চৈত্রের তেজি রোদ কিংবা আমি

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৯:১৭

আমার মাথার ওপর তুত নীল আকাশ। মানুষ  কত কারণে অকারণে আকাশ দেখে।  আমিও দেখছি। তবে এমন গভীর নীলের আকাশ এই প্রথম দেখা। শুধু কি আকাশ! আকাশের নীলে হেলান দিয়ে বসে থাকা সোনালি বুদ্ধ, পেছনের ঘন পাইন বন। হাজার হাজার ফুট নিচে বহমান পার্চ নদী। এসব কিছুই আমার কাছে আনকোরা। বোদ্ধা-পয়েন্টের

বিশাল চত্বরের চারপাশে মনোলোভা পাহাড়ের সারি, গিরিখাদ, থিম্পু শহরের নানা বর্ণিল ছাদগুলোই তো এক-একটা পেইন্টিং বক্স। তবে সব সুন্দর ছাপিয়ে বোদ্ধা-পয়েন্টের প্রকাণ্ড প্রান্তরে আমার দুই কন্যার উচ্ছ্বসিত হাসি, পাখির ডানার মতো বাহু মেলে তুমুল ছুটোছুটিই মনে হয় পৃথিবীর সেরা দৃশ্য! ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক একটুও থামে না। কন্যা ও আমার সান্নিধ্যবঞ্চিত মোস্তাফা একটু দূরে মাইক ও ক্যারন দম্পতির সঙ্গে আলাপে মগ্ন। একটু কি গম্ভীর দেখাচ্ছে ওকে! পর্যাপ্ত সময় দিচ্ছি না বলে? ভীষণ রোমান্টিক পুরুষ ও। পাগলের মতো ভালোবাসে আমাকে। আমিও বাসি। কিন্তু এখন আমার সন্তান, ভুটানের আকাশের তুত নীল, পাইন বনের সবুজ আমাকে বেশি টানছে। মাইক আর ক্যারন পাহাড়চূড়ার বৌদ্ধের লাল টুকটুকে ঠোঁটের সামনে জড়তাহীন চুমু খায়। ওহ্ হো! মাইক ক্যারন তো দম্পতি নয়। বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড। আমার শেকড় তো এই শ্যামল ভূমিতে। প্রাচ্যে। বৌদ্ধ আর আমার পূর্বপুরুষের একই ভূমিখণ্ড। আমি কী করে সবার সামনে ওর বাহুলগ্ন হই! আর আমার দুই কন্যা চন্দ্রমুখী, সূর্যমুখী আছে না!

থিম্পুতে এসেছি আমার অফিসের একটা সেমিনারে। আজ প্রোগ্রাম ছিল—সাইড সিইং। আগামীকাল আমার সেশন।

মোস্তাফা আর বাচ্চাদের সব খরচ আমিই দিচ্ছি। ভুটান ভ্রমণ ওদের জন্য আমার গিফট। চন্দ্রমুখীর বয়স সাত সূর্যমুখীর নয়। পৃথিবীর সব রং আর গন্ধ আকুল করে ওদের। প্রজাপতির পাখার কারুকাজ, নদীর ঢেউ, ছোট্ট একটা পাখির চিড়িত্ আওয়াজেও মুগ্ধ হয় ওরা। সুযোগ পেলেই ওদের নিয়ে ঘুরতে বেরোই। প্রায় এগারো বছরের দাম্পত্যজীবনের পুরোটাই নিভাঁজ আমার। কোথাও কুঁচকায়নি। প্রেমের বিয়ে বলে নয়, দুজন দুজনকে খুব ভালো বুঝি। আমি একটা এনজিও-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর। খুব ভালো স্যালারি। কাজও করতে হয় উদয়াস্তি। তবে কাজে আনন্দ পাই। মোস্তাফা ঢাকার একটা বেসরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক। হাতে অঢেল সময় পায়। চমত্কার কবিতা লেখে। ভীষণ সবুজ ও। চন্দ্রমুখী, সূর্যমুখী বাবাকে খুব পছন্দ করে। চাকরির প্রয়োজনে আমাকে দেশ-বিদেশ করতে হয়। বাচ্চাদের জন্য আমাকে টেনশন করতে হয় না। বাসায় কাজের বুয়া আছে। রাঁধা-বাড়া করে। চন্দ্র, সূর্যের জন্য ১২/১৪ বছর বয়সী একটা মেয়ে রাখি সবসময়। ওদের খেলার সাথী হয়; আবার টুকটাক কাজগুলোও দেখে। তবে আমার মোটা অঙ্কের স্যালারি মোস্তাফার হীনমন্যতার কারণ হয়নি। আমার শ্বশুর ছিলেন যুগ্ম-সচিব। শ্বশুর, শাশুড়ি কেউই বেঁচে নেই। মোস্তাফার বাবা তার ছেলের জন্য ফ্ল্যাট , মোটা অঙ্কের ব্যাংক ব্যাল্যান্স রেখে গেছেন। এসব কারণে কোনোরকম ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স নেই ওর। তাই আমাদের এগারো বছরের দীর্ঘ দাম্পত্যজীবন একঘেয়ে লাগে না।

