সরকারি কলেজ থেকে একই বিভাগে এইচএসসি পাশ করে জিনিয়া। এইচএসসিতে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার স্বপ্নে এগিয়ে যায় সে। জিনিয়া জানান, ‘বড়ো দুই ভাই বোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ায় আমারও স্বপ্ন ছিল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হব। বাবা মায়ের ইচ্ছেতেই সিদ্ধান্ত নেই আইন বিভাগে ভর্তি হব। কোচিং এ ভর্তি না হয়ে নিজেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করি। কিন্তু প্রথমবার কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাইনি। বেশ হতাশায় পড়ে যাই। পরবর্তীতে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেই। আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে পড়ার সুযোগ পাই।
n চলমান অবস্থা নিয়ে অভিব্যক্তি
আবাসন সমস্যা, অধিক উন্নয়ন ফি, অদৃশ্য খাতে ফি নেওয়াসহ বঙ্গবন্ধুর মূর্যাল দুর্নীতি নিয়ে রিপোর্ট করি। বাজেট, বৃক্ষরোপণসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তথ্য চাই। প্রশাসন আমাকে তথ্য দেয় না বরং তথ্য চাওয়ায় এবং প্রকাশিত রিপোর্টের জন্য ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। বিভিন্নভাবে হুমকি দেয়। উপাচার্যও একাধিকবার খারাপ আচরণ করে। এমনকি আমার মেসে হামলার চেষ্টা হয় এবং সর্বশেষ অযৌক্তিকভাবে সাময়িক বহিষ্কার করা হয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।’
n যে কারণে ক্যাম্পাস সাংবাদিকতায়
ছোটোবেলা থেকে বাবার সাথে নিয়মিত পত্রিকা পড়ার অভ্যাস ছিল, সেখান থেকেই সাংবাদিকতার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা সম্পর্কে তেমন কিছু জানতাম না। এর মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতিতে সদস্য আহ্বান করা হয়। সাংবাদিক সমিতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি ইংরেজী দৈনিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ শুরু করি। কাজের শুরুর প্রথম দিকেই সমিতির পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়, এখানে কোনো দুর্নীতি বা সমস্যা নিয়ে রিপোর্ট করা যাবে না। রিপোর্টের পূর্বে প্রশাসনের অনুমতি নিতে হবে। অবাক হয়েছিলাম সেই সাথে মর্মাহত ও হয়েছিলাম। মনে হয়েছিল এ ধরনের সাংবাদিকতা অর্থহীন। কিন্তু এই অদ্ভুত সিস্টেম থেকে পালিয়ে যেতে চাইনি, সিস্টেমটা পরিবর্তন করতে চাচ্ছিলাম। সমিতির আরো কিছু সদস্যও পাশে দাঁড়ায়, তারাও চাচ্ছিলেন স্বাধীনভাবে সাংবাদিকতা করতে। সাহস করে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি নিয়ে রিপোর্ট করতে শুরু করি।
n সংবাদ সংগ্রহে ক্যাম্পাসে প্রতিবন্ধকতা
যখন একটি রিপোর্ট করতে যাই তখন দেখা যায় ভিক্টিমের বক্তব্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিষ্কার হওয়ার সম্ভাবনা এতোই বেশি যে ভিক্টিম তার সমস্যাগুলো প্রকাশ করতে চায় না। তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে আমাদের ওপর প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক হুমকি আসে। তবে আমি আমার আইন বিভাগ থেকে কখনো হুমকি পাইনি। কিন্তু প্রশাসন থেকে বহুবার হুমকি পেয়েছি।
n পরিবারের যেমন সাপোর্ট
পরিবার আমাকে সর্বোচ্চ সাপোর্টই দিচ্ছে। বাবা মা যথেষ্ট উদ্বিগ্ন ছিলেন বিষয়টি নিয়ে। তবে তারা আমার ওপর ভরসা রেখেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমার পরিবারের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে আমি বলেছি এখানকার বিষয়গুলো আমি ভালো বুঝি, সিদ্ধান্ত আমি নিব। সেক্ষেত্রে আমার পরিবার সিদ্ধান্ত আমার কাছেই ছেড়ে দিয়েছেন।
n আইডি হ্যাকিংয়ের কথাটা কতটা সত্য
আমি আইনের শিক্ষার্থী। এসব বিষয়গুলোর সাথে আমার সম্পর্ক কম। দেখুন তারা আমার বিরুদ্ধে তিনবার তিন রকমের অভিযোগ এনেছেন। প্রথমে তারা বললেন আমি আইডি হ্যাকিংয়ের হুমকি দিয়েছি, পরদিন বললেন আমি আইডি হ্যাক করেছি, সবশেষে বললেন আমি হ্যাকিংয়ের চেষ্টা করেছি। আর এমন একটি বহিষ্কারপ্রবণ বিশ্ববিদ্যালয়ে কেনইবা আমি আইডি হ্যাক করতে যাব? এটা সম্পূর্ণ মিথ্যে একটি অভিযোগ। আমার ওপর নিউজ সংক্রান্ত ক্ষোভের কারণেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এটি করা।
n কেবল দ্বিতীয় বর্ষে, বাকিদিনগুলো কতটা চ্যালেঞ্জিং
হ্যাঁ অবশ্যই চ্যালেঞ্জিং মনে হয়। বিষয়টি নিয়ে আমি খুব শঙ্কিত যে নতুন করে হুমকি আসে কি না। তবে সামনের দিনগুলোতেও আমি সত্যের পথেই থাকব।
n ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা
হ্যাঁ, সাংবাদিকতার প্রতি যথেষ্ট ভালোলাগা আছে। সাংবাদিকতা করে আত্মতৃপ্তি পাই, ক্রাইম রিপোর্টারদের কাজগুলোর প্রতি আমার একধরনের আকর্ষণ কাজ করে। ক্রাইম রিপোর্টার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই।
