জীবনানন্দের কালের অব্যবহিত পরে বাংলা কবিতায় বক্তব্যধর্মিতা এবং জীবনঘনিষ্ঠতার যে রূপ প্রকাশ পেতে থাকে, তার সরল সহযাত্রী আবদুল মান্নান সৈয়দ। বাংলাদেশের কবিতায় তিনি নিজেই একটি পথ সৃষ্টি করছিলেন। আবদুল মান্নান সৈয়দ দার্শনিক কবি। ষাটের দশকে ব্যতিক্রমী কাব্যভাবনা আর শিল্পের কাঠামো নির্মাণের সমকালীন নতুন প্রত্যয় নিয়ে আবির্ভাব তার। আবেগ আর আকাঙ্ক্ষা তার লেখকজীবনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে আছে। তবে সৃজনশীল ভুবনে তিনি শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধ। তার কোনো কোনো শব্দের নির্বাচন ও প্রয়োগ মনে করিয়ে দেয় কবিতার শুদ্ধ স্বভাব ও সৃষ্টিধর্মিতাকে। সৃজনশীল এবং মননশীল উভয় ধারাতেই তিনি চিন্তা-প্রজ্ঞা আর শ্রমের স্বাক্ষর রেখেছেন। প্রচুর লিখেছেন। প্রচুর খেটেছেন। বিষয়ের অভিনবত্ব এবং পরিবেশনশৈলীর প্রতি বিশেষ অভিনিবেশ সমকালীন কবিতার ধারায় তাকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে। মান্নান সৈয়দের নতুন স্বর তখন অনেকের কাছেই আকর্ষণ ও আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। তার কবিতাবিশ্ব কিংবা কবিতাদর্শন বাংলা সাহিত্যের সাধারণ পাঠক ও গবেষকের নিবিড় অভিনিবেশের দাবি রাখে।
১৯৫৯ সালে ইত্তেফাক সাহিত্য সাময়িকী পাতায় ‘সোনার হরিণ’ নামে কবিতা প্রকাশের মাধ্যমে তার কাব্যজগতে পদার্পণ। এরপর ‘স্বাক্ষর’, ‘কালবেলা’, ‘সমকাল’, ‘সাম্প্রতিক’, ‘কণ্ঠস্বর’, ‘আসন্ন’, ‘ছোটগল্প’, ‘কালান্তর’, ‘বিপ্রতীক’—এসব লিটল ম্যাগাজিনে ছাপা হতে থাকে তার কবিতা। অল্পকালের মধ্যেই লিটলম্যাগের পরিচিত কবি হয়ে ওঠেন তিনি। তার শেষ কাব্য ‘ঘুমের ভেতরে নিদ্রাহীন’ কবির মৃত্যুর পর ২০১২ সালে বাজারে আসে। ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’ প্রকাশের পর গভীর ঘোর ও উন্মাদনাকে আশ্রয় করে তিনি এক এক করে লিখেছেন ২৫টি কবিতার বই। আর শুধু কবিতা কেন, তিনি দুই হাতে লিখেছেন ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, জীবনী, স্মৃতিকথা, ডায়েরি। এছাড়া, গ্রন্থ-পুস্তিকা-স্মরণিকা সম্পাদনায় তিনি অর্জন করেছেন বিরল ও ঈর্ষণীয় খ্যাতি ও সাফল্য। পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নেও তার সৃজনশীল মন ও মননের পরিচয় পাওয়া যায়। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’ (১৯৬৭) পাঠকমহলে ও সমালোচকদের বিপুল প্রশংসা পায়। শুধু কবিতা নয়, পরবর্তীকালে গল্প-উপন্যাসের জন্যও তিনি আলোচিত হন। অন্যদিকে প্রবন্ধ-গবেষণায়ও তিনি তার স্বাতন্ত্র্যের স্বাক্ষর রাখেন। অর্ধশতাব্দীর বিরতিহীনভাবে অধিককাল শিল্প-সাহিত্যের চর্চায় নিমগ্ন ছিলেন তিনি; সাহিত্যের সৃজনশীল এবং মননশীল—এই দুই