ভুটান ছোট্ট একটা দেশ। মাত্র সাড়ে সাত লাখ লোকের বাস। ছোট্ট দেশটা গোছানো আর শান্ত। ওদের নদী এখনো কুমারী। কেউ নদীতে মাছ ধরে না, গোসল করে না। কলকারখানার বর্জ্য নদীর জলকে বিষাক্ত করেনি। শহরের কোথাও ময়লা-আবর্জনা নেই। কালকের সেমিনারে এখানকার নারী সংগঠনের নেত্রীরা থাকবে। এরা নিজের দেশটা নিয়ে খুব সচেতন। ছেলেমেয়েদের নিঃসংকোচ মেলামেশায় বাড়াবাড়ি নেই। শেষবারের মতো আমি পেপারটায় চোখ বুলাই। আগামীকালের সেশনে আমাকে উইম্যান অ্যান্ড ট্রাফিকিং বিষয়ে পেপার পড়তে হবে।

পুলিশি রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশে গড়ে প্রতি বছর শিশু ও নারী পাচার হয়—১৫,০০০। ৯০-৯৭ সালে প্রায় দুই লাখ নারী ও শিশু পাচার হয়েছে। ‘সেন্টার ফর উইম্যান অ্যান্ড চিলড্রেন স্টাডি’ রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশ আর নেপাল হলো পাচারের প্রধান রুট। দশ বছরে ১৯৮৮-৯৯ পরিসংখ্যানে দুই লক্ষ কিশোরী বিশেষ অবস্থায় বিভিন্ন পতিতালয়ে বিক্রি হয়েছে। এই পতিতালয়গুলো পাকিস্তান , ইন্ডিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে। ২০ বছরে শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই ২ লাখ নারী ও শিশু পাচার হয়েছে। গড়ে প্রতিদিন বাংলাদেশ থেকে ৫০ জন নারী ও শিশু পাচার হচ্ছে। এসব তথ্য দেখে এই মধ্যরাতেও মাথাটা ঘুরে যায় আমার। ভয়ানক মানসিক চাপ অনুভব করি। সেই তুলনায় ভুটান এখনো নিয়ন্ত্রিত বলয়ে আছে। সার্কভুক্ত  দেশের নারী সংগঠনগুলোর আবেদনের প্রেক্ষিতেই এই সেমিনার। আর আমরা কোথায় পড়ে আছি! মানসিক চাপ থেকে একটু স্বস্তি পাওয়ার জন্য পরদিনই চলে যাই পুনাখা।

