আমাদের চারপাশে কত নামের ছড়াছড়ি। নাম ছাড়া কি কোনোকিছু শনাক্ত করা সম্ভব। নামের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে সবার পরিচয়। কোনোকিছুর নাম বললেই আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে তার অবয়ব। তা মাত্র কয়েক মুহূর্তের ব্যাপার। বিষয়টি মস্তিষ্কের সঙ্গেই যেন নিবিড়ভাবে সংশ্লিষ্ট। সেই ক্ষুদ্র আলপিনেরও যেমন নাম-পরিচয় আছে। তেমনি একটি অদৃশ্য ব্যাকটেরিয়ারও একটি নিজস্ব নাম আছে। আর প্রতিটি নামের পেছনেই থাকে একটি কার্যকারণ। সেই প্রাগৈতিহাসিক ভাষাযুগ থেকেই নামের প্রচলন। তারই ধারাবাহিকতায় আজকাল নামের এত প্রয়োগ। প্রাচীন জনপদ থেকে শুরু করে আধুনিক শহর নগর জনপদ সবকিছুই নিজস্ব নামে পরিচিত। আর এসব নাম কবে কীভাবে এসে থিতু হলো, বা কে এসব নামের প্রবক্তা সেইসব সূত্র আজ অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। আমরা শুধু অনুমান করেতে পারি। কিংবা এর ধারাবাহিকতাগুলো ভাবতে পারি। কোথা থেকে এল একটি গ্রাম বা মহল্লার নাম, তারপর ইউনিয়ন, থানা-উপজেলা, জেলা ইত্যাদি। একশ বছর আগে কি একই নাম ছিল, নাকি আমরা এখন যা জানছি তা সুদীর্ঘ সময়ের একটি বিবর্তিত রূপ। এসব নিয়ে অনেক কথাই হতে পারে।
প্রতিটি নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিচিত্র প্রভাব। একটি শব্দ; তা আবার খাঁটি বাংলা শব্দ না-ও হতে পারে, স্থানীয় সম্পর্ক, প্রভাবশালী ব্যক্তি, ধর্মীয় প্রভাব, প্রচলিত লোককথা—আরো অনেক ধরনের সম্পৃক্ততা নিয়েই একটি স্থান-নামের সূত্রপাত হতে পারে। আপাতত আমাদের স্থান-নামের প্রতিই আগ্রহ। সেসবের উত্স সন্ধানে ঘুরে আসা যেতে পারে কিছু জনপদ।
১৯৭৫ সালে অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক বিচিত্রায় প্রকাশিত সৈয়দ মুর্তাজা আলীর একটি গবেষণা প্রবন্ধের কিছু উদ্ধৃতি এখানে অপ্রাসঙ্গিক হবে না। ইংরেজ আমলে প্রসিদ্ধ ব্যক্তি কর্তৃক স্থাপিত ব্যক্তির নাম থেকে স্থানের নামকরণ হয়েছে। ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম ইত্যাদি জেলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর আমলে যেসব বাজার স্থাপিত হয় তাই কোম্পানীগঞ্জ নামে পরিচিত। মালদহের যে স্থানে ইংরেজরা বসতি করেন সেই স্থানটি এখনো ইংলিশ বাজার নামে পরিচিত। কলকাতার কাছে যেখানে ব্রিটিশ সৈন্যদের ব্যারাক ছিল সেটিই ব্যারাকপুর। একইভাবে ঢাকায়ও পলাশী ব্যারাক আছে। ১৮৪৯ সালে খুলনার মোরেল নামক