যেসব এলাকা আজ হানাদারমুক্ত হয়

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০১৮, ২২:০৪

ইত্তেফাক ডেস্ক

আজ ১১ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এই দিনে দেশের বিভিন্ন এলাকা পাকিস্তানি হানাদারমুক্ত হয়। মুক্ত এলাকায় উড়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। মুক্ত দিবস উপলক্ষে নেওয়া হয়েছে নানা কর্মসূচি। এ বিষয়ে আমাদের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবরঃ

টাঙ্গাইল :আজ টাঙ্গাইল হানাদারমুক্ত দিবস। টাঙ্গাইলের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে বাংলার সূর্যসেনারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কবল থেকে টাঙ্গাইলকে মুক্ত করে উত্তোলন করেন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। দিনটিকে স্মরণ করে টাঙ্গাইলবাসী তাই এখনো আনন্দে উদ্বেলিত হয়; বাঁধভাঙা আনন্দের স্রোত বয়ে যায় টাঙ্গাইলে। এখানকার অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসিকতাপূর্ণ যুদ্ধের কাহিনি দেশের সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে। বীর মুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে গঠিত ও পরিচালিত ‘কাদেরিয়া বাহিনী’র বীরত্বের কথা স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। খন্দকার আবদুল বাতেনের নেতৃত্বে গঠিত ‘বাতেন বাহিনী’ও অনেক জায়গায় হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। চারদিক থেকে আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়ে পাকবাহিনী। ১০ ডিসেম্বর বিকেলে টাঙ্গাইল শহরের অদূরে পৌলিতে মিত্রবাহিনীর প্রায় দুই হাজার ছত্রীসেনা অবতরণ করায় হানাদারদের মনোবল একেবারেই ভেঙে পড়ে। তারা ছুটতে থাকে ঢাকার দিকে। ১১ ডিসেম্বর ভোর থেকে বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধারা শহরে প্রবেশ করতে থাকেন। টাঙ্গাইল শহর শত্রুমুক্ত হয়।

লাকসাম (কুমিল্লা):১৯৭১ সালের এ দিনে পাকিস্তানি সৈন্যদের হটিয়ে লাকসাম-মনোহরগঞ্জকে শত্রুমুক্ত করে মুক্তিবাহিনী। ১৫ এপ্রিল পাক সেনারা লাকসামকে তাদের দখলে নিয়ে রেলওয়ে জংশনের পাশে থ্রি-এ সিগারেট ফ্যাক্টরিতে ক্যাম্প স্থাপন করে। এ ক্যাম্প থেকে পাকবাহিনী লাকসামসহ ফেনী, চাঁদপুর, নোয়াখালী ও কুমিল্লার দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় অত্যাচার, নির্যাতন, খুন, ধর্ষণ ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালাত। এদিকে মুক্তিযোদ্ধারা ভারতে ট্রেনিং শেষে সংগঠিত হয়ে পাক সেনাদের ওপর আক্রমণ চালাতে থাকে। এতে পাক সেনাদের সঙ্গে লাকসামসহ আশেপাশের এলাকায় মুখোমুখি যুদ্ধ শুরু হয়। এক পর্যায়ে পাকবাহিনী পরাজিত হয়ে চাঁদপুরের দিকে পালাতে থাকে। ১১ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিপাগল জনতা বাংলাদেশের লাল সবুজ জাতীয় পতাকা উড়িয়ে লাকসামকে মুক্ত ঘোষণা করেন। পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণের পর লাকসামে শুরু হয় মুক্তিকামী জনতার উল্লাস।

পীরগাছা (রংপুর):৬ ডিসেম্বরে বীর মুক্তিযোদ্ধারা পীরগাছা থানাকে শত্রুমুক্ত করার জন্য এর চারপাশে অবস্থান নেয়। ওইদিন বিকালে মুক্তিযোদ্ধারা চৌধুরাণী হাইস্কুল মাঠে অবস্থান নিলে পাকহানাদার বাহিনী সংবাদ পেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর আক্রমণ চালায় এবং ডিনামাইড দিয়ে চৌধুরাণী রেল স্টেশনটি উড়িয়ে দেয় ও আশে-পাশের বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ করে। পাকবাহিনী পিছু হটে রংপুর যাওয়ার পথে লোহার ব্রিজ সংলগ্ন ঘাঘট নদীর তীরে অবস্থানরত অপর একটি মুক্তিযোদ্ধা দল তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এ সময় আব্দুল মজিত নামের এক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং পাকবাহিনীর অনেক সদস্য হতাহত হন। অবশেষে ১১ ডিসেম্বর ভোরে মুক্তিযোদ্ধারা পীরগাছা থানা ঘেরাও করলে অবস্থা বেগতিক দেখে রাজাকার-আলবদরসহ ১৭ জন পাকসেনা আত্মসমর্পণ করেন এবং ওই দিন তাদেরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এভাবে পীরগাছা উপজেলা শত্রুমুক্ত হয়।