‘মেরি ফুয়েন্জাই’-এর ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে মেঘ ছোঁয়ার জন্য হাত বাড়াতে হয় না। মেঘই সারা শরীর ছুঁয়ে থাকে। কত হাজার ফুট ওপরে এখন আমি! লুকিয়ে থাকা মেঘেরা পাহাড়ের ওম ছেড়ে এদিক ওদিক উড়ে বেড়ায়। নিচের পাহাড়ি নদীর বিনুনি বাঁধা যেন শেষ হয় না। রিসোর্টের ঢালে ঢালে আপেলের গাছ। গাছের ডালে তুড়ুক তুড়ুক করে লাফানো কাঠবিড়ালি দেখতে দেখতে আমার ছোট মেয়ের গলা কানে আসে—আব্বু, মাইকের সাথে আমার একটা ছবি তুলে দাও না! নিচের ঢালে মাইক, ক্যারন-এর সাথে মোস্তাফা আর চন্দ্র, সূর্য। চন্দ্রমুখীর মাইককে খুব পছন্দ হয়েছে। মাইকের বয়স ত্রিশ/বত্রিশ। ক্যারনেরও কাছাকাছি হবে। দুজনই ক্যালিফোর্নিয়া থাকে। মাস তিনেকের জন্য এদিকে ঘুরতে এসেছে। ভুটান, নেপাল হয়ে ওরা যাবে তিব্বত। এদিকে অনলাইনে বিজনেসও সামলাচ্ছে দুজন।

গতকাল সেমিনার শেষে আমি ভারমুক্ত হলেও, ট্র্যাফিকিং-এর ডাটাগুলো মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। বিষণ্ন হয়ে পড়ি। হোটেলে মোস্তাফা আমার আসার অপেক্ষায়। সন্ধ্যাবেলায় হোটেল রেস্টুরেন্টের কোনার টেবিলে ওর হাতে আমি রেড ওয়াইন দেখি। ঘরে ঢোকার পরই মোস্তাফা হঠাত্ অপ্রাসঙ্গিকভাবে বলে—ক্যারন আর মাইককে আমার খুব হিংসা হয়। সবার সামনেই ওরা একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরছে, চুমু খাচ্ছে। অথচ আমরা...। এছাড়া আমেরিকা ফিরে গিয়েই যে যার পথ ধরবে। আবার নতুন সঙ্গী, নতুন প্রেম! এমনিতে পেপার পড়ার ধকলে কিছুটা স্ট্রেস গেছে, এরপর এরকম সিলি প্রসঙ্গ! ভ্রু কুঁচকে যায় আমার—মানে কী? আর ইউ বোরড উইথ মি? আর ওদের নিয়ে এরকম কথা বলার অধিকার কে দিয়েছে তোমাকে? ওর গ্লাস থেকে একটু ওয়াইন ছলকে কার্পেটে পড়ে। তরল গলায় মোস্তাফা বলে—হতেও তো পারি। আফটার অল ইলেভেন ইয়ারস, ইটস অ্যা ল-অ-ং টাইম! বলে কী? আমি ঘোর সন্দিহান হই—আর ইউ ওকে? রাবিশ! ক্রোধে আমার গলা ধরে আসে। আমার ধাতানি খেয়ে মোস্তাফা ঠা ঠা হেসে ওঠে—আ’ম জাস্ট কিডিং উইথ ইউ! আমার মনটা তেতো হয়ে থাকে।