প্রবাহেই অবাধ-নিরলস অগণন প্রহর যাপন করেছেন। আবেগ আর প্রচেষ্টা ছিল কঠিনতম এই অভিযানে তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। শিল্পের সুতোয় যেমন তিনি গেঁথেছেন জীবনের গল্প ও জাগতিক চিন্তা, তেমনি সাহিত্যের উদার দরোজায় দাঁড়িয়ে অনবরত অবলোকন করেছেন সমূহ সৌন্দর্য আর বহুবর্ণতার বৈচিত্র্য। ছোটকাগজ-বড়োকাজ, কমগুরুত্বপূর্ণ-বেশিগুরুত্বপূর্ণ বলে তাঁর কাছে কিছু ছিল না; বরং এই সৈয়দের হাতে পড়ে অনেক সামান্য বিষয়ও অসামান্য হয়ে উঠেছে; লাভ করেছে অপরিহার্যতার মর্যাদা। সৃজনশীলতায় তিনি অন্বেষণ করেছেন মনোজগতের নিবিড় আলো-বাতাস; আর গবেষণাকর্মে ছিলেন স্থিতধী। বহুধা প্রসারিত পরিসর ও পথে তার সমকালে আর কাউকে বিচরণ করতে দেখা যায়নি। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি এক অবিশ্রান্ত ও অভিজাত অভিযাত্রী। আপাদমস্তক সাহিত্যব্রতী ও শিল্পনিমগ্ন এই মানুষটি পেশাগতভাবে শিক্ষকতায় নিয়োজিত থাকলেও ব্যক্তিগতভাবে ছিলেন নির্বিরোধী মানবতাবাদী সমাজচিন্তক। প্রসঙ্গত, একটি কবিতার পাঠ নিচ্ছি—
একি, আপনি বাজারে? কবিসাহেব, আপনিও কি বাজার করেন?
হ্যাঁ, আমাকেও বাজার করতে হয়,
আমাকেও তেল-নুন-মাংসের হিশেব কষতে হয়—
আমি নই বায়ুভুক রবীন্দ্রনাথ।
কবিতাকেও হতে হয় পৌরুষেয়—
শুধু নারীলাবণিগ্রস্ত নয়।
বস্তুর সংঘর্ষে জ্বলে উঠতে হয় আগুনের মতো।
জীবনানন্দকেও একদিন খালি গায়ে দুই হাতে দুই ভরা পানির বালতি
বয়ে নিয়ে যেতে দেখেছিলেন
অনুজ কবি আলোক সরকার আর অন্ধকার রায়
(আলোক সরকার আর অন্ধকার রায়)
যে পরাক্রমশালী কবি হিসেবে আরম্ভ করেছিলেন আবদুল মান্নান সৈয়দ, তাতে প্রথম থেকেই সংযম ছিল তার। ২০০২ সালে, পরিণত বয়সে দাঁড়িয়ে প্রকাশ করেন নিজের ‘কাব্য সংগ্রহ’। মান্নান সৈয়দ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কবিতার ভুবন থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করেননি। তবে কেউ কেউ মনে করেন মৃত্যুর আগেই তার কবিতার মৃত্যু হয়েছিল। তার মৃত্যুর পর একটি লিটলম্যাগ সম্পাদকীয়তে লেখে—‘কবি আবদুল মান্নান সৈয়দের মৃত্যু হয়েছে, অথবা বলা যায় তিনি দ্বিজ, আবার জন্মেছেন। শুরু করেছিলেন জন্মান্ধের পবিত্র উগ্রতা নিয়ে, শেষ করেছেন বন্দির নীরব বশ্যতা দিয়ে।’ কবিতার ছাত্র ও সাহিত্যের এক অধ্যাপকের ভাষ্য—‘কবিতা লেখার ধারা ও ধার তাঁর দুটোই পড়ে গিয়েছিল।’ এ-বিষয়ে কবির একটি বিবৃতিও স্মরণ করা যেতে পারে—‘আমি অন্তত আবেগাক্রান্ত না-হয়ে কবিতা লিখতে পারি না— এবং নিরাবেগ কবিতাকে কবিতা হিশেবে মূল্য দিতে চাই না।’ জীবনের শেষপ্রান্ত যেহেতু আবেগের ভাটার কাল, তাই এই সময় কবির কম কবিতা লেখা কিংবা কবিতার দিকে মনোযোগ স্থাপন না করার ঘটনা ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক। কাজেই উত্তর-জীবনে তিনি বেশি পরিচিতি পেয়েছেন গবেষক ও প্রাবন্ধিক হিসেবে। বিশেষত সংকলন-সম্পাদনায় তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশে প্রায় অবিকল্প ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