নীলকুঠির মালিক স্থাপন করেন মোরেলগঞ্জ। ১৭৭৭ সালে কর্নেল টলী কলকাতা থেকে গঙ্গা পর্যন্ত একটি খাল খনন করেন। ওই খাল টলীর নালা ও নিকটস্থ বাজার টালীগঞ্জ নামে পরিচিত। চট্টগ্রামে কর্নেল উইলফোর্ট কর্নেল হাট স্থাপন করেন। ঢাকা শহরের বাকলেন ঘাট, মিন্টু রোড, ফুলার রোড, বেইলি রোড, হেয়ার রোড, লয়াল স্ট্রিট, র্যাঙ্কিং স্ট্রিট স্থপতিদের নামানুসারে। ঢাকার কলি রোড স্থাপন করেন কলি নামক একজন মিউনিসিপ্যাল ইঞ্জিনিয়ার। সেই কলি রোডই বর্তমানে গ্রিনরোড নামে পরিচিত। খুলনার সাহেবের হাট স্থাপন করেন স্যালট নামক জনৈক নীলকর। রাজশাহীর সাহেব পাড়া ও সাহেব বাজার ব্রিটিশ আমলে স্থাপিত। সুন্দরবনের হিংগুলগঞ্জ স্থাপন করেন হেনকেল নামক একজন নীলকর। কেনী নামক কুখ্যাত নীলকরের নামে কুষ্টিয়ার কেনী রোডের নাম রাখা হয়েছে। মীর মশাররফ হোসেনের ‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’ উপন্যাসে কেনীর কুখ্যাতির উল্লেখ আছে।
কোনো কোনো স্থানের নামকরণ হয়েছে স্থানীয় অধিবাসীদের জাতি কিংবা পেশা থেকে। যেমন : ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ব্রাহ্মণ শাসন, বৈদ্যজ্ঞাতি (সিলেট), বৈদ্যবাটি, নন্দিগ্রাম (বগুড়া), কসাইটোলা, কাঁসারিটোলা, মালিটোলা, সুত্রাপুর, বানিয়ানগর, ঠাঁটারিবাজার, কামারনগর, কামারখালী, মোগলটুলী, শাঁখারীবাজার, কুমারখালী, তাঁতিবাজার গোয়ালনগর ইত্যাদি। একসময় ঢাকা শহরে অনেক আর্মেনিয়ান মসলিনের ব্যবসা করত। তাদের বাসস্থান আর্মানিটোলা নামে খ্যাত।
কোনো কোনো স্থানের নামকরণ হয়েছে ভূমিব্যবস্থা থেকে। এগারোবসতি ও সতেরোবসতি পরগনা নাম হয়েছে রাজস্বের অঙ্ক থেকে। বগুড়ার সেলবরস নাম হয়েছে চেহেলবরস থেকে। এভাবে অনেক স্থানে ছআনী, নআনী, দশআনী এসব নামেরও উত্পত্তি হয়েছে।
কোনো কোনো স্থানের নামকরণ হয়েছে গাছপালা থেকে। যেমন সেগুনবাগিচা, বাদামতলী, গাছপাড়ী, জামতলা, আমতলী, কাঁঠালবাগান, কলাবাগান ইত্যাদি। হান্টারের মতে যশোহর নাম আরবি যশোর, অন্যমতে রাজা প্রতাপাদিত্যের যশহরণ করার জন্য যশোহরের নামকরণ হয়েছে। জিঞ্জিরা নাম হয়েছে আরবি জেজিরা কথা থেকে। লাল রঙের মাটির কারণেও বিভিন্ন স্থানে রাঙামাটি বা লালমাটিয়া নাম হয়েছে। চারঘাট, চৌমুহনী ও সাতমাথা নামগুলো এসেছে প্রাকৃতিক অবস্থান থেকে। বন্য প্রাণীর নাম থেকেও অনেক জায়গার নামকরণ হয়েছে। যেমন রাজশাহীর বাঘা, সিলেটের হরিণাবাটি, যশোরের হরিণাকুণ্ড, মইশখোলা, পায়রাডাঙা, টাইগার পাস ইত্যাদি।