পরদিন উড়াল দিই নেপাল। কাঠমান্ডু নয়, আমার সেমিনার পোখারায়। কাঠমান্ডু থেকে পোখারায় যাবার পথে ‘হমলেট’ নামের একটা পাহাড়ঘেরা রেস্টুরেন্টে চা খেতে থামি। বিস্তৃত প্রকৃতি জুড়ে মৌন গম্ভীর নিরাভরণ পর্বতগুচ্ছ সারি সারি দাঁড়িয়ে। চলার পথে গাড়ি থেকে নিচে তাকালেই মাথা ঘুরে যায়। হাজার হাজার ফুট ওপরের রাস্তাগুলো সাপের কুণ্ডলীর মতো আঁকাবাঁকা। ডানে বামে গভীর গিরিখাদ। পথে পড়ে ‘মনোকামনা’ নামের প্রাচীন এক মন্দির। সেখানে যাবার জন্য আবার থামি। ক্যাবল কারে চড়ে প্রায় ৩০/৪০ হাজার ফুট উঁচু পাহাড় ডিঙিয়ে আমাদের যাওয়া। ভেবেছিলাম পিচ্চি দুটো ভয় পাবে। উল্টো চন্দ্র-সূর্যের সেকি উচ্ছ্বাস!—এটা কী, ওটা কী? ওই গাছটা, ওই নদীর নাম কী? বাবার সান্নিধ্যেই ওদের বেশি সময় কাটে। সেজন্যই কিনা জানি না ওরা ভীষণ বাবাভক্ত। সম্ভবত আমার থেকে বেশি। আজ সুযোগ পেয়ে ওদের আঁকড়ে ধরতে গেলে ওরা বুনো হরিয়ালের মতো আঙুল গলে উড়াল দিতে চায়। এর আগে ভয়ে কখনো নাগরদোলায়ও চড়িনি আমি। এখন হাজার হাজার ফুট ওপরে একটা দড়িতে ঝোলানো বাহনে বসে বিন্দুমাত্র ভয় লাগছে না। সেটা এজন্য যে, আমার সাথে চন্দ্র, সূর্য আর মোস্তাফা আছে। রোপওয়ের ওপর থেকে বিস্তৃত আকাশ, নিচের গভীর খাদ, পাহাড়ের ঢালে লাল জমিনে সারি সারি পাইন, শাল বৃক্ষ। নিচে বহতা সিঁথির মতো সরু ত্রিশূলা নদী দেখি অকপট আনন্দে। আমাদের সুখী পরিবারটি বহন করা ক্যাবল কারে বসে আমার মুগ্ধ মন ভয়ের গণ্ডি টপকে অপার খুশি রচনা করে চলে। ক্যাবল স্টেশন থেকেও মন্দির আরো উঁচুতে। মন্দির প্রাঙ্গণে এসে কোলাহলের ভেতর পড়ে যাই। অগণিত দর্শনার্থী, বলির পাঁঠা, মোরগ-মুরগির চিত্কার-চেঁচামেচি, সিঁদুরমাখা কপালের নিষ্ঠাবান ভক্তদের নতজানু গদগদ ভাব, নিবেদন, প্রার্থনা। মনোকামনায় এসেও প্রাণ থেকে কিছু চাওয়ার তাগিদ বোধ করি না। এই যে সবুজ পাইন বন টপকে এলাম, মাথার ওপর টানানো আসমানের নীল সামিয়ানার নিচে অপরূপ শ্যামল দেখলাম। এই যে অটল ধীর পাহাড়ের সারি, এই মাত্র পর্বত থেকে নেমে আসা নবজাতক পানির ঢলে বয়ে চলা নদী, পৃথিবীর এই টাটকা সতেজ মুখ আর স্নিগ্ধতা দেখার সুযোগ পাওয়া, এরপর আর কী চাওয়ার থাকতে পারে! মন্দিরের ভেতর ঢুকে ভিড়বাট্টায় অতিষ্ঠ হই। বলির জন্য আনা পাঁঠার বিবশ গোঙানি, যেখানে সেখানে ছাগল, কুকুরের বিষ্ঠা আর যজ্ঞের ধোঁয়ায় মন্দির প্রাঙ্গণে টেকা দায়। তাড়াতাড়ি ক্যাবল স্টেশনে ফিরে আসি।

কোলাহল শান্ত এক বিকেলে আমরা স্নিগ্ধ সুন্দরী নগরী পোখারায় প্রবেশ করি। মনে স্বস্তি ফিরে আসে। হোটেল ‘পেনিনসুলার’-এর ফুল আর গাছ শোভিত আঙিনায় নেমেই আমার কন্যারা স্বভাবসুলভ আনন্দে নেচে ওঠে। অজস্র সবুজ, পনসেটিয়ার থোক থোক লাল, ক্রিসমাস ‘ট্রি’র কারুকাজ করা পাতার ফাঁকে ফাঁকে সোনালি রোদগলা মোহনীয় বিকেল! আর হাত বাড়ালেই পহাড়। কিন্তু পাহাড় বড় রহস্যময়। কাছে মনে হলেও কাছে নয়। শুধু প্রহরীর মতো ঘিরে ঘিরে থাকে। ভারি সুন্দর আর নরম একটা বিকেল। হোটেলে চেক ইনের পর নিচে ঘাসের লনে বসি চা খাওয়ার জন্য। এখনো আমার মাথার ওপর আকাশ, পাহাড়ের গায়ে হামাগুড়ি দিয়ে সন্ধ্যা নামছে। চন্দ্রমুখী আর সূর্যমুখী বাচ্চা খরগোশের মতো ছোটাছুটি করে। আমি মোস্তাফার ডান হাত আমার বাঁ হাতের আঙুলে জড়িয়ে ধরি ।

                       

২.          