মান্নান সৈয়দের কবিতার প্রধান প্রবণতা হলো—আধুনিকতা ও নান্দনিকতার বহুমাত্রিক নিরীক্ষা। কথনশৈলী হিসেবে গদ্যকে আশ্রয় করে তিনি শুরু থেকেই পাঠক-সমালোচকের নজরে আসেন। চেতনানিমগ্ন এই শিল্পীর বাস্তবিক অর্থে কোনো প্রতিযোগী ছিল না; কাউকে অতিক্রম করতে হয়নি—তিনি যুদ্ধ করেছেন, প্রতিযোগিতায় নেমেছেন শুধু নিজের সাথে। বিশ শতকের ষাটের দশকের এই লেখক মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে খুব দ্রুত নিজের জায়গাটি স্পষ্ট করে তুলতে সমর্থ হয়েছেন। কল্পনার প্রখরতা আর নান্দনিক বোধ তাকে সাধনার শিখর-স্তরে আরোহণে সর্বোতভাবে সহায়তা করেছে। ব্যক্তিগত অনুভূতির চঞ্চল-স্বভাব তাকে স্থির থাকতে দেয়নি—ক্রমাগত তাড়িয়ে বেরিয়েছে দিক থেকে দিগন্তে, স্থান থেকে বিভূঁইয়ে। বিবরণে সতত আত্মপ্রতিফলন তার বিবেচনাধর্মের সবচেয়ে দৃশ্যমান ধারা। আমিত্বের অহংকারে অবগাহন করেও যে শিল্প-সাহিত্যের সত্য ও তত্ত্ব অনুসন্ধান করা চলে, তা মান্নান সৈয়দ আমাদেরকে শিখিয়ে গেছেন।
নিয়মিত দিনলিপি-রাতলিপি লিখতেন তিনি; অভিজ্ঞতা ও অর্জনের ভারে ক্লান্ত না হয়ে কাজের শান্তি ও সহজতাকে খুঁজে পেতে চেয়েছেন সবসময়। প্রাত্যহিক জীবনের সাথে শিল্পের বিষয় ও শৈলীকে মিলিয়ে দেখতে দেখতে কখন যে মহাসমুদ্রের গভীরে প্রবেশ করেছেন হয়তো নিজেই টের পাননি! তথ্য আর তত্ত্ব—এই উভয় নৌকার পাটাতনে পা রেখে খোলাদৃষ্টি প্রসারিত রেখেছেন দূর এবং অদূরের সব অনুভব ও অন-অনুভবের বিষয়াদিতে। জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ হাতে নিয়ে এবং পাঠকের হাতে সমর্পণ করে শিল্পভুবনে যে অভিযাত্রা আরম্ভ করেছেন তিনি, সংবেদনশীলতার জলতরঙ্গ পার হয়ে, মৃত্যুপথযাত্রী হবার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত জন্মের দায় আর দায়িত্বের ভার বহন করে গেছেন কারিগর ও শ্রমিকের কাতারে দাঁড়িয়ে। নীরবতার গভীরতা কিংবা প্রাজ্ঞতার প্রবলতা তিনি অতিক্রম করেছেন পরম অবহেলায়—নির্মোহতার সমর্পিত সত্তায় আরোহণের মাধ্যমে। কবিতার পাগলামি কিংবা গদ্যের মাদকতা—কোনোটিই তার সৃজনধারাকে সাধারণের পাটাতনে আটকে রাখতে পারেনি; বাঁক বদলে বদলে তিনি অসাধারণের সারিতে সামিল হয়েছেন শেষপর্যন্ত। হাতের তালুতে মহাদেশের বিশালতাকে ধারণ করে যে সাহিত্যসেবক পথ চলেছেন, পরিভ্রমণ করেছেন পরিচিত-অপরিচিত ভাবনারাজির অতলে, তাকে তো আর যা-ই হোক, খুব সহজে ভুলে যাওয়া চলে না!
