জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সভ্যতার ক্ষতিসাধন করছে : প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০১:০৭

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমরা আমাদের সময়ের সব থেকে গুরুতর বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি রয়েছি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমবর্ধমানভাবে আমাদের সভ্যতার ক্ষতিসাধন করছে। এটি বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য অস্তিত্বের হুমকি। প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সকালে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের কনফারেন্স কক্ষে গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপটেশন (জিসিএ) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে একথা বলেন। কার্বন নিঃসারণ হ্রাস এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর বিভিন্ন উদ্যোগে অর্থায়নের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমি সকল দেশের প্রতি কার্বন নিঃসারণ নিয়ে তাদের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর এ সংক্রান্ত বিভিন্ন পদক্ষেপে অর্থায়নের আহ্বান জানাচ্ছি। তিনি বলেন, একটি অনিঃসারণকারী দেশ এবং সম্পদের সীমাবদ্ধতা এবং সামর্থ্যের স্বল্পতা থাকার পরেও বাংলাদেশ স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে তার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছে। এই বৈঠকের আয়োজক ছিলেন নেদারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুট। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড.এ কে আব্দুল মোমেন, পরিবেশ বন এবং জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, আমি বিশ্বাস করি আমাদের অংশীদারিত্বের অঙ্গীকার এমন একটি প্ল্যাটফরম সৃষ্টি করবে যেখানে উদ্ভাবনী এবং অভিযোজনমূলক বিভিন্ন পদক্ষেপসমূহ জলবায়ু পরিবর্তনের সহযোগিতামূলক বিভিন্ন কার্যপ্রণালি নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে।

শেখ হাসিনা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত আন্তঃসরকার প্যানেলের (আইপিসিসি) ৫ম মূল্যায়ন প্রতিবেদনে (এ আর-৫) পরিষ্কার বলা হয়েছে যে, কার্বন নিঃসারণ কার্যকরভাবে বন্ধ বা হ্রাস করা সম্ভব না হলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব বর্তমান শতাব্দীতে তীব্রতর হতে থাকবে। তিনি বলেন, সাম্প্র্রতিককালে আমাজনের জঙ্গলে আগুন এবং বাহামা দ্বীপপুঞ্জে ঘূর্ণিঝড় ডরিয়ান সমগ্র বিশ্বকে স্মরণ করিয়ে দেয় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কতটা বিধ্বংসী রূপ নিতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, পুরো ২০১৮ এবং ২০১৯ সাল জুড়েই জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্য এবং জীবনযাত্রা নির্বাহে জনগণের মাথা ব্যথার কারণ হয়েছিল। তিনি বলেন, আমরা দুটি ক্ষেত্রে সংগ্রাম করে যাচ্ছি। প্রথমত, ভবিষ্যতে কার্বন নিঃসারণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণে, দ্বিতীয়ত যেসব অঞ্চলে পর্যাপ্ত ক্ষতি সাধিত হয়ে গেছে সেখানে অভিযোজন ব্যবস্থা গ্রহণে। তিনি বলেন, কোটি কোটি মানুষের জীবন এবং জীবিকা ঝুঁকির মুখে থাকবে যদি আমরা এই দুটি ক্ষেত্রে সমানভাবে কাজ করতে না পারি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপটেশনের (জিসিএ) প্রতিষ্ঠার একটি অংশ হতে পেরে বাংলাদেশ আনন্দিত, যা অভিযোজন ব্যবস্থা উদ্ভাবন করতে এবং বিদ্যমান সেরা অনুশীলনগুলো পরস্পরের মাঝে ভাগ করতে সহায়তা করতে পারে। তিনি বলেন, আমরা জিসিএ-এর ঢাকা কার্যালয় স্থাপনের ঘোষণায় আরো আনন্দিত কেননা আমাদের অভিজ্ঞতা এবং অঙ্গীকার নিয়ে জিসিএ বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে বড়ো আকারের কার্যকর অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, এই অফিস অন্যান্য জিসিএ আন্তর্জাতিক অফিসসমূহের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হবে। অভিযোজন বিষয়ে তাদের সেরা অনুশীলনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, কমিশনের জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত ঢাকা বৈঠক সেই অপার সম্ভাবনাই দেখিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের সর্ববৃহত্ ব-দ্বীপ, এটি জলবায়ু পরিবর্তনে এবং পানিজনিত বিভিন্ন হুমকি এবং চ্যালেঞ্জের কারণে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি বলেন, সেক্ষেত্রে জলবায়ুর চরমভাবাপন্ন বৈরী আচরণ এবং পরিবেশের অবনমন আমাদের টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনকে আরো চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