আজ আমার মাথার ওপর আকাশ নেই। নোনাধরা একটা বিবর্ণ ছাদ। মফস্বল শহরের এক ক্লিনিকে বসে আছি। চন্দ্র-সূর্যও কাছে নেই। ওরা ঢাকায়, মোস্তাফাও আসেনি। আমি একা। একটা আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছি। ঘণ্টাখানেক লাগবে। সেজন্য অবশ্য আমার কোনো তাড়া নেই। আমি বোধশক্তিহীন জড় পদার্থের মতো লম্বা করিডোরে সারিবাঁধা লাল টকটকে একটা চেয়ারে বসে আছি। আলট্রাসনোগ্রাম রিপোর্টটা আমার তের বছরের মেইড সারভেন্টের। ও প্রেগন্যান্ট ছিল। আজ অ্যাবরসন হয়েছে।  অ্যাবরসনের পর আবারও আলট্রাসনোগ্রাম করা হয়েছে। আফটার অ্যাবরসন নাউ সি ইজ ক্লিয়ার—এ বিষয়ে একেবারে নিশ্চিত হতে চাই।

নেপাল থেকে ফিরে আসার পরই মোস্তাফা আমাদের কিশোরী মেইড সারভেন্টকে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেবার কথা বলে—তুমি তো থাকো না, ও দিন দিন আস্ত একটা বেয়াদব হচ্ছে। কথা শোনে না, উল্টো তর্ক করে। আমার মেয়েগুলোকে ও পাজি বানিয়ে ছাড়বে! জানোই তো বাচ্চারা খুব অনুকরণপ্রিয়...। আমার নিজের কিন্তু মেয়েটাকে কখনো এরকম মনে হয়নি। বরং স্নিগ্ধ চেহারার বকুলকে চন্দ্র, সূর্যের মতোই মায়া লাগে। তবে কর্তার যা ইচ্ছে! আসলেই তো আমার এত ব্যস্ততায় মোস্তাফাই সবকিছু সামাল দেয়। বকুলকে বেশ কিছু টাকা দিয়ে বিদায় করা হয়।

উইকেন্ড। মোস্তাফা বাসায় নেই। বাচ্চাদের নিয়ে ছবি আঁকার স্কুলে। ও আজ আবার ভুলে ওর মোবাইল ফেলে গেছে। একই নম্বর থেকে বারসাতেক কল আসে। ইমারজেন্সি ভেবে আমি একসময় রিসিভ করি। সাথে সাথে ওপাশ থেকে হাউ মাউ কান্না—খালু, এইডা কী করলাইন, আমার মায়াডার সব্বোনাশ করছুউন...। বিবরণ এই—বকুল নাকি মাস দুয়েকের প্রেগন্যান্ট। এখান থেকে যাবার পরই বিষয়টা ধরা পড়ে... ইত্যাদি ইত্যাদি। শুনে আমি ওদের উল্টা ধাতানি দেই—ফাজলামোর জায়গা পাও না, ঠিক আছে নিয়ে আসো তোমার মেয়েকে। ও প্রেগন্যান্ট হলে বাচ্চা হওয়ার পর পরীক্ষা করে দেখব—বাবা কে! ডিএনএ টেস্টেই ধরা পড়বে সব। আমি জানি শিশু ও নারী যেমন পাচার হচ্ছে, তেমনি একটা ক্রিমিনাল চক্র বিভিন্ন বাসায় কাজের মেয়ে জোগান দিয়েও এরকম ব্ল্যাক মেইল করছে।