কবিতা এবং কাহিনি নির্মাণে আবদুল মান্নান সৈয়দ, নগরজীবনে পেছনে পড়ে-থাকা সতত প্রবহমান, গ্রামজীবনের সরলতাকে আশ্রয় করেছেন চিরায়ত বস্তুবিশ্বের সত্যাসত্যকে স্বীকার করবার জন্যে। তার নিরীক্ষায় বারবার ধরা পড়েছে মানুষের মনোবিকলনের সূত্রাবলি। তাই তাকে মননশীল মানুষের মনোভুবনের ভাষ্যকার বললে বোধকরি বাড়িয়ে বলা হবে না। অস্তিত্ববাদী এই কথাকারিগর আশার ভেলায় সারাজীবন ভেসে ভেসে অবশেষে জীবনের শেষবেলায় হতাশা আর ক্লান্তির কঠিন পথে বিষণ্ন মুখে চোখ স্থির রেখেছেন জীবনকেই নতুন করে অনুভব করবার প্রয়োজনে। সত্যের মতো বদমাশ সময়ের প্রহর পাড়ি দিয়ে মৃত্যুর অধিক যন্ত্রণাকে বুকে ধারণ করে, হায়েনাদের নখের তীব্রতাকে অতিক্রম করে রূপকথা আর ভাত-মাছ-মাংস সুবাসিত প্রাত্যহিক যাপিত প্রহর উদ্যাপন এবং উপভোগ করেছেন আবদুল মান্নান সৈয়দ। কবিতা-গল্পে সংসারের চারপাশের দৃশ্যাবলি, প্রেম-অশান্তি আর শ্রান্তি ও প্রশান্তির ভাববলয় নির্মাণ করেছেন তার পাঠকের জন্য। একটি কবিতার পাঠ থেকে জেনে নিচ্ছি কবির স্বগতোক্তি—
কি— মুশকিল! একটা কবিতা আসছে নাতো;— কত
কবিতা লিখেছি; হঠাত্ একি হলো; কবিতা আর যেন
আসে না, আসতে চায় না, হাত ধরে টেনে আনতে হয়।
আ,— স্রোতের মতো কবিতা, জোয়ারের মতো কবিতা,
যখন আসে আমাকে-সুদ্ধ ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চায়,
কবিকে ভাসিয়ে নেয় কবিতা : কি-আশ্চর্য, কি-
আশ্চর্যসুন্দর ঘরে-বসে বসে ধ্যান করছি কবিতার, কিন্তু
কই? নাকি নদী মজে গেল, চর পড়ে গেল, আর গর্ভবতী
হয়ে উঠবে না পাড়-ভাসানো পানির চাপে। ন্নাহ্, কবিতা
চাঁদ নয় যে রাত হলেই জাগবে, কবিতা সূর্য নয়
যে ভোর হলেই দেখা দেবে। কবিতা নিয়ম মানে না :
তার কল্যাণে সাগরের পানির উপর দিয়ে মানুষ-মানুষী
হেঁটে যেতে পারে।
(জ্যোত্স্না রৌদ্রের চিকিত্সা)
জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ-তে সার্বিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট চেতনা। কিন্তু প্রচলিত কোনো দর্শন বা আদর্শে সমর্পিত থাকেননি মান্নান সৈয়দ। তিনি অবিশ্বাসী ছিলেন প্রেমে, ধর্মে, অনুতাপে, চিত্কারে। পাশ্চাত্য চিন্তা এবং নিজস্ব বোধের সংমিশ্রণে তিনি নির্মাণ করেছিলেন এক স্বতন্ত্র কাব্য-পরিমণ্ডল। তার কবিতার অবয়ব-পরিসরে-সংস্থানে যে কারণে দেখা যায় বিচিত্র চিত্রার্পণের ছায়া, প্রকাশের স্বচ্ছন্দ বাসনার বিপুল প্রতিফলন। আবদুল মান্নান সৈয়দের কবিতার উত্স ব্যক্তিগত একাকীত্ব, নিঃসঙ্গতা, ভাবুকতা, স্বপ্ন ও নিশির ডাক। তিনি সুন্দর-কুিসত অজস্র অভিজ্ঞতায় পূর্ণ বিপুল জীবন যাপন করেছেন।