নাঙ্গলকোট (কুমিল্লা):১৯৭১ সালের এইদিনে বীর মুক্তিযোদ্ধারা জীবনবাজি রেখে পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার-আলবদরদের কবল থেকে নাঙ্গলকোটের বিভিন্ন এলাকা দখলমুক্ত করে। নাঙ্গলকোট হানাদারমুক্ত হলে ওইদিন মুক্তিযোদ্ধাসহ সর্বস্তরের জনগণ নাঙ্গলকোট সদরসহ বিভিন্ন স্থানে বিজয় উল্লাসে মেতে ওঠে।

হাকিমপুর (দিনাজপুর):১৯৭১ সালের এইদিনে পাকবাহিনীর সঙ্গে প্রচণ্ড সম্মুখযুদ্ধে শাহাদত বরণ করেন ৩৪৫ জন ভারতীয় মিত্রবাহিনীসহ মুক্তিযোদ্ধারা। অবশেষে ১১ ডিসেম্বর শত্রুমুক্ত হয় হিলি সীমান্ত এলাকা। দিবসটি পালনে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এদিকে সম্মুখযুদ্ধে শাহাদত বরণকারীদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হয়েছে “সম্মুখসমর”।

আশুগঞ্জ (ব্রাহ্মণবাড়িয়া):একাত্তরের এইদিনে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী যৌথভাবে সশস্ত্র সম্মুখ যুদ্ধের মাধ্যমে পাকহানাদার বাহিনীকে বিতাড়নের মধ্যদিয়ে আশুগঞ্জকে শত্রুমুক্ত করে। তত্কালীন লে. কর্ণেল কে.এম. সফিউল্লাহ, লে. মোঃ হেলাল মোর্শেদ খান, মেজর আইনউদ্দিন ও মেজর নাসির প্রমুখ বীর সেনানীর সুসংগঠিত নেতৃত্ব সর্বস্তরের বীর জনতা পাক সামরিক জান্তার কবল থেকে আশুগঞ্জকে মুক্ত করে। আশুগঞ্জকে মুক্ত করতে গিয়ে সেদিন পাকহানাদারদের সঙ্গে যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন সুবেদার মেজর সিরাজুল ইসলাম, ল্যান্স নায়েক আব্দুল হাই, সিপাহী কফিলউদ্দিন, মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহেরসহ আরও অনেকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার অধিকাংশ এলাকা মুক্ত হওয়ার পর একাত্তরের ৮ ডিসেম্বর ভারতীয় ট্যাঙ্কবাহিনী বর্তমান আশুগঞ্জ উপজেলার তালশহর গ্রাম দিয়ে আশুগঞ্জ সদরে প্রবেশ করে। সোহাগপুরের ভয়াবহ যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর তিনটি ট্যাঙ্ক ধ্বংস হয়। শেষ পর্যন্ত মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর ভয়াবহ আক্রমণে টিকতে না পেরে ১০ ডিসেম্বর দুপুরের পর থেকে পাকসেনারা পালিয়ে যেতে শুরু করে। ১১ ডিসেম্বর ভোরে আশুগঞ্জ শত্রুমুক্ত হয়।

নান্দাইল (ময়মনসিংহ):১৯৭১ সালের এইদিনে নান্দাইল থানা পাকিস্তানি হানাদার মুক্ত হয়। নান্দাইল থানা তিনদিক ঘিরে রয়েছে নরসুন্দা নদী। নান্দাইলের যুবক ফারুকের নেতৃত্বে ওসমান, কাইয়ুম, সাহেদ আলী, ফজলু ও নূরু নান্দাইল থানায় প্রথম পদার্পণ  করে রাত ১২টার দিকে প্রথম স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করে। তাই এ দিনটি গণ্য করা হয় মুক্তদিবস হিসেবে।