মোস্তাফা বাসায় এলে সব খুলে বলি। শোনে ও প্রচণ্ড রেগে যায়—তুমি পাগল নাকি, এরা ভয়ংকর খারাপ। টাকাই ওদের মূল লক্ষ্য। কিছু নগদ পেলেই দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। বাসায় তো থাকো না। এসব ঝামেলা বুঝবে কী! এদের একটা চক্র আছে। বাসার কাছে এসে হৈ চৈ করে কাণ্ড ঘটাবে। আমাদের মান-সন্মান যাবে। রোখ চেপে যায় আমার। বলি—অসম্ভব, এ অন্যায় মেনে নেব না। ওদের একটুও ছাড় দেব না আমি। মেয়েটাকে বাসায় নিয়ে আসব। আমাদের তত্ত্বাবধানেই বাচ্চা হবে, তারপর ডিএনএ টেস্ট করে ওদের মুখোশ খুলব আমি। কিছুতেই এ সংকল্প থেকে টলানো যায় না আমাকে। আমার অনড় অবস্থা দেখে মোস্তাফা আমাকে হতবাক করে সারেন্ডার করে। কাণ্ডটা ও নিজেই করেছে, জানায়। অনেক্ষণ ঘৃণায় ওর দিকে তাকিয়ে থাকি। অবিশ্বাস ও হতাশায় আমার গলা ফ্যাস ফ্যাস করে—তুমি! তারপর একঝটকায় উঠে দাঁড়াই। চিত্কার করে বলি—গেট লস্ট। চন্দ্র-সূর্য দৌড়ে আসে। আমার ভয়ংকর মূর্তি দেখে ওরা বাবাকে জড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে—আব্বু , মামণিকে থামতে বলো। আমরা ভয় পাচ্ছি।

তারপর বকুলদের গ্রামে যাই। টাকা দিয়ে ওর মাকে অ্যাবরসনে রাজি করাই। এরপরও শেষ হয় না। আল্ট্রাসনোগ্রাম করে নিশ্চিত হতে হবে মেয়েটা এখনো চন্দ্র-সূর্যের উত্তরাধিকার বহন করছে কিনা। আমার মেয়েদের জীবন তো ঝামেলামুক্ত করতে হবে!

বিষাদের ভারে ন্যুব্জ আমি ক্লিনিকের ছকতোলা মোজাইকের দিকে নির্লিপ্ত তাকিয়ে থাকি। কতক্ষণ কেটেছে জানি না। বকুলের মা’র বোরখাপরা মুখটা ডাকে আমাকে—এই যে, আলটাসনুর রিপুট। আমার সামনে রক্তশূন্য একটা বছর ১৩/১৪’র কিশোরী দাঁড়িয়ে। ওর ফ্যাকাসে রক্তহীন অবয়ব আমাকে একটা প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দেয়। বাচ্চামেয়েটা থরথর করে কাঁপছে। উঠে দাঁড়াই। হাত বাড়িয়ে ওকে বসতে সাহায্য করি। ওর ঠান্ডা হাতদুটো আমার উষ্ণ করতলে আশ্রয় দিতে দিতে ভাবি—একটা বিশ্রী ও জঘন্য অন্যায়কে কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না; কিছুতেই না। আমার চন্দ্র, সূর্যের সাথে যদি কেউ এরকম বদমায়েশি করত! কী করতাম আমি? সাদা-কালো মোজাইক পাথরের দানাগুলো অসংখ্য পিঁপড়ের মতো আমার পায়ের তালু থেকে ক্রমশ মস্তিষ্কের নরমে ঢুকতে থাকে। বিপন্ন মা-মেয়েকে একটা ট্যাক্সিতে তুলে দিয়ে আমি দাঁড়িয়ে থাকি। চৈত্রের তেজি রোদ আমার ভেতর একটা ধারালো ও কঠিন সাহস নির্মাণ করে। দ্বিধাহীন পায়ে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করি। চন্দ্র ও সূর্যের জন্য মোস্তাফার মতো বাবার দরকার নেই।