রাজনৈতিক চেতনা দ্বারা প্রভাবিত থাকলেও তিনি সক্রিয় রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন না। কবিতাকে তিনি রাজনৈতিক বক্তৃতার মঞ্চ বানাতে চাননি। তবে, তারও ছিল রাজনৈতিক দর্শন বা বিশ্বাস। যে রাজনৈতিক মত বা অভিমতের প্রতি আস্থাশীল ছিলেন মান্নান সৈয়দ, তা থেকে হয়তো কবিতার শক্তি ও প্রণোদনা সংগ্রহ করেছেন। কখনো কখনো উপাদান হাতিয়েছেন। চিন্তা প্রয়োগ কিংবা শব্দ নির্বাচনে মাঝে মধ্যে তাকেও ভর করতে হয়েছে রাজনৈতিক দর্শনের ওপর। কিন্তু সর্বোপরি তিনি রাজনীতি আর সমাজনীতির মিশেলে তৈরি করেছেন কবিতা-শিল্পেরই সব অনন্য বাতায়ন ও বাগান। তিনি সমকালীন সমাজ-বাস্তবতাকে ধারণ করেন প্রাতিস্বিক শিল্প-প্রভায়। চারদিকে হতাশা, শিল্প-বিরূপ মনোভাব, রাজনীতির দুর্বিনীত আধিপত্য, লাভ ও লোভের অস্বাভাবিক সম্প্রসারণ ও ব্যাপক প্রভাব দেখে দেখে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। পারিবারিকভাবে অবৈষয়িক এই কবি তখন লিখলেন—
এখানে কবিতা বানানো হয়।
সব ধরনের কবিতা।
রাজনীতির কবিতা, সামাজিক কবিতা।
আধ্যাত্মিক কবিতা, পার্থিব কবিতা।
নাগরিক কবিতা, গ্রামীণ কবিতা।
প্রেমের কবিতা, শরীরের কবিতা।
স্বপ্নের কবিতা, বাস্তবের কবিতা।
(কবিতা কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড)
মান্নান সৈয়দ শব্দ ও চিত্রকল্প নির্মাণের ভেতর দিয়ে এঁকেছেন চলমান সমাজ ও নির্মীয়মান সভ্যতার রূপ। যেমন তার কবিতায় কখনো কখনো জ্যোত্স্না হয়েছে সভ্যতার সামগ্রিক ছবির প্রকাশ-মাধ্যম। জ্যোত্স্না সবসময় লোকেদের চোখে মুগ্ধকর হলেও পারিপার্শ্বিক ঘটমানতার অভিঘাতে তা-ও বদলে যেতে পারে। সংবেদনশীল কবি দেখতে পান সেই যন্ত্রণার অপ্রকাশ ভাষাশিল্প। মান্নান সৈয়দ অনুভব করেছেন অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যত্ যেন প্লাবিত হয় জোছনার গলমান কাফনে। সত্তার অতলে জমে ওঠে নৈঃসঙ্গ্যের নিবিড় জল। তখন চন্দ্রহীন রাত শুধু নয়, দিনের আলোতেও মনে হয় মানুষ বিশাল বিরান প্রান্তরে জ্যোত্স্নায় কেবলই আর্দ্র হয়ে উঠছে প্রবল আতঙ্কের উত্স ও ধারার নিরন্তর গতিপথে। লিখছেন সে-কথা—‘জ্যোত্স্না কী?—না। জ্যোত্স্না হয় জল্লাদের ডিমের চুলহীন জলবায়ুহীন মুণ্ড, জোড়া-জোড়া চোখ, সাতটি আঙুলের একমুষ্ঠি হাত, রক্তকরবীর অন্ধকার, এবং একগুচ্ছ ভুল শিয়ালের সদ্যমৃত যুবতীকে ঘিরে জ্বলজ্বলে চিত্কার ’