ব-দ্বীপ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনাকে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নেদারল্যান্ড সরকারের সহযোগিতায় বাংলাদেশ ডেল্টা পরিকল্পনা-২১০০ প্রণয়ন করেছে। তিনি বলেন, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নীতি এবং অঙ্গীকার টেকসই ব-দ্বীপ বাস্তবায়নে। ডেল্টা ম্যানেজমেন্ট অ্যাপ্রোচ গ্রহণের মাধ্যমে পরিবেশের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্যই এই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

ডেল্টা পরিকল্পনা-২১০০র স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা জিসিএ বাংলাদেশ, এটির সফল বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক সেরা অনুশীলন এবং অর্থসংস্থান করতে কাজ করবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

‘ভ্যাকসিন হিরো’ পুরস্কারে  ভূষিত হলেন প্রধানমন্ত্রী

টিকাদানে সাফল্যের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাংলাদেশের

দৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও ধারাবাহিকতা ধরে রেখে টিকাদানের মাধ্যমে শিশু রোগ নির্মূলে সফলতার জন্য মর্যাদাপূর্ণ ‘ভ্যাকসিন হিরো’ পুরস্কার পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। স্থানীয় সময় সোমবার নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনেশন এবং ইমুনাইজেশন (জিএভিআই) এই পুরস্কার প্রদান করে। প্রতিবছর টিকাদান কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিত থাকার ঘটনা নজিরবিহীন বলে             পুরস্কারের সাইটেশনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বিশ্বব্যাপী টিকাদান সংস্থা জিএভিআই বোর্ড সভাপতি ড. এনগোজি অকোনজো ইবিলার কাছ থেকে এই পুরস্কার গ্রহণ করে প্রধানমন্ত্রী তা বাংলাদেশের জনগণের জন্য উত্সর্গ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ যে পুরস্কার গ্রহণ করলাম সে পুরস্কার আমার নয়। এটা বাংলাদেশের জনগণের এবং আমি তাদেরকেই এই পুরস্কার উত্সর্গ করলাম। একইসঙ্গে তিনি দেশবাসীর প্রতি তাদের শিশুদের সুস্বাস্থ্যের জন্য টিকাদান কর্মসূচি অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আগামীর শিশুরা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে দেশ পরিচালনা করবে এবং দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সুস্বাস্থ্যের অধিকারী প্রজন্মের অত্যন্ত প্রয়োজন। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী নতুন প্রজন্মই কেবল পারে জাতির পিতার স্বপ্নের উন্নত-সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে,’—যোগ করেন তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘দেশ থেকে পোলিও, কলেরাসহ বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি দূর করা হয়েছে এবং এই বিষয়ে ‘জিএভিআই’র সহযোগিতা আমরা পাচ্ছি।’ এ প্রসঙ্গে তিনি রূপকল্প ২০২১ এবং ২০৪১ অনুযায়ী সবার জন্য মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা ও পরিপূর্ণ পুষ্টি নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

জিএভিআই বোর্ড সভাপতি ড. এনগোজি অকোনজো ইবিলা শেখ হাসিনার হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার আগে একটি সাইটেশন পাঠ করেন। জিএভিআইর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সেথ বার্কলেও অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন এবং স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক এসময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিমসহ প্রধানমন্ত্রীর অন্য সফরসঙ্গীরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৪তম অধিবেশনে দিনের শুরুতেই বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে তিনি কমিউনিটি হেল্থ ক্লিনিকের মাধ্যমে কীভাবে স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে গেছে বাংলাদেশ তা বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছে তুলে ধরেন।