বিশেষত বিভিন্ন স্থানের নামকরণের ক্ষেত্রে সুদীর্ঘ সময়ের জনশ্রুতিকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। এসব জনশ্রুতি বা মতবাদের মধ্যে লুকিয়ে আছে প্রাচীনবাংলার অনেক মজাদার লোকগাথা বা লোকগল্প। এর কোনো কোনোটি হাস্যরসাত্মক, কোনো কোনোটি বিষাদময়, কোনো কোনোটি আবার একেবারেই বাস্তব। তবে কোনো কোনো নাম বিবর্তনের পথ ধরে হারিয়ে ফেলেছে মূল সূত্র। অর্থাত্ যে নাম দিয়ে শুরু তা আর পরবর্তীকালে টিকে থাকেনি, কাছাকাছি কোনো একটি নামে পরিবর্তিত হয়েছে।
রাজশাহী জেলার নামকরণ নিয়ে কয়েকটি মতবাদ প্রচলিত আছে। সুবাদার মুর্শিদকুলী খানের সময়ে এক ব্রাহ্মণ জমিদার রাজস্ব আদায় করতেন। তাকে রাজা উপাধি প্রদান করা হয়েছিল। এই রাজার রাজ এবং বাদশাহীর শাহী নামটি যুক্ত হয়েই রাজশাহী নাম হয়েছে। বাংলাদেশ জেলা গেজেটিয়ারের তথ্যমতে, এ এলাকায় বহু রাজা রাজত্ব করতেন বলেই এর নাম হয় রাজশাহী। কালীপ্রসন্ন বাবুর মতে, রাজা মানসিংহ কর্তৃক রাজশাহী নাম প্রদত্ত হয়। ব্লকম্যানের মতে কোনো হিন্দু রাজা এখানে শাহ (নরপতি) ছিলেন, অথবা কোনো হিন্দু রাজা মুসলমান শাহকে বিতাড়িত করে সিংহাসন দখল করেছিলেন, তাই তার রাজ্যের নামকরণ হয় রাজশাহী। কথিত আছে যে রাজা গণেশ গৌড়ের মুসলমান সুলতানকে পরাজিত করে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন।
বগুড়া জেলার নামকরণ নিয়ে কোনো ঐতিহাসিক সূত্রই নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারে না। জেলা গেজেটিয়ারের তথ্যমতে, সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের পুত্র সুলতান মোহাম্মদ নাসিরুদ্দীন বোগরা খানের নামানুসারে এ অঞ্চলের নামকরণ হয়। তিনি ১২৮২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২৯১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তত্কালীন বঙ্গ প্রদেশ শাসন করেন। তবে এই মতবাদের কোনো ঐতিহাসিক সমর্থন পাওয়া যায় না।
জে, ই ওয়েবস্টারের মতে, কুমিল্লা জেলার পূর্ব নাম ত্রিপুরা শব্দটি সন্নিহিত পার্বত্য ত্রিপুরা রাজ্যের নাম থেকে এসেছে। ঋগ্বেদে উল্লিখিত সপ্ত মহাদেশের সম্রাট যযাতির পৌত্র ত্রিপুরা ছিলেন রাজাদের মধ্যে দ্বিতীয়। এই নাম থেকেই ত্রিপুরা নামের উত্পত্তি। তিন পুরী বা নগরী অর্থে অথবা ত্রিপুরেশ্বরীর দেশ অর্থেও এ নামের ব্যাখ্যা করা হয়েছে। শেষোক্ত ব্যাখ্যাটি পার্বত্য ত্রিপুরার প্রাচীন কাহিনির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ কাহিনি অনুসারে মহাদেবের পত্নী ভগবতীর মৃতদেহ থেকে একান্নজন দেবীর আর্বিভাব হয় এবং তারা পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাদের অন্যতম ত্রিপুরেশ্বরী বা তিন পুরীর অধিকারিণী পার্বত্য ত্রিপুরার প্রাক্তন রাজধানী উদয়পুরে অধিষ্ঠিত হন। ধারণা করা হয় যে কমলাঙ্ক নগর থেকে বর্তমান কুমিল্লা নামের উত্পত্তি। কেউ কেউ মনে করেন কুমিল্লা নামক একজন মুসলিম সেনা নায়কের নামানুসারে কুমিল্লা নামকরণ হয়।
বরিশালের আদি নাম বাখরগঞ্জ। শোনা যাক তার নামকরণের ইতিবৃত্ত। এই অঞ্চলটি একসময় বাকলা নামেও পরিচিত ছিল। ১৫৮৬ সালে পরিব্রাজক রালফ ফিচ উল্লেখ করেন বেঙ্গলার চাটিগ্রাম থেকে তিনি যখন বাকলায় এসেছিলেন, তখন একজন হিন্দু সেখানকার রাজা ছিলেন। ঐতিহাসিক আবুল ফজল তার আইন-ই-আকবরী গ্রন্থে জানিয়েছেন, বাকলা সরকার সমুদ্র উপকূলে অবস্থিত ছিল। চতুর্দশ শতাব্দি পর্যন্ত এই অঞ্চল চন্দ্রদ্বীপ নামেও পরিচিত হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে এ রাজ্যের রাজধানী ছিল মাধবপাশা। বরিশাল শহর থেকে এর দূরত্ব ছিল মাত্র ৮ মাইল। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ঢাকায় মোগল প্রশাসনের অন্যতম কর্মকর্তা আগা বাকেরের নামানুসারে জেলার বর্তমান নামের উত্পত্তি হয়েছে। আগা বাকের বুজুর্গ উমেদপুর পরগনার জমিদার ছিলেন। তিনি সেলিমাবাদ পরগনারও ওয়াদ্দাদার ছিলেন। এ পরগনার সদর দফতর ছিল বাখরগঞ্জ। বর্তমান বরিশালের নামকরণ সম্পর্কে বলা হয়, ইংরেজ ও পর্তুগিজ বণিকরা বড় লবণ চৌকিকে বরিসল্ট বলত। বরিসল্ট থেকে বরিশাল নামের উত্পত্তি।
পটুয়াখালী নামকরণের সঙ্গে প্রায় সাড়ে তিনশ বছরের অত্যাচার আর লুণ্ঠনের করুণ ইতিহাস জড়িয়ে আছে। পটুয়াখালী শহরের উত্তর দিক দিয়ে প্রবাহিত বর্তমান নদীটি সেকালে ভরনী খাল নামে পরিচিত ছিল। ষোড়শ শতাব্দীর শুরু থেকে পর্তুগিজ জলদস্যুরা দলে দলে এই ভরনী খাল দিয়ে এসে সংলগ্ন অঞ্চলগুলোতে এসে অত্যাচার হত্যা আর লুণ্ঠন চালাত। স্থানীয়রা এই লুটেরাদের নাম দিয়েছিল নটুয়া। ভরানী খালের নামকরণ হয়েছিল নটুয়ার খাল। কালক্রমে এই নটুয়ার খালই পটুয়ার খাল নামে পরিচিত হয়। তা থেকেই পটুয়াখালী নামের উত্পত্তি। আবার ভিন্নমত অনুসারে স্বর্গীয় দেবেন্দ্রনাথ দত্তের পতুয়ার খান কবিতা থেকে পটুয়াখালীর উত্পত্তি। কারো কারো মতে পটুয়া শব্দ থেকেও পটুয়াখালী নামের উত্পত্তি হতে পারে।