রাজনীতি কখনো কখনো কবিকে, মানবতাকে বিপন্ন করে। যদিও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনীতির বড় প্রয়োজন। আর কবিকে পৃষ্ঠাপোষকতা করার তো রাষ্ট্র ও রাজনীতি বিরাট প্লাটফরম। মান্নান সৈয়দের কবিতায় প্রচ্ছন্নভাবে আছে রাজনীতি। প্রবল শক্তির বিরুদ্ধে সাধারণের সংগ্রামকে কীভাবে যাপন করেছে বাঙালি, তা অনুভব করে মান্নান সৈয়দ বিস্ময়ের পাথারে হাবুডুবু খেয়েছেন। আশা ও আশাহীনতার ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের যে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে তার তুলনা সত্যিই মেলা ভার। আর এও ঠিক যে বাঙালির বিজয় ছিল সত্যিই অকল্পনীয়। কবিতার কথায় সেদিনের কথা সাজিয়েছেন কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ—
রাত্রির বিরুদ্ধে চাঁদের মতো জ্বলছিলাম আমি
প্রথমে ক্ষীণ শশিকলা
দিগন্তের কালো খেতে ঝলসে উঠেছিল সোনার হেঁসোর মতো
আশা-হাতাশার দুধারী তলোয়ার
দু-টুকরো করে ফেলেছে আমাকে
যুদ্ধ চলে দুই অংশে
রীতিমতো-আমন্ত্রণকারীর ঘাসের ভিতরে পা ফেলতেই
পুঁতে-রাখা গোপন মাইন-এ আমি টুকরো-টুকরো হয়ে যাই
ঘাসের উপর বসে নিজেকে জোড়া লাগাই ফের
ট্যাঙ্ক-এর বিরুদ্ধে ঠ্যালাগাড়ির ব্যারিকেড রাস্তা জুড়ে
পাশবিকতার বিরুদ্ধে মানবিকতা
রাত্রির বিরুদ্ধে চাঁদ
কালো কামানের বিরুদ্ধে সবুজ পল্লব।
মানুষ আর প্রকৃতির মধ্যেকার সম্পর্ক নির্ণয়ে মান্নান সৈয়দ সতর্ক শিল্পী। জীবন, জীবনের স্বাভাবিকতা-অস্বাভাবিকতা, যন্ত্রণা ও আনন্দ তিনি ধারণ করেছেন শব্দমালায়। আকাশের নিচে মাটির প্রান্তরের মানুষে মানুষে যে সম্পর্ক, জগত্ সম্বন্ধে মানুষের যে চেতনা তা মান্নানের কবিতায় সারিবদ্ধভাবে সাজানো আছে।
আবদুল মান্নান সৈয়দ শহরে কাটিয়েছেন জীবনের বেশিরভাগ সময়। উচ্চশিক্ষা ও জীবিকার তাগিদে তাকে গ্রাম ছাড়তে হয়েছিল। পরে আর প্রিয় গ্রামে ফিরে যাওয়া হয়নি। নগর-জীবনের যাবতীয় জটিলতা ও সম্ভাবনা তিনি দেখেছেন, যাপন করেছেন। শিল্পকলার বিকাশের নাগারিকতার ইতিবাচকতা ও পৃষ্ঠপোষকতা যেমন অনুভব করতে হয়েছে তাঁকে, তেমনই বুঝতে হয়েছে নগরে নাটকীয়তা। ক্লান্তি ও অপার বাণিজ্য যে নগরের মানুষকে ভাবিয়ে তোলে কিংবা নগরের সুবিধা পেয়ে মানুষ যে গ্রামের নির্মলতায় ফিরে যাওয়ার আগ্রহ হারায়—এসব তিনি অবলোকন করেছেন শহরের বাড়ির বাগানে কিংবা বারান্দায় বসে। যানবাহনের বাহারি সম্মেলন, কর্মহীন মানুষের স্রোত, টেনে-চলা দারিদ্র্য—এসবের ভেতরেও থাকে আশাবাদী প্রবণতা। আশাবাদী মানুষ মান্নান সৈয়দ সাজিয়েছেন শহরের সে-দৃশ্য। ‘শহরে শান্তি কোথায়?’—এই অভিজ্ঞান মনে ও মননে পুষে রেখে জীবনের দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়েছেন কবি। ভীতি-সংকোচ, অনিরাপত্তার আশঙ্কা আর চারপাশে অবিশ্বাসের মহড়ার ভেতর দিয়ে পথ পাড়ি দিতে হয় নগরের বাসিন্দাদের। মান্নান সৈয়দ বুঝেছেন সেসব সমস্যার ব্যাপারাদি। কবিতায় প্রকাশও করেছেন প্রকাশের ভারে।
