এডিস মশা নিধনে মানহীন কীটনাশক ব্যবহারসহ মশার ওষুধ ক্রয়ে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম হয়েছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি। সংস্থাটির দাবি, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের অনিয়ম ও সমন্বয়হীনতার কারণে তা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। মশক নিধনে কীটনাশক ক্রয়ে যথাযথভাবে সরকারি ক্রয়নীতি অনুসরণ না করা, অকার্যকর ওষুধ কেনা এবং সঠিক কর্মপরিকল্পনা না থাকার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনাসহ ডেঙ্গু প্রতিরোধ এবং এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ১৫ দফা সুপারিশও করেছে সংস্থাটি। গতকাল বুধবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে ‘ঢাকা শহরে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়।
টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়, কর্তৃপক্ষ ডেঙ্গুর প্রকোপ রোধে আগাম পূর্বাভাসকে গুরুত্ব দেয়নি। আইসিডিডিআরবির গবেষণা পদ্ধতি ও গবেষণা করার এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলে কীটনাশক সহনশীলতা পরীক্ষা না করেই ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন যথাক্রমে ১৪ কোটি ও ১৭ কোটি ৩৯ লাখ টাকার কীটনাশক ক্রয় করে।
প্রতিবেদনে উভয় সিটি করপোরেশনেই উপযুক্ত কীটনাশক নির্ধারণ না করার অভিযোগ করা হয়েছে। এছাড়া বিশেষজ্ঞ ছাড়াই কীটনাশক নির্ধারণ, উপযুক্ত কীটনাশক নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের গবেষণাকে আমলে না নিয়ে একই কীটনাশক বারবার ক্রয়, এক সিটি করপোরেশনের কালো তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য সিটি করপোরেশনের বাতিল করা কীটনাশক ক্রয় এবং পরিকল্পনা ছাড়াই কীটনাশকের মেশিন ক্রয় করার অভিযোগ করেছে টিআইবি।
তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, কীটনাশক ক্রয়ের বিল উত্তোলন থেকে শুরু করে গুদামে পণ্য সরবরাহ পর্যন্ত ধাপে ধাপে কমিশন আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। দুই সিটি করপোরেশনেরই কীটনাশক প্রতিরোধী ক্ষমতা পরীক্ষা করানো বা কীটনাশক পরিবর্তন করার কোনো উদ্যোগ ছিল না। তাদের নিজস্ব কোনো ল্যাবরেটরি ও কীটতত্ত্ববিদ নেই। প্রতিবেদনে আরো জানানো হয়, ২০১৮ সালে উত্তর সিটির ৬৫২টি মেশিনের মধ্যে অর্ধেক মেশিন নষ্ট ছিল। বর্তমানে জরুরি পরিস্থিতিতে নতুন কিছু মেশিন ক্রয় করা এবং কিছু মেশিন মেরামত করা হলেও এখনো ৪০-৪৫টি মেশিন নষ্ট। ডিএসসিসির ৯৪০টি মেশিনের মধ্যে ৪২৮টি নষ্ট ছিল। অধিকাংশ নষ্ট মেশিনের যন্ত্রাংশ বাংলাদেশে পাওয়া যায় না।
টিআইবি জানায়, দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সরকারি প্রতিষ্ঠান নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডকে প্রতি লিটার কীটনাশক ৩৭৮ টাকায় সরাসরি কেনার কার্যাদেশ দেওয়ায় প্রতি লিটার কীটনাশক ক্রয়ে ১৬১ টাকা ক্ষতি হয়েছে। সংস্থাটি লিমিট এগ্রো প্রোডাক্ট নামে যে প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এই কীটনাশক ক্রয় করে, সেই একই প্রতিষ্ঠান উত্তর সিটির উন্মুক্ত দরপত্রে প্রতি লিটারের দর ২১৭ টাকা প্রস্তাব করে। এই হিসাবে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কীটনাশক বাবদ মোট ক্রয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। টিআইবি জানায়, দুই সিটির কীটনাশক ও ফগার মেশিনের জ্বালানি ব্যবহার না করে বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়; লার্ভিসাইড ব্যবহার না করে ফেলে দেওয়া হয়। ভবনের নিচতলায় বা গ্যারেজে ফগিং করার জন্য টাকা নেওয়া হতো। এ বছরের ব্যাপক প্রাদুর্ভাবের আগে এডিস মশার উত্স নির্মূলের জন্য কোনো কার্যক্রম নেওয়া হয়নি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কীটনাশক ক্রয়ের প্রতিটি ধাপে দুর্নীতি হয়েছে। এতে রাষ্ট্রীয় অর্থের ব্যাপক অপচয় হয়েছে। একটি ক্ষেত্রে ক্রয়মূল্যের আনুমানিক ৪০ শতাংশ ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যয় করা হয়েছে।