ঢাকার নামকরণ নিয়ে বেশকিছু ধারণা প্রচলিত। ইউরোপীয় পর্যটক ও মুসলিম ঐতিহাসিকগণ বঙ্গদেশের পূর্বাঞ্চলীয় এলাকা ভ্রমণ করে যে নগরটিকে বেনগলা বলে উল্লেখ করেছেন সেই নগরীটি এখানেই উপস্থিত ছিল বলে মনে করা হয়। কথিত আছে মোগলপূর্ব আমলে এখানে বায়ান্নবাজার ও তেপ্পান্ন গলিবিশিষ্ট একটি শহর ছিল। এই শহরটিই নাকি বায়ান্ন বাজার তেপ্পান্ন গলি নামে খ্যাতি পেয়েছিল। হয়তো বা এই বায়ান্ন বাজারের কোনো একটির নাম ছিল বেনগলা। ষোড়শ শতাব্দীতে পরিব্রাজক মেথল্ড রাজমহল ও বেনগলাকে সুদৃশ্য নগরী বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তার কথায় ঢাকার কোনো উল্লেখ নেই। হিন্দুদের কল্পকাহিনিতে ব্রহ্মপুত্র নদের বিশিষ্ট স্থান আছে। আদিশুরের পুত্র ছিলেন বল্লাল সেন। আদিশুরের পত্নীদের মধ্যে বল্লালসেনের মাকেই আদিশুর সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। তাও দৈব নির্দেশক্রমে। রাজা বুঝতে পারেননি, তিনি একসময় ক্রুদ্ধ হয়ে রানিকে রাজপ্রাসাদ থেকে তাড়িয়ে দেন। রানি তখন গর্ভবতী, বল্লাল সেনই তার গর্ভে। রানি রাজার বাহিষ্কারাদেশে উপায়ান্তর না দেখে ব্রহ্মপুত্রের পানিতে ঝাঁপ দেন। কিন্তু পুণ্যসলিলা নদ তাকে বুকে তুলে নিয়ে ত্বরিত গতিতে এবং নিরাপদে অপর পাড়ে নিয়ে যায় এবং সেখানে তাকে দেবী দুর্গার কাছে সঁপে দেয়। নিকটেই বুড়িগঙ্গার তীরে ছিল তার গৃহ। সেখানে নদীর কাছাকাছি জঙ্গলের মধ্যে তার সন্তান ভূমিষ্ট হয় এবং দেবী দুর্গার রক্ষণাবেক্ষণে নবজাতকটি বড় হতে থাকে। সেখানে সে নানা বিদ্যায় পারদর্শী হয়ে ওঠে। এবং জ্ঞান-গরিমায়, শৌর্য-বীর্যে বুত্পত্তি লাভ করে। একদিন সে বেড়াতে বেড়াতে তার রক্ষাকর্ত্রী দুর্গার মূর্তিটিকে জঙ্গলের মধ্যে লুকানো অবস্থায় দেখতে পায়। পরম শ্রদ্ধাভরে সে সেখানে ‘ঢাকা ঈশ্বরী’ বা লুকানো দেবীর মন্দির নির্মাণ করে। সেই থেকে মন্দিরের নাম হয় ঢাকেশ্বরী। এই ঢাকেশ্বরী মন্দিরের আশপাশে ঢাকা নামে একটি জনপদ ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে থাকে। এই জনপদই কালক্রমে ঢাকা শহরে রূপান্তরিত হতে থাকে। আরেক মতে ১৬১০ সালে ইসলাম খাঁ বুড়িগঙ্গার কাছে ঢাক বাজিয়ে যতদূর শোনা যায় ততদূর পর্যন্ত সীমানা নির্ধারণ করে ওই এলাকায় রাজধানী বানান, সেই এলাকাই ঢাকা নামে পরিচিত।