প্রেম-নারী-পুরুষ মান্নান সৈয়দের কবিতার বিশেষ প্রেক্ষিত-পরিসর। যৌনতা-প্রকাশক শব্দ-বন্ধে তার আগ্রহ প্রথম থেকেই। নারী দেহের যৌন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহ তার কবিতায় বিভিন্নভাবে ব্যবহূত হয়েছে। প্রেম-ভাবনায় বড় বেশি কল্পনা-প্রবণ আবদুল মান্নান সৈয়দ। নারীর শরীর ও মনকে তিনি কল্পনার সুতোয় বেঁধে ভাসেন গহিন অরণ্যে। তার নারীরা সর্বদা না-পাওয়া, না-ধরা-ছোঁয়ার কাতারে সামিল। নারী আর রমণীকে স্বতন্ত্রভাবে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন মান্নান সৈয়দ। অনুভবে আর চেতনায় তিনি ধারণ করেছেন রমণীর কৌশল, সৌন্দর্য ও চাতুর্য। কবিতাকে তিনি যৌনতাহীন কেবল শব্দের বাহাদুরির শিল্প বানাতে চেষ্টা করেননি। সত্য সমেত রমণীর সবটুকু মোহময়তা ও প্রাসঙ্গিকতা আঁকতে এই কবিকে কখনো কোনো কার্পণ্য করতে হয়নি।
দূরে কি দেখছো?
— চান্দ্র-বাস বসেছে বিহারে।
বটে? ও-তো শ্রেণীভারে বেদম রমণী;
কি রকম তড়পায় দেখেছো?
— যেন ডাঙায় কাত্লা মাছ, সদ্য পানি-থেকে-তোলা
ওদিকে?
— জেলের আতত জাল, ভুল করে সূর্যে পড়েছে
সঙ্গে আছে কেউ?
(কবি)
আবদুল মান্নান সৈয়দ বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন ষাটের দশকে পরাবাস্তব চেতনাধর্মী কিছু কবিতা রচনার জন্য। বিষয়টি তখন বাংলা কবিতার জন্য বেশ আগ্রহব্যঞ্জক ব্যাপার ছিল। কারণ বাঙালি মুসলমান ভারতভাগের পরই সাহিত্যের কাজে নিঃশঙ্ক হতে সক্ষম হয়, তখনো তার অনুশীলনের কর্মক্ষমতা কম, জীবনাগ্রহেও শূন্যতা; সমাজ-অর্থনীতির বিচলিত সময়ও তখন গ্রাস করে অনেককেই, তখন শার্ল বোদলেয়ার, আর্তুর র্যাবোঁ অনূদিত হয়ে কবিতার ভূমিকে সতেজ রাখা বা সাহস সঞ্চারের অভিমুখ তৈরির অবকাশ হয়, মান্নান সৈয়দ বা অন্য কবিগণ স্বভাষার নিজস্ব স্পন্দনে নেমে আসেন ভূমিতে, নতুন প্রকরণকে আশ্রয় করে। ‘জ্যোত্স্না-রৌদ্রের চিকিত্সা’, ‘ও সংবেদন ও জলতরঙ্গ’ কিংবা ‘মাছসিরিজ’ বাংলাদেশের কবিতায় নতুন বাঁক। বাংলা কবিতায় মান্নান সৈয়দ বহন করেন পাশ্চাত্যের আধুনিকতাবাদী ঐতিহ্যের কিচু ধারণা এবং বাংলা কবিতার পূর্বসূরিদের প্রণোদনাও। উদ্ভটত্ব ও পরাবাস্তবতা তার কবিতার বিশেষ বিশেষত্ব হয়ে ওঠে কবির কল্পনা ও প্রকাশ-কৌশলের চাতুর্যে। তিনি বাংলা কাব্যধারায় সবচেয়ে চৌকস পরাবাস্তববাদী কবি। পরাবাস্তববাদী বলেই তার কবিতায় খুঁজে পাওয়া যায় স্বপ্ন-যুক্তি, মনঃস্তাত্ত্বিক নাটকীয়তা এবং যুক্ত অনুষঙ্গ। এমনকি তার কবিতার পঙিক্ততে পঙিক্ততে পাওয়া যায় স্বয়ংক্রিয়তার আভাসও। বিশ শতকের ষাট ও সত্তরের দশকে বাংলা কবিতায় যে ‘কনফেশনাল’ ধারার সূচনা হয়, তাতে আবদুল মান্নান সৈয়দের ব্যাপক প্রণোদনা ছিল। সৈয়দের কবিতায় পুরনো ও নতুন শব্দ মিলে একাকার হয়ে যায়—নিরীক্ষামূলক অভিধায় আর অভিনব সব দ্যোতনায়। তার লেখায় কোমল শব্দাবলি পরাবাস্তবতার চাদরে আবৃত থাকে। তাই, তার পরাবাস্তব কোনো স্তবক ভেঙে ফেললে পাওয়া যায় অযাচিত সাধারণ দুঃখের সহজ উপলব্ধি। বুদ্ধিদীপ্ততা আর জীবনাভিজ্ঞতার নান্দনিক-বোধের কেন্দ্রে বিচরণ করেছেন সর্বদা কবি মান্নান সৈয়দ। এই কারণে সমকালে তাকে কিংবদন্তি ফরাসি কবি আর্তুর র্যাবোঁর সাথে তুলনা করা হতো এবং প্রায়শই তাকে ডাকা হতো ‘আঁফাঁ তেরিবল’ বা ‘দুর্ধর্ষ বালক’ বলে। মান্নান সৈয়দের শৈশবের প্রতিবেশ ছিল ভয়াবহ। দেশ বিভাগ তাকে মানসিকভাবে বিপন্ন ও ছিন্নমূল করেছে। আর বাংলা ১৩৫০ সাল তো তার জন্মের সাথে আঁকা। তাঁর সমস্ত জীবনে আর সাহিত্যচর্চার প্রহরে এই দুটি ঘটনা রক্তবিদারণরেখা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। সে কারণে অবচেতনভাবেই তিনি পরাবাস্তববাদে আত্মমুক্তি ও আত্মভাষ্য প্রকাশের পথ খুঁজে বেরিয়েছেন।
বাংলা সাহিত্যের এক মনস্বী লেখকের নাম আবদুল মান্নান সৈয়দ। তার তুলনা তিনি নিজেই। একাধারে সৃজনশীল ও মননশীল এই প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব মূলত বোদ্ধা পাঠকের কবি। শিক্ষিত পাঠকের কবি। প্রাতিস্বিক ধারায় দীপ্যমান তিনি। প্রবল তোলপাড়-করা সামর্থ্য নিয়ে বাংলা কবিতায় তার আবির্ভাব ও বিচরণ। উদ্ভাবনী শক্তি আর ব্যঞ্জনা-সৃষ্টি-সামর্থ্য তার কাব্যভাষাকে দিয়েছে ব্যতিক্রমি ঘরানার বৈশিষ্ট্য। মান্নান সৈয়দ সচেতনভাবে সনাতন সাহিত্যধারা থেকে নিজেকে আলাদা করতে পেরেছিলেন। মান্নান সৈয়দ জীবনকে মনে করতেন এক জটিল শহর, এই শহরে মানুষনির্মিত লেক হচ্ছে কবিতা। খোলা হাওয়ার জন্য, বিকেলবেলায় বিশ্রামের জন্য মানুষ এখানে আসবেই। এবং কবি এরকম পরম বিশ্বাসে জীবনের জটিলতার মধ্যে অবকাশের অন্বেষণে মানুষনির্মিত লেকরূপী কবিতার চর্চায় যোগ দিয়েছেন। তার এই কাব্য-বৈশিষ্ট্য পূর্বজের অনুবর্তন নয়, মৌলিকতার উত্সারণ। ষাটীয় কাব্যভূগোলে তার মৌলিকতা অবশ্যই দ্রষ্টব্যযোগ্য।
আবদুল মান্নান সৈয়দ, ৩ আগস্ট ১৯৪৩-৫ সেপ্টেম্বর ২০১০