টাঙ্গাইলের নামকরণ সম্পর্কে নীলকর টেংগু সাহেবের গল্পই বেশি প্রচলিত। ব্রিটিশ শাসনের প্রথমভাগে আকুর-তাকুর ও শাহ-বালিয়া মৌজার মধ্যবর্তী এলাকায় টেংগুর নীল কারখানা ছিল। পূর্বোক্ত দুই মৌজার সীমানা বরাবর তিনি যাতায়াতের জন্য উঁচু মেঠোপথ বা আইল তৈরি করেছিলেন। জনসাধারণ এ আইলকে টেংগু সাহেবের আইল বলে উল্লেখ করত। মনে করা হয় টাংগাইল শব্দটি টেংগু সাহেবের আইল নামেরই অপভ্রংশ। প্রচলিত আরেকটি ধারণা অনুযায়ী নীল ব্যবসায়ের চরম উত্কর্ষের সময় নীলের চালান নেবার জন্য অসংখ্য টাংগা গাড়ির ভিড় লেগে থাকত। তা থেকেই আঞ্চলিক নাম টাঙ্গাইলের উত্পত্তি।
মানিকগঞ্জ জেলার নামকরণের পেছনে তিন জনের নামের তথ্য পাওয়া যায়। এ তিনজন হলেন সুফি সাধক মানিক শাহ, দুর্ধর্ষ পাঠান সরদার মানিক ঢালী এবং নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিশ্বাসঘাতক অমাত্য মানিক চাঁদ। এর যে কোনো একজনের নামানুসারে মানিকগঞ্জের নামকরণ করা হয়েছে। মোগল আমলে
মুন্সীগঞ্জে ইদ্রাকপুর নামে একটি কেল্লা তৈরি করা হয়। কেল্লার নামানুসারে মুন্সীগঞ্জের নামকরণ হয় ইদ্রাকপুর। ঊনবিংশ শতকের শুরুতে এটি রামপালের মুন্সী এনায়েত আলীর জমিদারিভুক্ত হয়। পরে নামকরণ হয় মুন্সীগঞ্জ। ময়মনসিংহের প্রাচীন নাম মোমেনশাহী ও নাছিরাবাদ। এই জেলাকে নিয়ে প্রচলিত ছড়া হলো; হাওর, বাঁওড়, মহিষের সিং—এই তিনে ময়মনসিংহ। একসময় এ অঞ্চলে অসংখ্য মহিষ ছিল। মহিষের শিং থেকে মোমেনশাহী, এ থেকেই ময়মনসিংহ। আবার কেউ কেউ বলেন মোমেন শাহ পীরের নাম থেকে মোমেন শাহী হয়েছে। চট্টগ্রাম নামকরণের ক্ষেত্রে অনেকেই মনে করেন চীনের রাজকীয় দলিলে চট্টগ্রামকে বলা হয়েছে চাঠিকার। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকের শেষ দিকে চীনা পর্যটক ইচিং বৌদ্ধ ধর্মীয় জ্ঞান আহরণের জন্য এখানে আসার পর থেকেই চট্টগ্রাম নাম শুরু হয়। কিন্তু প্রাচীন নাম ইসলামাবাদ। ফেনী জেলার নামকরণের ক্ষেত্রে জানা যায় ফনী রাজার নামানুসারে ফনী, পরে ফেনী নাম হয়েছে। ভিন্নমতে মৌর্য বংশের শাসনামলে চীনা পর্যটক ফাহিয়েন ভারত সফরের একপর্যায়ে এখানে একদিন অবস্থান করেন। পরে ফাহিয়েনের নামানুসারে কালক্রমে ফাহিয়ানী থেকে ফেনী নামকরণ হয়।
নামের উত্স খুঁজতে গেলে সর্বাগ্রেই আমাদের প্রতিটি গ্রাম/মহল্লা, ইউনিয়ন, হাট-বাজার, উপজেলা, জেলা ইত্যাদির কথা বলতে হয়। কিন্তু স্বল্পপরিসরে এতগুলো স্থান-নামের ইতিহাস তুলে ধরা খুবই দুরূহ কাজ। আলোচ্য প্রবন্ধে তার যিকঞ্চিত্ বিবৃত হলো।
চার্লস ড’য়েলির আঁঁকা ঢাকার চিত্রে ঢাকার নানা অনুসঙ্গ উঠে এসেছে, এসব অনুষঙ্গ ঘিরে নানা রাস্তার নামকরণও হয়েছে এখানে
